


বিশ্বজিৎ দাস, কলকাতা: পৃথিবীর পরবর্তী মহামারী ঘটাবে ‘অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স’। এমনই বলছেন চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা। তাঁরা এও বলছেন, রক্ষা পাওয়ার শর্ত একটাই—নির্বিচারে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে লাগাম টানা। ব্যবহার হবে নিয়ন্ত্রিত, প্রয়োজনীয় এবং আদর্শ নিয়ম মেনে। অনেকেই বিশ্বাস করতে পারছিলেন না, এত সহজে কি ভবিষ্যৎ মহামারী আটকানো সম্ভব? তা যে সম্ভব, প্রমাণিত হল হাতেকলমে। ২০২৩-২৪ ও ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে রাজ্যজুড়ে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স নিয়ে সমীক্ষা করে স্বাস্থ্যভবন। তাতে যেমন দেখা গিয়েছিল, অর্ধেকের বেশি (৫৫ শতাংশ) অ্যান্টিবায়োটিকের ‘রেজিস্ট্যান্স’ বেড়েছে, ঠিক তেমনই লক্ষ্য করা গিয়েছে শিক্ষণীয় একটি বিষয়। খুব কম ব্যবহার হলে সেই অ্যান্টিবায়োটিকগুলি স্বমহিমায় ফেরে। আবিষ্কারের শুরুর দিনগুলির মতোই সক্রিয় হয়ে ওঠে ব্যাকটেরিয়া দমনে।
পাঁচের দশকে আবিষ্কৃত অ্যান্টিবায়োটিক টেট্রাসাইক্লিন কলেরা, প্লেগ, ম্যালেরিয়া, সিফিলিসের মতো বিভিন্ন জটিল রোগ দমনে ‘হিরো’ হয়ে উঠেছিল সাত, আট ও নয়ের দশকে। অতি ব্যবহারে রেজিস্ট্যান্ট হয়ে পড়ায় এর ব্যবহার কমতে কমতে তলানিতে ঠেকেছিল। কম ব্যবহারের ফলে দীর্ঘ চার-পাঁচ দশক পরে ফের ফর্মে ফিরেছে টেট্রাসাইক্লিনের মতো একদা ঘরে ঘরে জনপ্রিয় একগুচ্ছ অ্যান্টিবায়োটিক। যেমন ডক্সিসাইক্লিন, নাইট্রোফুরানটয়েন ইত্যাদি।
স্বাস্থ্যদপ্তরের এক শীর্ষ সূত্র জানিয়েছে, প্রাণঘাতী অসুখ থামাতে তিনটি ভাগে ভাগ করা হয় প্রচলিত অ্যান্টিবায়োটিককুলকে। ‘অ্যাকসেস’, ‘ওয়াচ’ ‘রিজার্ভ’ গ্রুপ। ‘অ্যাকসেস’ গ্রুপের অ্যান্টিবায়োটিকগুলিই সচরাচর ব্যাকটেরিয়া দমনে ব্যবহার করা হয়। ‘ওয়াচ’ গ্রুপের অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করতে হয় সতর্কভাবে, বুঝেশুনে। আর ‘রিজার্ভ’ গ্রুপের অ্যান্টিবায়োটিকগুলি হল মরণাপন্ন রোগীর প্রাণ বাঁচানোর শেষ অস্ত্র। যেমন ইচ্ছা ব্যবহার নিষিদ্ধ। সচরাচর অ্যাক্সেস গ্রুপের অ্যান্টিবায়োটিকগুলিই মুড়ি-মিছরির মতো ব্যবহার চলত। বাকি দুটি গ্রুপের নিয়ন্ত্রিত অ্যান্টিবায়োটিকগুলির ব্যবহার প্রেসক্রিপশনে বেড়ে যাওয়ায় অতিব্যবহার থেকে রক্ষা পেয়েছে অ্যাক্সেস গ্রুপের বেশিরভাগ অ্যান্টিবায়োটিক। ফলে রেজিস্ট্যান্স কমে গিয়ে ফের রোগ দমন করছে তারা।
এই গ্রুপে রয়েছে অ্যামক্সিসিলিন ও ক্ল্যাভিউলেনিক অ্যাসিড (একাধিক অসুখে ব্যবহৃত হয়), টেট্রাসাইক্লিন (কলেরা, পেটের অসুখ ও অন্যান্য), সেফালেক্সিন (ফুসফুসের সংক্রমণ), ডক্সিসাইক্লিন (শ্বাসনালীর নীচের অংশে সংক্রমণ), অ্যামিকাসিন (ইউটিআই), অ্যামপিসিলিন (ঘা, ফোঁড়া), জেন্টামাইসিন (ইউরিন ইনফেকশন) প্রভৃতি একসময়ের সাড়া জাগানো সব অ্যান্টিবায়োটিক। স্বাস্থ্যদপ্তরের সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, ২০২৩-২৪ সালের তুলনায় ২০২৪-২৫ সালে ‘অ্যাকসেস’ গ্রুপের ১৬টি ওষুধের মধ্যে ১২টিরই রেজিস্ট্যান্স কমেছে।
যেমন, সেফালেক্সিনের রেজিস্ট্যান্স কমেছে প্রায় ১২ শতাংশ! ডক্সিসাইক্লিনের সাড়ে ৪ শতাংশ, অ্যামিকাসিনের প্রায় ৩ শতাংশ, জেন্টামাইসিনের ৩.৬০ শতাংশ, টেট্রাসাইক্লিনেরনের আড়াই শতাংশ। কিন্তু প্রেসক্রিপশন অডিটের কাজ করতে গিয়েছে কিছু চিকিৎসকের ভয়ঙ্কর প্রবণতাও লক্ষ্য করেছে স্বাস্থ্যদপ্তর।
এক পদস্থ স্বাস্থ্যকর্তা বলেন, তৃতীয় প্রজন্মের অ্যান্টিবায়োটিক মেরোপেনেম চিকিৎসকদের শেষ অস্ত্রের অন্যতম। কিন্তু তারই ওরাল ট্যাবলেট ফারোপেনেম লেখা হচ্ছে মুড়ি-মুড়কির মতো। আর একটি শেষ অস্ত্র হল লিনেজোলিড। প্রাণঘাতী লাং ইনফেকশনে রোগীর প্রাণ বাঁচাতে ব্যবহার আইসিইউতে ব্যবহার করা হয়। দেখছি, বিভিন্ন জেলায় বাড়িতে থাকা রোগীকেও এই ‘ব্রহ্মাস্ত্র’ ব্যবহার করতে বলছেন কিছু চিকিৎসক। কিছু ওষুধের দোকানে বিনা প্রেসক্রিপশনে এই ওষুধ বিক্রিও হচ্ছে। কারা এই কাজ করছেন, ঠিক বের করে ফেলব আমরা। বলছিলেন ওই স্বাস্থ্যকর্তা।