


জয়তী রায়: তারস্বরে কাঁদছে বুলবুল। কে রেখেছিল ওর নাম বুলবুল! গলার আওয়াজে ফালা ফালা হয়ে যাচ্ছে বাড়ি, মস্তিষ্ক। আর পারা যায় না। নিজের সন্তান। তবু, সহ্য হচ্ছে না।
ওদিক থেকে কর্কশ গলায় বলে উঠল অঞ্জন, ‘চুপ করাও তোমার মেয়েকে। সকাল থেকে চেঁচাচ্ছে।’
উত্তরে ভেসে আসে তৃষ্ণার অসহায় গলা, ‘চেষ্টা তো করছি। কিছুতেই থামছে না।’
‘তৃষ্ণা, অনলাইন মিটিং করতে করতে মাথা ফেটে যাচ্ছে। প্লিজ, কিছু কর।’
তৃষ্ণা কথা বাড়ায় না। বলতে পারে না, কাজ তাকেও করতে হচ্ছে। সে-ও চাকরি করে। কর্পোরেট অফিসে। আজ চারদিন অফিস যায়নি। ভাগ্যিস অনলাইন ব্যবস্থাটা আছে। রান্নার লোক, ঠিকে লোক নিয়মিত আসছে। তৃষ্ণা আর অঞ্জন কাজের লোকের ব্যাপারে কার্পণ্য করে না। রান্না, ঘর মোছা— ভাগে ভাগে লোক আছে। নেই কেবল মিনতি।
বুলবুলের আয়া।
কতদিন ফেসিয়াল করা হয়নি। ভুরুর ওখানে কাঁটাঝোপ গজিয়েছে। এই অবস্থায় যদি অফিস যেতে হয়! ভাবতে গিয়ে ইন্দ্রনীলের কথা মনে পড়ল তৃষ্ণার। প্রজেক্ট ম্যানেজার। ইয়ং। হ্যান্ডসাম। স্মার্ট। এলোমেলো হয়ে সামনে যেতে লজ্জা করে বইকি।
বুলবুল আবার চেঁচিয়ে উঠল। এখন দুপুর বারোটা বাজে। ওর নিশ্চয়ই খিদে পেয়েছে। হাতের কাজ ফেলে দৌড়ে কাছে যায় তৃষ্ণা, ‘কী হয়েছে সোনা আমার? খিদে পেয়েছে?’
উত্তরে জ্বলন্ত চোখে তাকায় বুলবুল। বারো বছর বয়স। হাত পা কাঠি-কাঠি। ফর্সা। লম্বাটে মুখে বড় বড় চোখ। মাটিতে বসে আছে। থেবড়ে। ঠোঁটের কষ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে লালা।
তৃষ্ণা বলে, ‘কী হল বুলবুল! এসো। চিকেন ভাত খাবে।’
অঞ্জন রাগ করে বলে ওঠে, ‘ন্যাকামো থামাবে? ও কথা বলতে পারে? যাও, বারান্দায় যাও। বারান্দায় না গেলে খাবে না, জানো না? ধরে খাইয়ে দাও।’
কর্কশ গলার তাপ ছড়িয়ে পড়ে বাড়িময়। বৃষ্টি থেমে যায়। মেঘলা আঁধারের চাদর মুড়ি দেওয়া দুপুর। আশ্বিন মাসে এত বৃষ্টি কেন?
বিরক্ত লাগে তৃষ্ণার। উঠে গিয়ে জোরে ধাক্কা মারবে অঞ্জনকে? কষিয়ে চড়? নাহ্। পারবে না। যেটা পারে সেটাই করে। অসহায় গলায় বলে, ‘একটু ধরবে প্লিজ। আমি পেরে উঠছি না।’
‘কী করে পারবে! মেয়ের জন্ম থেকে তো কিছুই করনি। সে তো করতেন আমার মা। তিনি স্বর্গে গেলে, এল মিনতিবালা দাসী...
সরো, দেখি।’
দাঁতে ঠোঁট কামড়ে সরে দাঁড়ায় তৃষ্ণা। দমবন্ধ সংসারে অফিসে দাঁড়ালে শ্বাস নিতে পারে। সেইটুকু অবকাশ পাওয়ার জন্যে নিরন্তর লড়াই করতে হয়।
অঞ্জন ভোলাচ্ছে মেয়েকে, ‘বারান্দায় যাবে? তাহলে খাবে তো? দেখ তৃষ্ণা, বারান্দায় বৃষ্টির ছিটে আসছে নাকি?’
