


বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র তাঁকে বলেছিলেন, ‘তোমার সব বই যদি সাহিত্য থেকে মুছেও যায় তাহলে জানবে, কবি ও রাইকমল পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সাহিত্যের মধ্যেও অমর...।’ তিনি প্রয়াত না হলে সাহিত্যে আরও একটি নোবেল আসতে পারত ভারতে। প্রয়াণ দিবসে বাংলার এই সাহিত্যিকের জীবনকে ফিরে দেখল ‘বর্তমান’
সুখেন বিশ্বাস: দিনটা ছিল ১৯৭১ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রয়াণ দিবস। সেই বছরেই নোবেলের জন্য মনোনয়ন পেয়েছিলেন তারাশঙ্কর। তথ্যটি জানা যায় নোবেল প্রাপ্তির ওয়েবসাইট থেকে। আগে সুইডিশ অকাদেমি শুধু নোবেল বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করত। গত কয়েক বছর ধরে জনসাধারণের জন্য ওয়েবসাইটটি খুলে দেওয়া হয়েছে। সেই সুবাদেই জানা গিয়েছে তারাশঙ্করের মনোনয়ন পাওয়ার বিষয়টি। সেবছর সাহিত্যে নোবেল পেয়েছিলেন পাবলো নেরুদা। তারাশঙ্করের সঙ্গে গুন্টার গ্রাস, আর্থার মিলার প্রমুখ প্রাথমিক মনোনয়ন পেয়েছিলেন। কিন্তু মৃত্যুর কারণে বাদ পড়ে যান তারাশঙ্কর। না হলে হয়তো রবীন্দ্রনাথের পর নোবেলজয়ীর তালিকায় জুড়তে পারত আরও এক বাঙালি সাহিত্যিকের নাম।
হাঁসুলী বাঁকের মতোই বাঁকা ছিল তারাশঙ্করের জীবন। অপমান, দারিদ্র্য, জেল, বন্দিত্ব, অর্থনৈতিক সমস্যা, আধ্যাত্মিকতা, সম্মান সবকিছু মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছে তাঁর জীবনে। একসময় চরম খ্যাতি পেয়েছেন, অর্থও রোজগার করেছেন প্রচুর। সাহিত্য রচনা করে পেয়েছেন ‘অকাদেমি’ (১৯৫৬), ‘জ্ঞানপীঠ’ (১৯৬৭)। ‘পদ্মশ্রী’, ‘পদ্মভূষণ’ সম্মানেও ভূষিত হয়েছেন। ১৯৬০ থেকে ১৯৬৬ পর্যন্ত রাজ্যসভায় কংগ্রেস মনোনীত সদস্য ছিলেন। জীবনের শেষদিকে বারবার ডুবে গিয়েছেন মৃত্যুচিন্তায়। সে-কথা তিনি লিখেও রেখেছেন ডায়েরিতে। স্ত্রী উমাশশী ছিলেন তাঁর প্রাণের চেয়েও প্রিয়। ডাকতেন ‘বড়োবউ’ সম্বোধনে। তিনি লিখেছেন, ‘বড়োবউ নইলে যে আমার পৃথিবী অন্ধকার। সে যে আমার জীবনে জুড়ে রয়েছে মাটির উপরে বয়ে যাওয়া নদীর মতো।’ মৃত্যুতে ছিন্ন হল সেই বাঁধন।
শুরু কবিতায়, শীর্ষে কথাসাহিত্যে
তাঁর লেখা গল্প, উপন্যাস বাংলা সাহিত্যের সম্পদ। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ তাঁর লেখা পড়ে উচ্ছ্বসিত হয়েছেন। কিন্তু তাঁর জীবনটা শুরু হয়েছিল কবিতা দিয়ে—‘পাখির ছানা মরে গিয়েছে/মা ডেকে ফিরে গিয়েছে/মাটির তলায় দিলাম সমাধি/আমরাও সবাই মিলিয়া কাঁদি।’ হঠাৎই একবার নাটক লেখার শখ হল। লিখেও ফেললেন। তাঁর এক আত্মীয়-বন্ধু নাটকটি পড়ে জানালেন, তোমার এই নাটক মঞ্চস্থ হলে চারিদিকে হইহই পড়ে যাবে। নাটকটি এক গ্রুপ থিয়েটারকে অভিনয়ের জন্যে দিলে ম্যানেজার বলেছিলেন, ‘নিজের আত্মীয়স্বজনকে এনে ঢোকাবেন না। আজকে সূচ ঢোকালে কাল ফাল হয়ে বেরলে আমাদের পস্তাতে হবে।’ একথা শুনে তারাশঙ্কর নাটকের খাতাটা আগুনে পুড়িয়ে ফেলেছিলেন।
