


অঙ্কে মাত্র পঁচানব্বই! হায়েস্ট তো একশো? তোর ওই পাঁচটা নম্বর কোথায় গেল?
কোনওদিন ওর মতো খেলতে পারবি না। আমার পরিশ্রমই সার। এত কষ্ট করে এত দূর নিয়ে আসা হয়রানি!
এবারও স্কুলের কালচারাল মিটে তোকে বিট করে দিল রণি! এবারও?
খুব চেনা সংলাপগুলো। তার চেয়েও চেনা এই সংলাপ তৈরি হওয়ার পরিবেশ। আমাদের চারপাশে তাকালে এমন লাখো লাখো অভিভাবক মেলে, যাঁরা দিনরাত নিজের সন্তানের সামনে এসব সংলাপ আউড়ে যান। সাফল্য কি তাহলে জরুরি নয়? আলবাত জরুরি। কিন্তু সাফল্যই জীবনের একমাত্র লক্ষ্য নয়। বরং সাফল্যের হাত ধরে আসা নানা ব্যর্থতাকে জীবনে গ্রহণ করতে শিখলে তবেই সন্তান একদিন নিজের গণ্ডি নিজেই ছাড়িয়ে যেতে পারবে। এই শিক্ষায় কোথাও খামতি থেকে যায় বলেই হয়তো ব্যর্থতা এলে তাকে আর সহজ করে হজম করতে পারে না শিশুরা। স্কুল-কলেজ এমনকী, উচ্চশিক্ষা নিতে গিয়েও ব্যর্থতাকে মোকাবিলা করতে না পেরে আত্মহত্যার মতো পথ বেছে নিচ্ছে ছাত্র-ছাত্রীরা।
এই প্রসঙ্গে টিন-এজ ছেলেমেয়েদের অভিমান ও মনের ওঠাপড়ার প্রসঙ্গ তুললেন মনস্তত্ত্ববিদ ডঃ ত্রিধা সেন। তাঁর মতে, ‘টিন এজ মনে কতখানি অবসাদ বাসা বাঁধতে পারে, তা নিয়ে অভিভাবকদের কোনও ধারণাই নেই। তাঁরা যাবতীয় দোষ দেন সমাজমাধ্যম ও স্কুল-কলেজের বন্ধুবৃত্ত কিংবা বিশেষ সম্পর্কের দিকে। অথচ ছোটবেলা থেকে যে রেষারেষি ও প্রতিযোগিতার মাঝে তাকে ছুড়ে ফেলা হয়, সেটা কেউ মনে
রাখেন না।’
সাফল্য খোঁজা তবে বারণ?
মনস্তত্ত্ববিদের মতে, সাফল্য আর প্রথম-দ্বিতীয় হওয়া এক নয়। জীবনে প্রতিষ্ঠিত হতে গেলে সফল হওয়া জরুরি। কিন্তু সাফল্য শুধু বাবা-মায়ের পছন্দের বিষয়ে ছিনিয়ে আনতে হবে কিংবা প্রতি বিষয়ে সেরা হতেই হবে এমন ভাবনা অমূলক। কথায় কথায় তিনি জানালেন, ‘এমন অনেক অভিভাবককে জানি, যাঁরা নিজেদের অপূর্ণ স্বপ্ন সন্তানের মাধ্যমে পূর্ণ করতে চান। যে স্বপ্ন নানা কারণে নিজেই সফল করতে পারেননি, তার বোঝা চাপানো হয় সন্তানের কাঁধে। তার জন্য প্রতিনিয়ত কঠোর অনুশাসনে বেঁধে দেওয়া হয় সন্তানকে। সফল না হলেই যেখানে ‘মুখ পুড়বে’, সেখানে ব্যর্থতাকে ভয় পেতে শুরু করে শিশু।’ তাঁর মতে, নিত্যদিন বাবা-মায়ের গঞ্জনা, ভুলের ইতিবৃত্ত, ‘লোকে কী বলবে’-র পাহাড়প্রমাণ চাপ সামলে বহু কিশোর-কিশোরী খুব দ্রুত জীবনের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। যে নিয়মিত কোনও বিষয়ে ভালো করে, তার ফল কোনও বছর একটু এদিক ওদিক হলেই বাবা-মা সব খোয়ানোর ভয় পান। আত্মীয়রা বাঁকা
