


ষড়যন্ত্রের জবাব ভোটযন্ত্রে পশ্চিমবঙ্গসহ দেশের মোট পাঁচ জায়গায় বিধানসভা নির্বাচনের ঘোষণা হয়েছে গত ১৫ মার্চ। দুটি রাজ্য কেরল ও অসম এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল পুদুচেরিতে একদফায় ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়ে গিয়েছে ইতিমধ্যেই গতকাল বৃহস্পতিবার। আগামী ২৩ তারিখ একদফায় ভোট নেওয়া হবে তামিলনাড়ুতে। একমাত্র বাংলায় দুই দফায় ভোটগ্রহণ আগামী ২৩ ও ২৯ এপ্রিল। পশ্চিমবঙ্গে প্রথম ও দ্বিতীয় দফা ভোটগ্রহণের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়েছে যথাক্রমে ৩০ মার্চ ও ২ এপ্রিল। এরাজ্যের মোট ২৯৪টি আসনের জন্য মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষদিন আজ শুক্রবার (১০ এপ্রিল)। প্রথম দফা নির্বাচনের মনোনয়নপত্র পেশের সময়সীমা অতিক্রান্ত হয়েছে গত ৭ তারিখ। এসআইআরের সৌজন্যে এরাজ্যের ৯০ লক্ষাধিক নাগরিকের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ হয়ে গিয়েছে। এছাড়া বিচারাধীন (আন্ডার অ্যাডজুডিকেশন) রাখা হয়েছিল ৬০ লক্ষাধিক নাম। সেগুলির ভিতরে সওয়া ২৭ লক্ষাধিকের ‘মামলার’ নিষ্পত্তি হয়ে গিয়েছে বলে খবর। অর্থাৎ এখনো কয়েক লক্ষ নামের কোনোরকম নিষ্পত্তি জাতীয় নির্বাচন কমিশন (ইসিআই) করতে পারেনি, এত এত নাম বিচারাধীনই রেখে দেওয়া হয়েছে!
‘বিচারাধীন’ ভোটারদের নাম বাদ গেলে তাঁরা অ্যাপিলেট ট্রাইবুনালে আবেদন করতে পারবেন। সুপ্রিম কোর্ট এমনটাই জানিয়েছে। সেইমতো রাজ্যে একাধিক ট্রাইবুনালও গঠিত হয়েছে। কিন্তু, সেখানে বিচার শেষে কতজন এবার ভোট দিতে পারবেন? সেটাই এখন লাখ টাকার প্রশ্ন। অর্থাৎ চরম অনিশ্চয়তাকে সঙ্গী করে দিয়েই রাজ্যবাসীকে ভোটের ময়দানে নামিয়ে দিয়েছেন জ্ঞানেশ কুমার! ভেবে দেখার বিষয়, এরাজ্যের প্রতিটি উপযুক্ত ভোটার শুধু ভোটদানের অধিকারী নন, নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করারও অধিকার রয়েছে তাঁদের। এদেশের প্রধানমন্ত্রী কিংবা যেকোনো মুখ্যমন্ত্রীর মতো একজন সাধারণ ভোটারও নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার অধিকারী। কে বলতে পারে, সর্বাধিক সংখ্যক ভোটার কার প্রতি চূড়ান্ত ভরসা রাখবেন এবং কে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হবেন? তাহলে এই বিতর্কিত অবাঞ্ছিত এসআইআর প্রক্রিয়া কি অসংখ্য নাগরিককে সেই ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করছে না? বলা বাহুল্য, ভোটে দাঁড়ানোর স্বপ্নপূরণ দূর অস্ত, ভোটদানের অধিকারটাই কেড়ে নেওয়া হল নির্মম হাতে! একটা বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য কয়েক হাজার কোটি টাকা খরচ হয়। এই টাকা দেশের প্রতিটি মানুষের। ভোটের জন্য বিপুল লোকলশকর ব্যবহার করতে হয়। অপরিমেয় ত্যাগ স্বীকার করতে হয় স্কুলপড়ুয়া থেকে নানাধরনের শ্রমজীবী মানুষকে। নির্বাচন গণতন্ত্রের সর্ববৃহৎ ‘উৎসব’ নিঃসন্দেহে। কিন্তু এই পোড়ার দেশ প্রতিহিংসার রাজনীতির অনুশীলনে এতটাই নিষ্ঠুর যে নির্বাচনে সেই আনন্দের আবহ যৎসামান্যও অবশিষ্ট রাখে না। সংঘর্ষ থেকে রক্তক্ষয়, প্রাণহানি পর্যন্ত হয়ে থাকে।
এমন চড়া ‘দাম’ যে নির্বাচন বা ভোটের সেখানে আক্ষরিক অর্থে একজনও কেন বঞ্চিত হবেন? সংসদীয় গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে মানুষের জন্য সরকার মানুষই গড়ে দেন তাঁদের প্রত্যক্ষ ভোটদানের মাধ্যমে। সকলের ভোটদানের অধিকার সুনিশ্চিত না-হওয়া পর্যন্ত মানুষের সরকার তৈরির সুযোগ কোথায়? গোলমেলে একপেশে এসআইআর প্রক্রিয়া বিশেষভাবে বাংলার মানুষের এই মহার্ঘ সুযোগ হরণ করেছে। প্রথম দফার ভোটার তালিকা ইতিমধ্যেই ‘ফ্রোজেন’ ঘোষণা করেছে ইসিআই। ট্রাইবুনালের শুনানিতে যোগ্য প্রমাণিত হলেও এবারের নির্বাচনে নতুন করে আর কারো পক্ষে ভোট দেওয়া সম্ভব হবে না বলেও জানিয়েছে তারা। তাই দিনকয়েক বাদেই যে নির্বাচন এখানে হতে চলেছে তার স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাবে। সম্প্রতি বাংলার জননেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রশ্ন তুলেছেন, ‘মানুষ যদি ভোটই না দিতে পারে, ট্রাইবুনালের দরকার কী?’ তাঁর এই তীব্র ক্ষোভ ও প্রশ্ন যথার্থ। বহু ঝড়ঝাপটা পেরিয়ে যাঁরা শেষমেশ ভোটদানের দুর্লভপ্রায় সুযোগটা এবার পাচ্ছেন, তাঁদের উচিত এই বৃহৎ ষড়যন্ত্রের মোক্ষম জবাব ভোটযন্ত্রেই দেওয়া।