কাব্য ও নাট্যচর্চায় ব্যর্থ হয়ে তিনি শেষ পর্যন্ত একটি পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে লিখলেন ‘দীনার দান’ নামে একটি উপন্যাস। সেটি গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়নি। অবশেষে ‘কল্লোল’ পত্রিকায় প্রকাশিত হল তাঁর প্রথম গল্প ‘রসকলি’। তারাশঙ্করের গল্প-উপন্যাসে বারবার ফিরে এসেছে চোখে দেখা বাস্তব চরিত্র। ‘হাঁসুলী বাঁকের উপকথা’ উপন্যাসে নসুবালা লাভপুরেরই এক বৃদ্ধ। করালী আসলে তাঁর গাড়ির চালক। বীরভূমের মহুটা গ্রামের বাসিন্দা করালী মণ্ডলকে তিনি বলেছিলেন, ‘দেখিস তোকে বাঁচিয়ে রাখব...।’ ‘পঞ্চগ্রাম’ উপন্যাসের স্বর্ণময়ী লাভপুরের অন্নপূর্ণা পাল। ‘পদচিহ্ন’-এর গোপীচন্দ্র লাভপুরের যাদবলাল বন্দ্যোপাধ্যায়। ‘আরোগ্য নিকেতন’ উপন্যাসের কিশোর তারাশঙ্কর স্বয়ং। এই উপন্যাসের রতনবাবু ও বিপিন যথাক্রমে তাঁরই আত্মীয় সুরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য ও অবনীনাথ ভট্টাচার্য। সুরেন্দ্রনাথের আদলেই ‘গণদেবতা’(তৃতীয়)-এর ন্যায়রত্ন চরিত্রটি তৈরি করেছিলেন তিনি। অনেকের মতে, ‘কবি’ উপন্যাসের কবি তিনি নিজেই। তাই নিতাই কবিয়ালকে দিয়ে বলিয়েছিলেন, ‘জীবন এত ছোট কেনে?’
বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র তাঁকে বলেছিলেন, ‘তোমার সব বই যদি সাহিত্য থেকে মুছেও যায় তাহলে জানবে, কবি ও রাইকমল পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সাহিত্যের মধ্যেও অমর...।’ ‘শুকসারী-কথা’র সীমা আসলে লাভপুরের দুর্গা পাল। লাভপুর গ্রামের সব শ্রেণির মানুষের সঙ্গে তারাশঙ্করের অবাধ মেলামেশা ছিল। সেখানকার ভাদু গান, বোলান গান, টুসু, হাপু গান, কবি গান ইত্যাদি ছিল তাঁর অন্তরের সম্পদ। ফলে বাস্তবে দেখা ঘটনা ও চরিত্র তাঁর সাহিত্যে বারবার ধরা দিয়েছে। বুদ্ধদেব বসু একসময় বলেছিলেন, কীভাবে লিখতে হয়, তা তারাশঙ্কর জানতেন না। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, তারাশঙ্করের গল্পে ‘বাস্তবতা সত্য হয়েই দেখা দেয়’। ‘সপ্তপদী’ উপন্যাসের অ্যাংলো ইন্ডিয়ান নারী এক ব্যতিক্রমী চরিত্র। তারাশঙ্কর তাঁকে দেখেছেন কখনও পুরীর সমুদ্রতটে, কখনও শিলং যাবার পথে, কখনও বা কলকাতার চৌরঙ্গী অঞ্চলে। এই সুন্দরী শ্বেতাঙ্গিনীর সঙ্গে থাকত তাঁর পুরুষবন্ধু। সেই অ্যাংলো ইন্ডিয়ান নারীর পোশাক, চেহারা, কথোপকথনকে সামনে রেখেই তৈরি হয়েছিল ‘রিনা ব্রাউন’।
