


বিদ্যুৎ পাতর: গত কয়েক বছর ধরে বাংলার অন্যতম বড়ো জনআলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে শিক্ষক সমাজের সংকট। একসময় যাঁরা সমাজের বৌদ্ধিক ও নৈতিক ভিত্তি হিসেবে সর্বাধিক সম্মানিত ছিলেন, আজ সেই শিক্ষক সমাজই ক্রমশ অনিশ্চয়তা, অবমূল্যায়ন, চাকরির নিরাপত্তাহীনতা এবং প্রশাসনিক জটিলতার চাপে সবচেয়ে বিপন্ন পেশাগুলির একটিতে পরিণত হয়েছে। কিন্তু বাংলার ইতিহাসে শিক্ষকদের অবস্থান কখনোই এমন ছিল না। বাংলার ইতিহাসে শিক্ষক শুধু পাঠ্যবইয়ের পাঠদাতা ছিলেন না। তিনি ছিলেন সমাজের স্মৃতিরক্ষক, ভাষার নির্মাতা এবং জাতির আত্মপরিচয়ের স্থপতি। বঙ্গীয় নবজাগরণের বৌদ্ধিক আলো থেকে শুরু করে জাতীয়তাবাদের উত্থান, স্বদেশি আন্দোলনের চেতনা, এমনকি দেশভাগ-উত্তর উদ্বাস্তু সমাজের পুনর্গঠন পর্যন্ত প্রতিটি ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে ‘মাস্টারমশাই’ ছিলেন কেন্দ্রীয় শক্তি। গ্রামের স্কুলশিক্ষক বহু ক্ষেত্রে শুধু অঙ্ক বা ইতিহাস শেখাননি, তিনি প্রথম প্রজন্মের শিক্ষিত সমাজ তৈরি করেছেন। আত্মসম্মান শিখিয়েছেন, যুক্তিবাদ শিখিয়েছেন, ভাষাকে শাণিত করেছেন। একটি ভাঙা, দরিদ্র কিংবা বিভক্ত সমাজকে বারবার জোড়া লাগানোর কাজ করেছেন তাঁরাই। বাংলার মধ্যবিত্ত সংস্কৃতি, বৌদ্ধিক পরিসর এবং সামাজিক গতিশীলতার ভিত গড়ে উঠেছিল মূলত এই শিক্ষকসমাজকে কেন্দ্র করেই। তাই ‘মাস্টারমশাই’-এর পতন কেবল একটি পেশার অবক্ষয় নয়। বুদ্ধিবৃত্তিক আত্মবিশ্বাসের সংকট এবং একইসঙ্গে সমাজের নৈতিক কেন্দ্র হারিয়ে ফেলার সংকেত। যে সমাজ তার শিক্ষককে দুর্বল হতে দেয়, সে সমাজ শেষ পর্যন্ত নিজেকেই দুর্বল করে ফেলে।
বাংলা সমাজে ‘মাস্টারমশাই’ কোনো যুগেই শুধু একটি পেশাগত পরিচয় ছিল না, ছিল সামাজিক প্রতিষ্ঠান। শিক্ষক ছিলেন গ্রামের নৈতিক কেন্দ্র, শহরের বুদ্ধিবৃত্তিক অভিভাবক। জমিদার, উকিল, ডাক্তারদের পাশাপাশি তিনিই ছিলেন সমাজের মতামত নির্মাতা। বহু ক্ষেত্রে তিনিই ছিলেন প্রথম প্রজন্মের শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বাঙালির মুখ। কিন্তু আজ সেই মাস্টারমশাই ধীরে ধীরে পরিণত হয়েছেন কেবল এক “সার্ভিস হোল্ডার”-এ। তবে এই পতন আকস্মিক নয়, বাংলার দীর্ঘ সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক রূপান্তরের নির্মম ফল।
একসময় জ্ঞান ছিল ক্ষমতার প্রধান উৎস! তাই শিক্ষকও ছিলেন সমাজের সম্মান ও নেতৃত্বের কেন্দ্রে। পরিবারে, সমাজে, এমনকি জনজীবনের নৈতিক দিশা নির্ধারণেও ‘মাস্টারমশাই’-এর ভূমিকা ছিল বিশেষ। কিন্তু উদারীকরণ-পরবর্তী অর্থনীতি সেই ক্ষমতার কেন্দ্রকে ধীরে ধীরে সরিয়ে নিয়ে গেল বাজার, কর্পোরেট চাকরি ও ভোগবাদী সাফল্যের দিকে। জ্ঞানের সামাজিক মর্যাদা কমল, অর্থনৈতিক সাফল্য হয়ে উঠল প্রধান মানদণ্ড। ফলে শিক্ষক আর সমাজের সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তি রইলেন না! যাঁকে একসময় আদর্শ হিসেবে দেখা হত, অনেক ক্ষেত্রে তাঁকেই এখন ব্যর্থ মধ্যবিত্তের প্রতীক হিসেবে বিচার করা হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শিক্ষাব্যবস্থার দীর্ঘ রাজনৈতিকীকরণ। বিশেষত বাম আমলে দলীয় আনুগত্য ও মতাদর্শিক নিয়ন্ত্রণের সংস্কৃতি শিক্ষাঙ্গনের ভিতরে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছিল। পরবর্তী সরকারও অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেই কাঠামো ভাঙার বদলে নিজেদের স্বার্থে তাকে আরও গভীর করেছে। ফলে বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ধীরে ধীরে মেধা, গবেষণা ও স্বাধীন চিন্তার ক্ষেত্র থেকে সরে গিয়ে রাজনৈতিক প্রভাব ও আনুগত্যের পরিসরে পরিণত হয়েছে।
এই অবক্ষয়ের দ্বিতীয় স্তম্ভ সরকারি বিদ্যালয় ব্যবস্থার ক্রমাগত দুর্বল হয়ে পড়া। বাংলার ভাঙাচোরা সরকারি স্কুল থেকেই একসময় পণ্ডিত, সাহিত্যিক, বিজ্ঞানী, প্রশাসক তৈরি হত। কারণ সেই বিদ্যালয়গুলির ভিত ছিল শিক্ষক। কিন্তু আজ বহু সরকারি বিদ্যালয় টিকে থাকার সংগ্রামে ব্যস্ত। ছাত্রসংখ্যা কমছে, মধ্যবিত্ত ইংরেজিমাধ্যমে সরে যাচ্ছে, অবকাঠামো দুর্বল থেকে দুর্বলতর হয়ে পড়েছে। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হল জনমানসে সরকারি শিক্ষার প্রতি আস্থা ভেঙে পড়েছে। যখন একটি সমাজ তার স্কুলের উপর বিশ্বাস হারায়, তখন সেই সমাজ আসলে নিজের ভবিষ্যতের উপরই আস্থা হারায়।
কিন্তু সংকটের সবচেয়ে বিপজ্জনক জায়গাটি অন্যত্র। শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ার উপর জনবিশ্বাস প্রায় ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। দুর্নীতি, রাজনৈতিক প্রভাব, আর্থিক লেনদেন, আদালত পর্যন্ত গড়ানো বিতর্ক শিক্ষকতার নৈতিক ভিত্তিকে গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। আজ একজন নতুন শিক্ষককে অভিনন্দনের আগে প্রশ্ন করা হয়, ‘চাকরিটা কীভাবে পেলেন এবং কত টাকায় লাগল?’ এই প্রশ্ন শুধু ব্যক্তিগত অপমান নয়! গোটা শিক্ষকসমাজের সামাজিক বৈধতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে চলেছে।
আর এখানেই বাংলার ট্র্যাজেডি সবচেয়ে স্পষ্ট। যে শিক্ষক একসময় সমাজকে নৈতিকতা শেখাতেন, তিনিই আজ সমাজের সন্দেহের কেন্দ্রে। যিনি একসময় ক্ষমতাকে প্রশ্ন করতেন, তিনি নিজেই প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে বন্দি। শিক্ষক সংগঠন, বদলি, নিয়োগ, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ, প্রতিষ্ঠানের সংস্কৃতি সবকিছু ধীরে ধীরে দলীয় প্রভাবের আওতায় এসেছে। ফলে শিক্ষক তাঁর স্বাধীন সামাজিক অবস্থান হারিয়েছেন। ‘মাস্টারমশাই’ আর সমাজের বিবেক নন! বহু ক্ষেত্রে তিনি হয়ে উঠেছেন ব্যবস্থার একটি ক্লান্ত অংশ— ‘পার্ট অব দি সিস্টেম’।