তৃষ্ণা তাড়াতাড়ি বলে ওঠে, ‘না, না। থেমে গেছে। আমি নিয়ে যাচ্ছি টেবিল চেয়ার।’
বেঁধে দেওয়া যায় এমন চেয়ার আর টেবিল নিয়ে বারান্দায় আসতেই চোখে পড়ে ঝাঁকড়া শিউলি গাছ। শরৎ ঋতুর সোহাগে সোহাগে গর্বিত রমণীর মতো ফুল ফুটিয়ে চলেছে। বুলবুল ভালোবাসে বারান্দায় বসতে। সামনে একটা ছোট্ট মাঠ। কাদাভরা মাঠে ভর দুপুরে বল খেলছে স্কুল যেতে না পারা ছেলের দল। চোখে মুখে উল্লাস। কাদায় জলে ভূত হয়েছে এক একটা। বুলবুলকে দেখে হাত নাড়ে। ততক্ষণে বুলবুল মেলে দিয়েছে দৃষ্টির ডানা। উড়ে বেড়াচ্ছে ভেজা মাঠে, গাছের ফুলে, মেঘ-ছেঁড়া নরম আলোয় মুখে ফুটে উঠেছে খুশির পরিবর্তে বিষণ্ণতা। টেবিল-চেয়ারে বুলবুলকে সেট করিয়ে বসাতে বসাতে অঞ্জন গজগজ করে, ‘জানো যখন বারান্দায় এলে ভালো থাকে, বৃষ্টির রকম বুঝে নিয়ে আসতেও তো পার? অফিস ছুটি দু’জনে ভাগ করেই নিয়ে থাকি। তোমার মতন মুখ লটকে বসে থাকি না।’
অঞ্জনের টার্গেট তৃষ্ণা। সমাধানহীন যন্ত্রণার হাত থেকে সাময়িক উদ্ধার পাওয়ার সহজ উপায় অন্য কাউকে দোষারোপ করা। অঞ্জন সেটাই করে থাকে বরাবর। তৃষ্ণা সহ্য করে আবার কখনও করে না। চেঁচামেচি করে করে ক্লান্ত হয়ে যায় দু’জনেই। চিকেন-ভাতের প্লেট হাতে এগিয়ে যাচ্ছে অঞ্জন, মুখে চিরাচরিত বুলি, ‘ও সোনা মা। খেয়ে নাও। ও সোনা মা।’ বেল্টের বাঁধন থেকে এগিয়ে হিংস্র বেড়ালের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল বুলবুল। আঁচড়ে দিল অঞ্জনের মুখ। ভাতের প্লেট ঝনঝন শব্দে পড়ে গেল মাটিতে। আহত জন্তুর মতো চিৎকার করে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল বুলবুলকে অঞ্জন। ঘটনায় হতচকিত তৃষ্ণা বুঝতে পারল না ধরবে কাকে? মাটিতে গড়িয়ে পড়া বুলবুলকে? না কি দু’হাতে মুখ ঢেকে রাখা স্বামীকে?
...
এখন রাত। কড়া ডোজের ওষুধ খেয়ে ঘুমিয়েছে বুলবুল। ডাক্তার যদিও বলেছেন, ঘুমের ওষুধ কম দিতে। কিন্তু কী করবে? হাতে পায়ে ক্রিম মেখে নাইটি পরে আধশোয়া বিছানায় ফোন খোলে তৃষ্ণা। ড্রয়িংরুমের সোফায় ড্রিংক নিয়ে বসে ফোন অঞ্জনও খুলেছে। ঠোঁটের কোনায় ঝুলছে সবুজ হাসি। কে আছে সবুজ আলো মেখে? যেই থাকুক, এখন আর কিচ্ছু আসে যায় না। অফিসের বন্ধু পলাকে নক করতেই ঝাঁপায় মেসেজ— উফ্। কী রে? তোর বিরহে মরে যাচ্ছি।
হাসিমুখের ইমোজি দিয়ে তৃষ্ণা লেখে— এবার ছুটি অঞ্জন নেবে। আমি অফিস যাব। নতুন আয়া আসছে। ওই মিনতি না আসা পর্যন্ত।
—কবে ফিরবে মিনতি? বন্যার জল কমেনি?