প্রথম উপন্যাস, ‘চৈতালী ঘূর্ণি’ (১৯৩১) সম্পর্কে প্রকাশকের এক দপ্তরি তাঁকে বলেছিল যে, বাঁধাইয়ের টাকা শোধ না করলে গোডাউন থেকে তাঁর বই ফুটপাতের হকারদের বেচে দেবে। তখনই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক ভদ্রলোক সেই প্রকাশককে বলেছিলেন, ‘এখুনি সব বই আমার দপ্তরে পাঠিয়ে দিন। আর বিল করে দিন। এখুনি সব মিটিয়ে দিচ্ছি।’ তারাশঙ্কর অচেনা সেই ভদ্রলোকের কথা শুনে তো অবাক! পরক্ষণেই ‘শনিবারের চিঠি’-এর সেই সম্পাদক সজনীকান্ত দাস তারাশঙ্করকে আশ্বস্ত করে বলেছিলেন, ‘আমি আপনার বই ছাপাব।’ বই লিখে তারাশঙ্কর কলকাতার বাড়ি করেছেন। মোটরগাড়ি কিনেছেন। বন্ধুর এই উন্নতিতে বড্ড খুশি হয়েছিলেন বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়। একসময় অচেনা লোককেও ধরে ধরে বিভূতিভূষণ বলে বেরিয়েছেন, ‘আরে শুনেছ, তারাশঙ্কর গাড়ি কিনেছে।’ কেউ কেউ এতে বিরক্তি প্রকাশ করলে বিভূতিভূষণ বলেছিলেন, ‘আরে একটা মানুষ শুধু লিখে একটা আস্ত মোটরগাড়ি কিনে ফেলেছে এতে আনন্দ পাব না!’
সাংবাদিক তারাশঙ্কর
শেষ জীবনে সাংবাদিকতার কাজ নিতে বাধ্য হয়েছিলেন তারাশঙ্কর। ১৯৬৩ সালের ২৭ জুলাই থেকে ১৯৬৭ সালের জুন অবধি তিনি ‘যুগান্তর’ পত্রিকায় সাংবাদিকতা করেছেন। তখন ওই পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন তুষারকান্তি ঘোষ। তিনি মূলত শনিবারের সম্পাদকীয় পাতায় ‘গ্রামের চিঠি’ শিরোনামে লিখতেন। এখানে মূলত গ্রামের চাষাবাদ, জল হাওয়া, রাজনৈতিক-সামাজিক পরিস্থিতি ইত্যাদি স্থান পেত। তাছাড়াও এই কলমে পশ্চিমবঙ্গ ও ভারতের রাজনীতির কথা বারবার এসেছে। ওই সময় তিনি কংগ্রেসের অন্তর্কলহ, দুর্নীতি নিয়েও সমালোচনা করেছেন। ফলে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ জমা পড়েছিল দিল্লির কংগ্রেস হাইকমান্ডে। বিষয়টি জানতে পেরে তিনি একটি চিঠিতে লিখেছিলেন, ‘...আমার দিক থেকেও সত্যকে প্রকাশ করতে ভীত আমি কোনদিন হব না। কারণ লেখক এক সত্যের কমান্ড ছাড়া অন্য কোন কমান্ডের অধীন নন। আমিও নই।’
গ্রামের চিঠিতে গ্রামের দলাদলি, কুশ্রীতা, ৬৩-এর খাদ্য সংকট, উদ্বাস্তু সমস্যা, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, স্বাস্থ্য, ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পাশাপাশি এসেছে সাহিত্যের কথাও।
সিনেমা ও থিয়েটার মঞ্চে
