


প্রদীপ্ত দত্ত, শিলদা: সময়টা ২০২২ সাল। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বেলপাহাড়ীতে জনসভা সেরে ঝাড়গ্রাম আসছিলেন। আসার পথে পড়ে বিনপুর-১ ব্লকের শিলদা। কাছেই মাগুরিয়া গ্রাম। রাস্তার ধারে একটি চপের দোকান দেখে গাড়ি থেকে নেমে পড়েন মমতা। সটান ঢুকে পড়েন দোকানে। তখন কড়াইয়ে চপ ভাজছিলেন বছর তিরিশের যুবক বুদ্ধদেব মহান্তি। দোকানের মালিক তিনি। আচমকা রাজ্য প্রশাসনের শীর্ষ কর্ত্রীকে দেখে ভ্যাবাচেকা খেয়ে যান বুদ্ধদেব। ঘোর কাটতে না কাটতেই সেই কড়াইয়ে চপ ভাজতে শুরু করে দেন মুখ্যমন্ত্রী। রাতারাতি ‘সেলিব্রিটি’ হয়ে যান বুদ্ধদেব। প্রায় চার বছর পর আজও সেই স্মৃতি তাজা তাঁর মনে। জীবনভর তাজা রাখতে সযত্নে গুছিয়ে রেখেছেন মমতার স্পর্শ পাওয়া সেই কড়াই, সেই খুন্তি। গচ্ছিত রেখেছেন সেদিনের চপ বিক্রির দেড় হাজার টাকাও!
তখন অবশ্য ভোট ছিল না। ওই বছর ১৪ নভেম্বর মুখ্যমন্ত্রী বেলপাহাড়ীতে এসেছিলেন আদিবাসীদের প্রাতঃস্মরণীয় নেতা বীরসা মুন্ডার জন্মদিনে। এখন বাংলায় ভোট মরশুম। জঙ্গলমহলেও প্রচার পর্ব তুঙ্গে। প্রচারে আসতে পারেন মুখ্যমন্ত্রীও। তাঁর সেই চপ ভাজার স্মৃতিকে একবার ঝালিয়ে নিয়ে বুদ্ধদেবের দোকানে ভিড় বাড়ছে স্থানীয়দের। চাহিদা মেটাতে হিমশিম অবস্থা তাঁর। সেই ভিড় দেখে স্থানীয় অনেক তৃণমূল নেতা বলছেন, ‘মমতা অনন্য এই একটাই কারণে—তিনি সাবলীলভাবে মিশে যেতে পরেন সবার সঙ্গেই।’
সেদিন এভবে মিশে গিয়েছিলেন বলে আজও মাগুরিয়া বাজারের সঙ্গে নাম জড়িয়ে গিয়েছে মমতার। বুদ্ধদেবের চপের দোকানে বসলে একটু অহঙ্কার বোধ করেন স্থানীয়রা। পর্যটকরাও জনদহিজুড়ি-শিলদার পথে এলেই মাগুরিয়ার বাজারে গাড়ি থামান। খোঁজ নেন, মুখ্যমন্ত্রী কোন দোকানে এসেছিলেন। বনমন্ত্রী তথা বীনপুর বিধানসভার প্রার্থী বীরবাহা হাঁসদার বাড়ি এই গ্ৰামেই। তিনি বাড়ি এলে বুদ্ধের দোকানে চপ কেনেন। জনসংযোগেও বাড়তি সুবিধা পান।
সোমবার সকালে দোকানে চপ ভাজছিলেন বুদ্ধদেব। কথায় কথায় বলছিলেন, ‘সে সময় একটা ঝুপড়ির মধ্যে চা আর চপ বিক্রি করতাম। সেদিনের স্মৃতি এখনও টাটকা। আমৃত্যু টাটকাই থাকবে। মুখ্যমন্ত্রীর বিশাল কনভয় দোকানের সামনে এসে থামল। আমি কড়াইয়ে চপ ভাজছিলাম। আমি তখনও বুঝে উঠতে পারিনি কি ঘটতে চলেছে! একটা ঘোরলাগা অবস্থা আমার। হঠাৎ দেখি মুখ্যমন্ত্রী আমার ঝুপড়িতে। আমার হাত থেকে খুন্তি নিয়ে চপ ভাজতে শুরু করে দিলেন। বেশকিছু চপ কিনে অনেকেই খাওয়ালেন। সে এক বড় প্রাপ্তি আমার।’
বুদ্ধদেবের ঝুপড়িতে কিছু সময় কাটিয়ে মাগুরিয়া বাজার ছাড়েন মুখ্যমন্ত্রী। সঙ্গে সঙ্গেই উনুন থেকে কড়াই-খুন্তি নিয়ে ধুয়ে ফেলেন তিনি। বলছিলেন, ‘উনি চলে যেতেই ওই কড়াইতে নতুন করে আর চপ ভাজিনি। ধুয়ে-মুছে ঘরে রেখে আসি। বাড়িতে আত্মীয়স্বজন এলে স্ত্রী উৎসাহ নিয়ে সেই খুন্তি-কড়াই দেখায়। চপ বিক্রির একটা টাকা আজও খরচ করিনি। বাইরে থেকে লোকজন এলে আমার দোকানে আসেন। মুখ্যমন্ত্রীর কথা শুনতে চান।’
বুদ্ধদেবের বাবা দিলীপ মহন্তি বলছিলেন, ‘মমতার ছোঁয়ায় আমার ছেলে এখন এলাকার পরিচিত মুখ। দোকানটা পাকা করেছে। যুবসাথী প্রকল্পের টাকা পেয়েছে দিন কয়েক আগে। সকালে চপ কিনতে এসেছিলেন ক্ষেত্রমোহন দোলই। তিনি বলছিলেন, ‘বুদ্ধর চপের দোকান এখন বিখ্যাত। লোকজন বেশ ভিড় করে।’ স্থানীয় তৃণমূল নেতার সহাস্য মন্তব্য, ‘মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতিপক্ষ ছিলেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। মাগুরিয়ার বুদ্ধদেব কিন্তু মমতার ভক্ত।’