—ফোন করছে না। লাইন খারাপ হয়তো। আমার বাড়ির সমস্যা কমেনি। অঞ্জনের মেজাজ খারাপ হচ্ছে প্রতিদিন।
—অন্য আয়া কেমন?
—অন্য আয়াগুলো একই সেন্টার থেকে আসছে। কিন্তু, পারছে না।
—ট্রেনিং থাকলে তো হবে না, মায়া থাকতে হবে।
এই কথা শুনছিলাম একটা অনলাইন সেমিনারে।
তৃষ্ণা লেখে— কথাটা ঠিক। মিনতি কাজটাকে পয়সার বিনিময়ে নেয় না। প্রাণ দিয়ে করে।
পলা হাসির ইমোজি দিয়ে বলে— ছোটবেলায় রচনা লিখতে দিলে টিচার হতে চাইতাম। তৃষ্ণা লিখল— আমি স্বার্থপর। বোবা কালা হাবা সন্তান নিয়ে আর পারছি না। টিচার বা মা কিছুই হতে পারব না।
পলা লিখল— চেষ্টা করলে কি না হয়?
মায়ের কোনও ট্রেনিং লাগে না।
রাত বাড়ছে। তৃষ্ণা ঘুমোতে পারছে না। একটা দৃশ্য হঠাৎ ভেসে উঠল মনের পর্দায়। মিনতি আপনমনে গান গাইতে গাইতে ঘুরে বেড়াচ্ছে ঘরে, আর তার আঁচল টেনে ধরে পিছন পিছন ঘষে ঘষে এগচ্ছে বুলবুল।
তৃষ্ণা বারান্দায় এসে চুপ করে দাঁড়ায়। বিয়ের আগে এমন রাত্রিকেই মনে হতো উড়ন্ত পাখি। প্রতিটি প্রহর যেন ডানার সঞ্চালন। ডানা ঝাপটাতে ঝাপটাতে সেই পাখি উড়ে যেত মস্ত উঁচু পাহাড় চূড়ার দিকে। পাহাড়ের ওপারে আলোর দেশ। পৌঁছলেই ঠোঁটে লাগত সকালের রোদ। প্রতিটি দিন প্রাণময় হয়ে উঠত আলোর দেশের রোদ্দুর মেখে। এখন সেই পাখি যেন ভাঙা ডানা নিয়ে পড়ে আছে মাটির ওপর।
মনের গভীরে ভিড় করে একরাশ বর্ণহীন শূন্যতা। তৃষ্ণা ভাবে— বুলবুলের জন্ম হল যখন বাড়িতে উৎসব! শ্বশুর বেঁচে ছিলেন না। শাশুড়ি ছিলেন। তিনজন মিলে পুঁচকেটা নিয়ে হইহই। পুতুলের মতো সুন্দর শিশু। ফর্সা। রুমঝুম চুল। কেউ কিছু বুঝতে পারেনি। কিচ্ছু না। ধীরে ধীরে বদলে যেতে লাগল আদরের বুলবুল। এত ধীরে হল সে পরিবর্তন যে টের পেতে দেরি হল। তিন বছরেও কথা বলল না যখন, তখন বাজ ভাঙল মাথায়।
ডাক্তার অনেক কিছু বুঝিয়েছিলেন। সামনে তিনটি অবোধ প্রাণী— অঞ্জন, তৃষ্ণা আর শাশুড়ি।
—মেডিসিন তেমন নেই। এটা এক মানসিক অবস্থা। খুব সেনসিটিভ হয় এই ধরনের বাচ্চারা। নরম হাতে হ্যান্ডেল করতে হবে। একদম ভাববেন না ওর মস্তিষ্ক সচল নয়। বরং বেশি মাত্রায় বোঝার ক্ষমতা রাখে। সব বুঝবে। ওর সামনে কোনও নেগেটিভ শব্দ উচ্চারণ একেবারে করা যাবে না।
অঞ্জন বলেছিল, আমরা দু’জনেই চাকরি করি। সেক্ষেত্রে...।
ডাক্তার মাথা নাড়লেন, নাহ্। সেটা তো হবে না। একজনকে তো চাই। দেখছি। আছে একজন। যদি ফ্রি থাকে। খরচ একটু বেশি।
খরচ? সে পরোয়া কে করে। দু’জনেই বড় চাকরি করে। ওসব সমস্যা নেই। দেখাশোনা করার মহিলাটি যেন ভালো হয়।