তাঁর লেখা বহু কাহিনি সিনেমা হয়েছে। ‘চৈতালী ঘূর্ণি’, ‘ধাত্রীদেবতা’, ‘অগ্রদানী’, ‘হাঁসুলী বাঁকের উপকথা’, ‘রাইকমল’, ‘কালিন্দী’, ‘গণদেবতা’, ‘মহাশ্বেতা’(হার মানা হার), ‘কবি’, ‘আরোগ্য নিকেতন’, ‘সন্দীপন পাঠশালা’, ‘জলসাঘর’, ‘অভিযান’, ‘নাগিনী কন্যার কাহিনী’, ‘রাধা’, ‘সপ্তপদী’ ইত্যাদি। ১৯৬২ সালে তপন সিনহা তৈরি করলেন ‘হাঁসুলী বাঁকের উপকথা’। বৃষ্টির দিনে জল-কাদার ভিতরে শ্যুটিং করতে করতে তপন ফিরে দেখেন, বিরাট বর্ষাতি পরে পিছনে তারাশঙ্কর দাঁড়িয়ে। অন্যদিকে, সরিৎকুমার ধামাভর্তি মুড়ি আর বেগুন ভাজা নিয়ে হাজির।
অজয় কর পরিচালিত ‘সপ্তপদী’ রিলিজে সমালোচনার ঝড় উঠেছিল। কারণ ছবিতে রিনা ব্রাউন ও কৃষ্ণেন্দুর মিলনের বিষয়টি উপন্যাসে ছিল না। এনিয়ে কম কথা শুনতে হয়নি! তারাশঙ্কর নাকি টাকার কাছে বিক্রি হয়ে গিয়েছেন, এমন কথাও উঠেছিল। কিন্তু তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, সাহিত্যের ভাষা আর চলচ্চিত্রের ভাষা এক নয়। ‘কবি’ উপন্যাসের চিত্ররূপ দিয়েছিলেন দেবকী বসু। ছবিতে রবীন মজুমদারের কণ্ঠে একটি গান ছিল, ‘কালো যদি মন্দ তবে কেশ পাকিলে কান্দ কেনে...’। বাঙালি দর্শকের মুখে মুখে ফিরেছিল সে গান।
প্রথম জীবনে নাটকে ব্যর্থ হলেও পরে রঙ্গমঞ্চে বিশাল সাফল্য পেয়েছিলেন। লাভপুরের ‘বন্দেমাতরম থিয়েটার’ তাঁর শিশুমনে মায়ারাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিল। এছাড়া ছেলেবেলায় লাভপুরে দেখেছেন নরেশ মিত্র, ক্ষীরোদপ্রসাদ বিদ্যাবিনোদ, অপরেশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় প্রমুখকে। লিখেছিলেন ‘মারাঠা তর্পণ’ নাটক। নাট্যজীবনে তাঁর প্রেরণা লাভপুরেরই বিশিষ্ট নাট্যাভিনেতা নির্মলশিব বন্দ্যোপাধ্যায়। রবীন্দ্রনাথের পরামর্শে ‘রাইকমল’ উপন্যাসটি নাটকে মঞ্চস্থ করতে আগ্রহ দেখিয়েছিলেন স্বয়ং শিশিরকুমার ভাদুড়ি। পরে ‘কবি’, ‘কালিন্দী’, ‘আরোগ্য নিকেতন’, ‘দুই পুরুষ’ ইত্যাদি মঞ্চে সাফল্য পেয়েছিল। নাটকের পাশাপাশি যাত্রার প্রতিফলন দেখা দেয় ‘মঞ্জরী অপেরা’, ‘অভিনেত্রী’ ইত্যাদি রচনায়।
সত্যজিৎ ও তারাশঙ্কর
১৯৫৭ সালের কোনও একদিন সত্যজিৎ রায় হঠাৎই হাজির হলেন তারাশঙ্করের টালা পার্কের বাড়িতে। যে বাড়িতে উত্তমকুমার সহ বিখ্যাত চলচ্চিত্র অভিনেতারা আসতেন। কিন্তু বাড়িতে গিয়ে দেখেন তারাশঙ্কর নেই। যে ঘরে অতিথিরা বসতেন, সেই ঘরে বসেছেন সত্যজিৎ। কিছু পরে উপস্থিত হলেন তারাশঙ্কর। তখন ছোটগল্প ও উপন্যাস লেখায় তাঁর খ্যাতি চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। ‘জলসাঘর’ তৈরি নিয়ে আলোচনার সময়ে তারাশঙ্কর হঠাৎই সত্যজিৎকে বলেছিলেন, আমি এই ছবির চিত্রনাট্য লিখব। নির্দ্বিধায় সমর্থন করেছিলেন সত্যজিৎ। কিন্তু চিত্রনাট্য নিতে এসে তিনি তো হতবাক। যেমনটি চেয়েছিলেন, চিত্রনাট্য মোটেও তেমনটি হয়নি। তাই সত্যজিৎ সরাসরি তারাশঙ্করকে বলেছিলেন, ‘চিত্রনাট্যটি আমার পছন্দ হয়নি।’ তারাশঙ্কর বলেন, ‘না বাপু, এইসব আধুনিক সিনেমার আমি কিছু বুঝি না। বরং তুমি যা পারো তাই করো।’