তবে, দায় শুধু রাষ্ট্র বা রাজনীতির নয়। সমাজও কম দায়ী নয়। বাঙালি দীর্ঘদিন শিক্ষকদের কাছ থেকে আদর্শবাদ, আত্মত্যাগ ও নৈতিকতার প্রত্যাশা করেছে, কিন্তু তাঁদের আর্থিক, সামাজিক ও পেশাগত মর্যাদা রক্ষায় কার্যত ব্যর্থ হয়েছে। শিক্ষককে ফুল দেওয়া হয়েছে, কিন্তু নিরাপত্তা নয়। ফলে আজকের শিক্ষক এক দ্বৈত সংকটে দাঁড়িয়ে। তিনি না আগের মতো সামাজিক কর্তৃত্বসম্পন্ন, না নতুন অর্থনৈতিক কাঠামোয় বিশেষ প্রভাবশালী। প্রশাসনিক কাজ, অনলাইন আপলোড, রিপোর্ট, দপ্তরীয় নির্দেশ ও রাজনৈতিক চাপের মধ্যে বহু শিক্ষক আজ মূল কাজ অর্থাৎ শিক্ষাদান থেকেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছেন। শিক্ষকতা ক্রমশ পেশা থেকে চাকরিতে নেমে এসেছে।
তবু সবকিছুর পরেও একটি সত্য রয়ে গিয়েছে। এখনও বাংলার হাজার হাজার শিক্ষক সীমিত পরিকাঠামো, সামাজিক অবমূল্যায়ন ও প্রশাসনিক অপমানের মধ্যেও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে চলেছেন। তাঁদের কারণেই এই শিক্ষাব্যবস্থার ভিত পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি। রাষ্ট্র হয়তো তাঁদের মর্যাদা দেয়নি, সমাজ হয়তো ভুলে গিয়েছে, কিন্তু বহু জায়গায় এখনও একজন শিক্ষকই প্রথম মানুষ যিনি কোনো দরিদ্র ছাত্রকে বলেন- “তুই পারবি।”
একথাও সত্য যে, ব্যক্তিগত নিষ্ঠা দিয়ে ঐতিহাসিক সংকটের সমাধান হয় না। প্রয়োজন কাঠামোগত পরিবর্তন। স্বচ্ছ নিয়োগ, বিদ্যালয়ের বাস্তব উন্নয়ন, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কমানো এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে সমাজে শিক্ষার মূল্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা ছাড়া এই সংকট কাটবে না।
কারণ সত্যিটা কঠিন। গত কয়েক দশকে বাংলার “মাস্টারমশাই” রাষ্ট্রের হাতে অপমানিত হয়েছেন, সমাজের কাছে অবমূল্যায়িত হয়েছেন এবং বহু ক্ষেত্রে স্বেচ্ছায় দলীয় আনুগত্যের মধ্যেও নিজেকে ক্ষয় করেছেন।
একথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, হ্যাঁ, আপনি মার খেয়েছেন, রাস্তায় অপমানিত হয়েছেন, লাঞ্ছিত হয়েছেন! বছরের পর বছর অবহেলা, অবমাননা ও অসহনীয় যন্ত্রণা নীরবে বহন করে চলেছেন। আপনি সব দেখেছেন মাস্টারমশাই। এবার প্রশ্ন একটিই। আপনি, আপনারা কি ঘুরে দাঁড়াবেন! আবার পথ দেখাবেন? আপনার ভিত্তি তো অন্য কোথাও নয়। আপনার পূর্বসূরি চৈতন্য, বিদ্যাসাগর, আশুতোষ, সূর্য সেন। বাংলার বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড়ো ধারক ছিলেন শিক্ষকরা। আপনার হিরোদের লিগ্যাসি যখন আপনার নিজের ঘরেই আছে, তখন অন্য পেশার সাফল্য ধার করে আত্মমর্যাদা খুঁজতে হবে কেন?
লেখক অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ,
বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় (মতামত ব্যক্তিগত)