ডাক্তার ভরসা দিলেন, ভাববেন না। যাকে দিচ্ছি সে অভিজ্ঞ। স্পেশাল ট্রেনিং নেওয়া। স্পেশাল বাচ্চাদের জন্যই।
চেম্বার থেকে বাড়ি ফিরতে ফিরতে শাশুড়ি বলেছিলেন, চাকরি ছেড়ে দাও তৃষ্ণা। বাচ্চা আগে না চাকরি আগে? মা সবচেয়ে বড় শিক্ষক। সেটা মনে রেখ।
চাকরি ছেড়ে দেবে! বিয়ের আগের থেকে কাজ করছে। ভালো পজিশন। ভালো টাকা। হুট করে ছেড়ে দিলেই হল? গাড়ি কেনা হল আরও একটা। বাড়ি সাজানো হল নতুন করে। বিদেশ ঘুরতে যাওয়ার প্ল্যান...অঞ্জনের একলার রোজগারে হবে না। আর সবচেয়ে বড় কথা, বাড়িতে বসে থাকলে পাগল হয়ে যাবে সে নিজেই।
সমস্যার সমাধান করে দিল মিনতি। ডাক্তারবাবু কথা রেখেছিলেন। মিনতি সবদিক থেকে সঠিক। উপযুক্ত। বয়স চল্লিশ হবে। দোহারা চেহারা। বাড়ি গ্রামে হলেও ভাষায় বা চরিত্রে গ্রাম্য ভাব একেবারেই নেই। চব্বিশ ঘণ্টার ডিউটি করে। বাচ্চা ছাড়া ঘরের অন্য কোনও কাজ নয়। ছুটি নেওয়ার ব্যাপারে স্পষ্ট বলে দিয়েছিল, তোমাদের সুবিধা অনুযায়ী বাড়ি যাব। পরিবার গ্রামে থাকে। দরকার পড়লে যেতে হবে।
বুলবুলের ট্রিটমেন্ট চলছিল। স্পিচ থেরাপিস্ট আছে। বিশেষ স্কুলে যায়, সপ্তাহে তিনদিন। বাড়ির গাড়ি রাখা আছে। হুইলচেয়ার থাকে। বুলবুল বড় হতে থাকল। স্পিচ থেরাপিতে যেটাই শিখুক অসীম ধৈর্যে অভ্যাস করায় মিনতি।
প্রাণপণ চেষ্টা করে মিনতি। যেন অদ্ভুত এক পণ করে বসে আছে। জ্বলজ্বলে চোখ। জিভ ঠেকিয়ে ঠেকিয়ে শব্দ করবে। একটা অর্থহীন শব্দ শুনে উল্লাসে হাততালি দেবে, শুনলেন বউদি? ফোন রাখেন। মা ডাকল বুলবুল। ও বউদি...। হাত ফোনে রেখে আরাম করে তৃষ্ণা আনমনে বলে, তাই নাকি?
মিনতির চেষ্টায় বাড়ির গুমোট কাটতে থাকল। অফিস, টিভি, অঞ্জনের কবিতা লেখা, বাড়িতে জমাটি পার্টি শুরু হয়ে গেল আবার। একটাই অসুবিধা, লোকজন এলে মিনতি দরজা বন্ধ করে আলাদা রাখবে না বুলবুলকে। কেন রাখব? একদিন বলেছিল জেদ করে, ওই বাচ্চাগুলো কত বদমায়েশি করে। মিথ্যে কথা বলে। বুলবুল অনেক ভালো।
মিনতির দাপট সহ্য না করে উপায় নেই। গোলাপি শিফন শাড়ি পরে অফিস যাওয়া, কাজ শেষ করে পলার সঙ্গে কফি খাওয়া, মাসের শেষে অনেক টাকার চেক বুকে জড়িয়ে নিতে হলে মিনতি অনিবার্য।
গড়গড়িয়ে চলা জীবনগাড়ি মস্ত ঝাঁকুনি দিয়ে ব্রেক কষে দাঁড়িয়ে পড়ল হঠাৎ করে। মিনতি ঘোষণা করল সে বাড়ি যাবে।
—সে কী! তুমি গেলে কী করে হবে? আর বুলবুল? তোমায় ছেড়ে কী করে থাকবে?