জানা যায়, সত্যজিৎ রায় দীর্ঘদিন ধরে জলসাঘরের উপযোগী একটি অভিজাত বাড়ি খুঁজছিলেন। অবশেষে মুর্শিদাবাদের নিমতিতায় পছন্দমতো একটি বাড়ি পেলেন। সত্যজিৎ রায়ের ভাষায়, ‘আবিষ্কার করলেন।’ বাড়িটি পাওয়া নিয়ে তারাশঙ্করকে তিনি একটি চিঠি দিলেন। প্রত্যুত্তরে তারাশঙ্কর জানালেন, মুর্শিদাবাদের নিমতিতায় সেই সংগীতপ্রেমী জমিদার উপেন্দ্রনারায়ণ চৌধুরীর আদলেই তিনি ‘জলসাঘর’ গল্পের বিশ্বম্ভর রায় চরিত্রটি তৈরি করেছিলেন। নিমতিতার বাড়িটি আবিষ্কার প্রসঙ্গে সত্যজিৎ রায়ের বিপরীত তথ্য দিয়েছেন তারাশঙ্করের উত্তরসূরিরা। তারাশঙ্করের প্রপৌত্র অধ্যাপক অনিন্দ্য বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, ‘জন্মশতবর্ষে বেতারে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে পুত্র সরিৎকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন, পছন্দমতো জমিদার বাড়ি পাওয়া যাচ্ছিল না বলে সত্যজিৎ ভেবেছিলেন, ছবিটি করবেনই না। তখন বড়োবাবুই (তারাশঙ্কর) বলেছিলেন, চৌধুরীদের নিমতিতার বাড়ির জলসাঘরের কথা।’ ছবিতে কাহিনির মূল আমেজটা ধরে রাখায় অত্যন্ত খুশি হয়েছিলেন তিনি।
‘অভিযান’ (১৯৬২) ছবিটি তৈরির অনুমতি নিতে সত্যজিৎ আবার এলেন টালা পার্কে। এবার চিত্রনাট্য লেখার বিষয়ে কোনও শর্ত দিলেন না তারাশঙ্কর। তিনি ‘জলসাঘর’ তৈরির সময়ই বুঝতে পেরেছিলেন, সত্যজিৎ রায় ছবি তৈরির মাস্টার কিং। অবশেষে ওয়াহিদা রহমান ও সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে নিয়ে তৈরি হল ‘অভিযান’।
একদিকে নেতাজি, অন্যদিকে লেনিন
একবার নেতাজি কোনও একটা কাজে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন শান্তিনিকেতনে। বোলপুর স্টেশনে তারাশঙ্করকে দেখে ভিড় ঠেলে এগিয়ে এলেন তিনি। বললেন, ‘আপনি তো তারাশঙ্করবাবু?’ নেতাজির ডাকে সেদিন অভিভূত হয়েছিলেন তারাশঙ্কর। কতদিন আগে ‘নরেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের কেস’ প্রসঙ্গে নেতাজির সঙ্গে একবারই কথা হয়েছিল তাঁর। অবাক হয়ে ভেবেছিলেন, এতদিন পরেও মনে রেখেছেন নামটা! জেলমুক্ত হয়েই লিখেছিলেন ‘চৈতালী ঘূর্ণি’। উপন্যাসটি সুভাষচন্দ্রকে উৎসর্গ করে মনে মনে তৃপ্তি পেয়েছিলেন।
