


সজল মণ্ডল, রঘুনাথপুর: ‘নম বিঘ্ন বিনিশন, হরগৌরীর নন্দন’ যে কোনো ছৌ পালার শুরুতে এই গানের সঙ্গে গণেশ বন্দনার নাচ হবেই। আর নববর্ষে হালখাতা না থাকলেও গ্ৰামীণ পুরুলিয়া মাতে সেই ছৌ নাচে। ধর্মীয় উৎসবের সঙ্গে একাকার হয়ে যায় নববর্ষ পালন।
আসলে সাবেক মানভূম তথা সমগ্র ছোটনাগপুরে বর্ষবিদায় ও বর্ষবরণের উৎসব চৈত্র সংক্রান্তির আগের দিন শুরু হয়। সেই দিন নীলকণ্ঠ মহাদেবের ব্রত। পরদিন শিবের গাজন। জেলার শৈবক্ষেত্রগুলিতে ভিড় জমে পূণ্যার্থীদের। বলা হয় পুরুলিয়ার বুধপুরের বুদ্ধেশ্বর, চিড়কার গৌরীনাথ, আনাড়ার বানেশ্বর, তেলকূপীর গদাধর হল জাগ্ৰত শিবতীর্থ। এছাড়া গোটা পুরুলিয়া জেলা জুড়েই রয়েছে অসংখ্য শিবমন্দির। সারা বৈশাখ জুড়ে কোথাও না কোথাও গাজন চলতেই থাকে। আর এই গাজনে অন্যতম বিশেষত্ব হল নীলপুজোর দিন শিবের মন্দিরে বাতি জ্বালানো। সেই বাতি প্রদীপ নয়, ভেরেণ্ডা গাছের কাঁচা ডাল। সেই ডাল গাছ থেকে ভেঙে আগুন দিলেই তা প্রদীপের মতো জ্বলতে থাকে। এই ভেরেণ্ডা গাছের বীজ থেকে বায়ো ডিজেল হয়। গাছের ডালেও প্রাকৃতিক তেল থাকে। অনেকে প্রকৃতি থেকে গৃহীত এই উপকরণ নিয়ে আলাদা করে ভাবেন না। মানভূমে আসলে পয়লা বৈশাখ নববর্ষ সেভাবে আগে মানা হত না। কৃষি এবং অরন্য প্রধান মানভূমে নববর্ষ ধরা হত পয়লা মাঘকে। সেদিন গ্ৰাম্য দেবতার পুজো দিয়ে বর্ষবরণ হত। এখনও তা হয়। কিন্তু তা বলে বাংলা নববর্ষ উপেক্ষিত হয়নি। উলটে এই সময় একগুচ্ছ নিয়ম পালনের বিধান আছে। জেলার জনজাতিরা চৈত্র সংক্রান্তির আগে আম খান না। চৈত্র সংক্রান্তির দিন পূর্বপুরুষদের উদ্দেশে সবাই যব ও ছোলার ছাতু নিবেদন করে নতুন বছরের জন্য তাঁদের আশীর্বাদ চান। একে ছাতুবাড়া বলে। এদিন আমও নিবেদন করা হয়।
পয়লা বৈশাখ শিবের ভক্তারা গাজনে মিলিত হন। জেলার আনাড়া ও মঙ্গলদা গ্ৰামে এইসময় মেলা বসে। মেলায় যাত্রাপালা হয়। ছৌ নাচ হয়। ছৌ নাচের মূল মরশুম হল বৈশাখ ও জৈষ্ঠ্য মাস। তাই নতুন বছরের আগে মহড়া সেরে রাখে দলগুলি।
অবশ্য বাংলার অন্যান্য অংশের সঙ্গে মানভূমের নববর্ষে যে আগাগোড়া ফারাক আছে, এমন নয়। ওই বিশেষ দিনে হালখাতা করতে আসা ক্রেতাদের মিষ্টির প্যাকেট দিয়ে শুভেচ্ছা জানান ব্যবসায়ীরা। আর জঙ্গলমহলের পুরুলিয়ায় বৈশাখের পয়লা দিনে গ্ৰামে শুরু হয় শিব বা বিষ্ণুকে ছোলা গুড় নিবেদনের ব্রত। গোটা বৈশাখ জুড়ে চলে এই ভোগ নিবেদন। চলে হরিনাম সংকীর্তন।