মিনতির মুখে প্রকট কষ্ট, বন্যায় ভেসে গেছে খেত। পরিবারের লোকজনের বুদ্ধি কম। সামাল দিয়ে চলে আসব। বউদি, আপনারা হলেন জন্মদাতা। আপনারাই বুলবুলের ভগবান।
মিনতি গেল। ট্রেইন্ড আয়া এল। বসার ঘরের মেঝেতে নেতিয়ে পড়ে থাকে বুলবুল। চিৎকার কমে গেছে। কী সব বিড়বিড় করছে। কিছুই প্রায় খাচ্ছে না। ডাক্তারকে ফোন করেছিল। তিনি বললেন, কিচ্ছু হবে না। যেটুকু খাচ্ছে তাতেই হবে।
তাই হল। কম খাওয়া চলল। কিন্তু, বুলবুল হয়ে উঠল হিংস্র। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বারান্দায় বসে থাকবে। বোধহয় ভাবে, সামনের রাস্তা দিয়ে আসবে মিনতি। গায়ে নোংরা জমে পাহাড়। একঘেঁয়ে সুরে কান্না। নতুন আয়াকে কামড়ে দিল। সে কাজ ছেড়ে চলে গেল। এল আরেকজন। গত দু’মাসে চারজন আয়া। সকলেই তো অভিজ্ঞ। তাহলে? কোথায় অসুবিধা? কী আছে মিনতির মধ্যে যা অন্যদের নেই?
মিনতির ফোন। এতদিন পরে মনে পড়ল! নিমকহারাম। গজগজ করতে করতে ফোন তুলল তৃষ্ণা
—বল, মিনতি।
স্পষ্ট কাটাকাটা গলায় উত্তর দেয় মিনতি, বউদি, বিপদে পড়েছিলাম। ফোন কাজ করেনি।
সংবিৎ ফেরে তৃষ্ণার। না, না সত্যি তো। এমন বিপদের সময় রাগ করলে চলে?
—এখন অবস্থা কীরকম? ফিরবে কবে?
—এমনি সব ঠিক আছে বউদি। বর্ষাকাল শেষ। শরতের আলো ফুটছে। জল নামছে। কেমন আছে চুটকি? নতুন কথা বলে কিছু?
—চুটকি?
—বুলবুল। ওই নামেই ডাকি।
—ওহ। তাই তো।
—কেমন আছে?
তৃষ্ণা ভাবে বলে উঠবে, ভালো নেই। একটুও ভালো নেই। তুমি কবে আসবে?
বলতে পারে না। লজ্জা করে খুব।
উল্টোদিকে মিনতি নরম সুরে বলে, আমারও চিন্তা... স্বপ্ন দেখি। চুটকি ডাকে। কিন্তু উপায় নেই বউদি ... আর কয়টা দিন। পুজোর পরেই যাব
বকবক করেই যাচ্ছে মিনতি।
অঞ্জন হঠাৎ লাফিয়ে উঠে ফোনটা হাত থেকে কেড়ে নিয়ে বলল, আমি স্পিকার অন করছি মিনতি। তুমি কথা বল। বুলবুল শুনছে।
কোনও সুদূর থেকে ভেসে আসতে থাকল মন্ত্র উচ্চারণ— চুটকি আমার চুটকি। চুপুর চুপুর খাও রে। চুটকি চুটকি আমার চুটকি।
বুলবুল স্থির। চোখের মণি নিবদ্ধ মোবাইলের দিকে। দুলছে অল্প অল্প। বুলবুল কাঁদছে। নিঃশব্দে কাঁদছে আর ঠোঁটের কোনায় ভেসে উঠছে হাসির টুকরো। অপূর্ব মায়া ছড়িয়ে যাচ্ছে বিলাসবহুল প্রাণহীন ফ্ল্যাটের আনাচকানাচে। খুলে গিয়েছে ভালোবাসার উৎসমুখ। বইছে আনন্দধারা।
হাঁটু মুড়ে বসে পড়ে তৃষ্ণা। জড়িয়ে ধরে ঘ্রাণ নেয় আত্মজার শরীরের। আশ্চর্য অলৌকিক স্পর্শে এলিয়ে পড়ে মায়ের বুকে বুলবুল। শান্ত মুখে আদরের ওম নিচ্ছে। খ্যাপাটে অঞ্জনের মুখেও ফুটে উঠেছে অবাক ভাব। মৃদু স্বরে বলল, তোমায় কী সুন্দর লাগছে তৃষ্ণা। মাদার মেরির মতো!
একরাশ শিউলি ঝরিয়ে হেসে ওঠে তৃষ্ণা। পলা ঠিক বলেছিল— মায়ের কোনও ট্রেনিং লাগে না।