হাসেন, প্রতিবেশীরা ছদ্ম সহানুভূতি দেখান। এমনকী শিক্ষক ও বন্ধুরাও কখনও কখনও ‘টিজ’ করে! নিজের ব্যর্থতার জন্য এতগুলো নেতিবাচক পরিবেশ তৈরি হবে ভাবলেই তাদের ভিতর একটা ভয় বাসা বাঁধে। আত্মহত্যার প্রবণতা ট্রিগার করে। তাই সাফল্য ও র্যাঙ্ক করা গুলিয়ে ফেলা যাবে না। যে শিশুর যেটুকু ক্ষমতা সেটুকু নিয়েই সে এগবে। তাছাড়া সন্তানের সাফল্য কোন পথে আসবে সেটা খুঁজে বের করাও ‘গুড পেরেন্টিং’-এর অংশ।
কোন পথে সফল
ছেলে বা মেয়ের লেখাপড়ায় মন নেই? তাহলে প্রথাগত পড়াশোনা শেষ করে ওর পছন্দের বিষয়ে এগিয়ে যেতে দিন। হতে পারে সেটা নাচ, গান, আঁকা, খেলাধুলার জগৎ, নাটক, ফোটোগ্রাফি, স্ট্যান্ড আপ কমেডি, অন্যান্য শিল্পকলা বা কোনও বিশেষ গুণ। পড়াশোনাই এই যুগের কেরিয়ার নয়। বরং বহু মানুষ পড়াশোনা কোনওক্রমে শেষ করেও জীবনে চূড়ান্ত সফল তাঁর বিশেষ গুণ দিয়ে। উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি বোঝালেন ত্রিধা। ‘দেখা গেল, কারও সন্তান ভালো গান করেন। কিন্তু মা-বাবা চান, তাকে নিট-এ বসতে হবে বা অল ইন্ডিয়া ইঞ্জিনিয়ারিং-এর পরীক্ষা দিতে হবে! এতে সে না হয় ভালো চিকিৎসক বা ইঞ্জিনিয়ার, না নিজের স্বপ্ন সত্যি করতে পারে! এই হতাশার ব্যাগেজ সারাজীবন বয়ে বেড়ায় শিশু। কেউ কেউ জীবনের সঙ্গে, মা-বাবার ইচ্ছের সঙ্গে আপস করতে করতে ‘অ্যাংগার ইস্যু’ সহ নানা জটিলতার শিকার হয়।’
ব্যর্থতার সঙ্গে পরিচয় দরকার
জীবনের নানা বাঁকে দেখা যায় ছোট থেকে সন্তান সাফল্যের পিছনে ধাওয়া করতে গিয়ে প্রত্যাখ্যান বা ব্যর্থতা মানতে পারে না। সবকিছুকেই নিজের ‘প্রাপ্য’ বলে ধরে নেয়। কিছু চেয়েও না পেলে তার ইগো আহত হয়। এমনকী, প্রেমজ সম্পর্কের ক্ষেত্রেও প্রত্যাখ্যানকে ‘হেরে যাওয়া’ বলে ধরে নেয়। তাই হয় হীনমন্যতায় ভুগে অবসাদের শিকার হয় নয়তো অকারণ, জেদ, রাগ তৈরি হয়ে ভুল পথে পা বাড়ায়। তাই ছোট থেকেই সন্তানকে খুব স্বাভাবিক ও সাধারণভাবে বড় করে তুলুন। আর পাঁচজনের মতো সে যেন ব্যর্থতাকেও সহজে গ্রহণ করতে পারে সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি। বিশেষজ্ঞের মতে, ‘পৃথিবী কঠিন ঠাঁই। সেখানে সকলের জীবনে ওঠাপড়া থাকবে। তাই শৈশব থেকেই ব্যর্থতার সম্মুখীন হতে শেখাতে হবে। তার চেয়েও জরুরি, সেই ব্যর্থতার পথ পেরিয়ে নতুনভাবে প্রস্তুতি নেওয়ার শিক্ষা। ব্যর্থ না হলে সাফল্যের আসল স্বাদও সে পাবে না। তাই বাবা-মায়েরও উচিত নিজেদের ব্যর্থতা নিয়ে সন্তানের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করা। এতে সে নিজেও তার ব্যর্থতাগুলো আপনার সামনে প্রকাশ করার সাহস পাবে।’