আরও একটি ঘটনা এই প্রসঙ্গে উল্লেখ্য। তখন বীরভূমের জেলাশাসক গুরুসদয় দত্ত। তাঁর ব্রতচারী সারা বীরভূমে ছড়িয়ে পড়েছে। এসব নিয়ে সেই সময় তারাশঙ্করের ছাপাখানা থেকে ব্যঙ্গ কবিতা ছাপা হয়েছিল। ফলে রাজরোষে পড়লেন তারাশঙ্কর। ছাপাখানায় তালা পড়ল। সুভাষচন্দ্রের পরামর্শে তিনি সেদিন জামিন নেননি।
তারাশঙ্কর ছিলেন রাজনীতি সচেতন। কংগ্রেসি রাজনীতিতে নাম লেখালেও তিনি কখনও কংগ্রেসের দলীয় কোন্দল পছন্দ করেননি। রাজনীতি না ছাড়ার কারণে সিউড়ি জেলে চার মাস জেল খেটেছেন। তাঁর আদর্শ ছিলেন মহাত্মা গান্ধী। তাই বোধহয় আগস্ট আন্দোলনের ছায়া এসেছে ‘গণদেবতা’, ‘মন্বন্তর’, ‘পঞ্চগ্রাম’ উপন্যাসে। ‘মন্বন্তর’ উপন্যাসের সূত্রেই বিরোধ বেধেছে বামপন্থীদের সঙ্গে। উল্লেখ্য, মার্কসবাদীদের সংগঠন ‘অ্যান্টি ফ্যাসিস্ট রাইটার্স অ্যান্ড আর্টিস্টস অ্যাসোসিয়েশন’-এর সভাপতিও ছিলেন তিনি। সেখানে নেতাজি সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য হওয়ায় তিনি সংগঠন ত্যাগ করেছিলেন। তিনি লেনিন সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘বিশ্বমানবের পথপ্রদর্শক’, ‘আশ্চর্য মানববন্ধু’।
শেষ কথা
প্রান্তিক মানুষের কথা লেখার মধ্যে দিয়ে বাঙালির মহাকালকে তুলে ধরেন তারাশঙ্কর। ‘গণদেবতা’ উপন্যাস লিখলেও তিনি নিজেই বাঙালি-সংস্কৃতির গণদেবতা। তবুও একসময় ডাক্তার দেখানোর পয়সা ছিল না তাঁর। ছ’বছরের মেয়ে বুলু মারা গিয়েছিল বিনা চিকিৎসায়। বড় মেয়ে গঙ্গার জ্বর হলে ডাক্তারের ফিজ আর ওষুধ কিনে দিয়েছিলেন যামিনী রায়। বড় জামাইয়ের (শান্তিশঙ্কর) মৃত্যুর অভিঘাতেই ৬৪ বছর বয়সে ‘যুগান্তর’ পত্রিকায় সাংবাদিকতার চাকরি নিয়েছিলেন। সাহিত্য-খ্যাতির মধ্যগগনে থেকেও একবার তিন বছর না লিখে জীবন কাটিয়েছেন। আত্মজীবনীতে লিখেছেন, ‘লিখতে ইচ্ছে হয় না। লিখি না। লেখা ছেড়েই দিলাম। বাড়ি থেকে বের হওয়া বন্ধ করলাম। বসে বসে ভাবি। আর কাঁদি। একলা কাঁদি। পুজোর সময় কাঁদি। রবীন্দ্রনাথের গান শুনে কাঁদি।’
শান্তির সন্ধানে একসময় বহু জায়গায় ঘুরেছেন। বহু সাধুকে ধরেছেন। কাশীর আনন্দসুন্দর ঠাকুর তাঁকে বলেছিলেন, ‘আপনার সাধনার পথ হল সাহিত্য। তাকেই জীবনের সাধনা করুন, শান্তি পাবেন।’ বাড়ি ফিরেই নিজের মাকে গুরু মেনে দীক্ষা নিয়েছিলেন। পাশাপাশি চণ্ডীপাঠ, গীতাপাঠে মেতে থাকতেন। অবশেষে মন শান্ত হলে টের পেয়েছেন ঈশ্বর-অনুভূতি। এই অনুভূতিই তাঁকে সকল দুঃখ সহ্য করার ক্ষমতা দিয়েছিল। ‘রাধা’, ‘বিচারক’ লিখে তিনি আবার ফিরেছিলেন সাহিত্য জগতে।
লেখক কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক
গ্রাফিক্স : সোমনাথ পাল
সহযোগিতায় : সত্যেন্দ্র পাত্র