সন্তান ব্যর্থ হলে কী করবেন
যে কোনও প্রতিযোগিতা ও জীবনের
নানা ক্ষেত্রে হার-জিত থাকে। সেটিই প্রথম হলে বুঝিয়ে দিতে হবে। এরপরেও একাধিকবার ব্যর্থ হলে সমস্যা কোথায় সেটা আগে খুঁজে বের করুন। বন্ধুর মতো পাশে দাঁড়ান। সন্তান যেন এটুকু বোঝে যে ব্যর্থ হলেই জীবন শেষ হয়ে যায় না।
বয়ঃসন্ধির কাছাকাছি পৌঁছলে সন্তানের মধ্যে ব্যর্থতাজনিত অবসাদ তৈরি হতে পারে। তার জীবনযাপনের দিকে খেয়াল রাখুন। ঠিক সময়ে খাচ্ছে কি না, মাদকে আসক্ত হয়ে পড়ছে কি না, বন্ধুবান্ধবদের গণ্ডি ভালো কি না, এগুলো খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। সন্তানের সঙ্গে গল্প করতে বসলেই তার ভিতরের অবসাদ টের পাবেন। সন্তানকে অনেক বেশি সময় দিতে হবে। এই সময় বহু সন্তান মা-বাবাকে এড়িয়ে যেতে শুরু করে। জোর করে কিছু জানতে চাইলেও বলতে চায় না। তখন হাল ছেড়ে দেবেন না। বরং নিজেদের সমস্যা মনখারাপ তার সঙ্গে ভাগ করুন। এতে সে ফ্যামিলি বন্ডিং শিখবে, নিজের সমস্যা নিয়েও মুখ খুলতে পারবে।
সন্তানকে সাক্ষী রেখে তার ব্যর্থতা নিয়ে কঠিনভাবে বাইরের লোকের সামনে আলোচনা করবেন না।
ব্যর্থ হলেই শাসন, দোষারোপ ঠিক নয়। বরং সারাবছর প্রয়োজনীয় আদর ও অনুশাসনে রাখুন যাতে সন্তান ব্যর্থ হতে হতে পিছিয়ে না পড়ে।
সকলের সন্তান একশোয় একশো পায় না। প্রত্যেকের মস্তিষ্কের গ্রহণক্ষমতা আলাদা। মনোযোগ, বুদ্ধি সবকিছুর উপর ফল নির্ভর করে। তাই তুলনা টানবেন না। অনেকেই বলেন, ‘ও মন দেয় না তাই পারে না!’, সেক্ষেত্রে ওর মনোযোগ বাড়ানোর চেষ্টা করুন। কিন্তু তা নিয়ে চাপ দেবেন না।
সন্তান ব্যর্থ হলে শুধু বকাঝকা করলেই চলবে না। কেন ব্যর্থ হচ্ছে, কোথায় সমস্যা এই প্রশ্নের উত্তরগুলো খুঁজে বের করতে হবে। তাকে বোঝার চেষ্টা করুন। সন্তান ভুল পথে গেলে তাকে যুক্তি দিয়ে বোঝান, কেন সেই পথ তার পক্ষে ক্ষতিকর।
সন্তানের সঙ্গে শৈশব থেকেই সহজভাবে মিশুন। হঠাৎ একটা বয়সের পর বন্ধু হয়ে ব্যর্থতা ভাগ করতে বললে সন্তান আপনাকে বিশ্বাস ও ভরসা করবে না।