


হিমাংশু সিংহ: মাত্র গত নভেম্বরের কথা। সবে এসআইআর শুরু হয়েছে বাংলায়। আচমকা আবিষ্কার হল, হরিয়ানার ভোটার তালিকার ২২ জায়গায় এক লাস্যময়ী বিদেশিনীর ছবি শোভা পাচ্ছে। তিনি কোথাও ‘সীমা’, কোথাও ‘সরস্বতী’ আবার কোথাও ‘সুইটি’! জ্বলজ্বল করছেন নানা নামে। ব্যাপারটা কী? চোখ কপালে উঠল দেশবাসীর। রাহুল গান্ধীসহ বিরোধীরা ভীমরবে ঝাঁপিয়ে পড়লেন ভোটচুরির অভিযোগ নিয়ে। তদন্তে জানা গেল, ওই মহিলা ব্রাজিলের একজন জনপ্রিয় হেয়ার ড্রেসার। নাম লাজিও নেরি। সোশ্যাল মিডিয়ার পরিচিত মুখ হলেও জীবনে একবারও ভারতের মাটিতে পা পর্যন্ত দেননি। তাহলে জ্ঞানেশ কুমারের সতর্ক দৃষ্টি এড়িয়ে তাঁর ছবি একবার নয়, গুনে গুনে বাইশবার ভোটার তালিকায় ঢোকাল কে? যখন দুশো ফিকির সামনে এনে লক্ষ লক্ষ যোগ্য নির্বাচকের নাম বাদ যাচ্ছে। হরেক কিসিমের বায়োডেটার চক্করে বাবা মা দাদুর সঙ্গে ম্যাপিংয়ে বিঘ্ন হলেই লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সির গেরোয় ঝুলে যাচ্ছেন বোনাফাইড নির্বাচক, তখন এই রহস্যময়ী কে? মামদোবাজি নাকি! তাঁর সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের সম্পর্ক কী? মুখ্য নির্বাচন কমিশনার ও পুরো ডেটা সেন্টারের ইনচার্জ ডিরেক্টর জেনারেল অব আইটি সেল বিতর্কিত সীমা খান্নার সম্পর্ক কী ছিল, দেশের মানুষ জানতে চাইবে না! গণতন্ত্রই মানুষকে এই অধিকার দিয়েছে। তাকে খর্ব করে কার সাধ্য?
নির্বাচন কমিশনের তুঘলকি কাণ্ডের দ্বিতীয় চমক বাংলার এসআইআর কাণ্ডে। লোকে নিজের নাম তোলাতে আসে কিংবা পরিবারের কেউ মারা গেলে নাম বাদ দিতে হাজির হয় কমিশনের সামনে। কিন্তু কস্মিনকালে শুনেছেন ‘অজ্ঞাত পরিচয়’ লোকজনের রহস্যময় আবেদনের ভিত্তিতে ১৬ লক্ষ ১০ হাজার নাম বাদ পড়েছে? এই অদৃশ্য আবেদনকারীরা কারা? গোটাটাই মামদোবাজি নাকি! নির্বাচন কমিশন নিরুত্তরই নয়, কার্যত মুখে কুলুপ এঁটে। রোজ নির্দেশ, সার্কুলার বদলে যাচ্ছে নানা অছিলায়। অথচ কার অভিযোগে ওই বিশাল পরিমাণ নাম বাদ গেল, আজও রহস্যাবৃত। গোটা দেশের মধ্যে একমাত্র বাংলার এসআইআরেই প্রথমবার লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সির আমদানির পিছনেও গভীর ষড়যন্ত্র কাজ করেছে বলে প্রথম থেকেই অভিযোগ বিরোধীদের। সেই অবিশ্বাস নিরসনে আজ পর্যন্ত কমিশন কোনো পদক্ষেপ করেনি। এমনকি, যে ২৭ লক্ষ আবেদন এখনও বিবেচনাধীন তারও নিষ্পত্তি হচ্ছে শম্বুক গতিতে। প্রায় না হওয়ার মতো করেই। এরকম চললে সম্পূর্ণ নিষ্পত্তিতে কেটে যাবে একযুগ। মন্তব্যটা কোনো ব্যক্তি কিংবা বিরোধীর নয়, খোদ আদালতের! বাংলার এসআইআর নিয়ে সুগভীর চক্রান্তের গন্ধ সেই কারণেই।
এসআইআর নিয়ে কমিশনের মধ্যে যে একটা মতভেদ চলছিল তা বোঝা গিয়েছিল গত জানুয়ারি মাসেই। জ্ঞানেশ কুমারের নির্দেশে কমিশনের নতুন সফটওয়্যার ও পোর্টাল ইসিআই নেটের যাত্রা শুরু চলতি বছরের শুরুতে। কিন্তু তার জেরে এসআইআর পর্বে ডিজিটাল নিয়ন্ত্রণের গোটাটাই সীমাবদ্ধ হয়ে যায় মাত্র কয়েকজনের হাতে। এর নেতৃত্ব দিয়েছেন জ্ঞানেশ ঘনিষ্ঠ সীমা খান্না স্বয়ং। ইআরও থেকে শুরু করে উপরের দিকে উঠতে উঠতে স্বয়ং দুই নির্বাচন কমিশনার পর্যন্ত এই ইসিআই নেটের নিয়ন্ত্রণ হাতেই পাননি। বিভিন্ন বিষয়ে দশমাসে ১৪ বার আপত্তি জানিয়েছিলেন তাঁরা। কেউ কর্ণপাতও করেনি। সব ঠিক আছে, যা চলছে তা সর্বসম্মতভাবেই—এটা দেখানোর জন্য কমিশনের শীর্ষ মহল থেকে ছয়টি যুগ্ম বিবৃতিও প্রকাশ করা হয়েছে। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের কাঁপিয়ে দেওয়া রিপোর্টেই স্পষ্ট, পদে থাকা দুই কমিশনারকে অগ্রাহ্য করে ক্ষমতা কুক্ষিগত করা হয়েছে।
গোয়ার কথাই ধরুন। ৯৭ জন ভোটারের নাম তালিকায় নথিভুক্ত করার জন্য সাতদিনে আটবার কমিশনের শীর্ষস্তরে ইমেল করেছিলেন গোয়ার মুখ্য নির্বাচনি আধিকারিক (সিইও)। কিন্তু কমিশনের তথ্য-প্রযুক্তি (আইটি) বিভাগের ডিরেক্টর জেনারেল সীমা খান্না সামান্য উত্তর দেওয়ার প্রয়োজনও দেখাননি। গোটা এসআইআর পর্বে অপর দুই নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক যোশির চেয়েও যে সীমাদেবী প্রভাবশালী ছিলেন তা শুধু বিরোধী নয়, কমিশনের অলিন্দে কান পাতলেই মালুম হয়েছে। ভোটার তালিকা থেকে শেষপর্যন্ত বাদ পড়া ৯৭ জনের নামই যুক্তিগত অসংগতি বা ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’র তালিকায় ছিল। যদিও কমিশনের সময়সীমার মধ্যেই নথিপত্র জমা দিয়ে ভোটার তালিকায় নাম তোলার আরজি জানান তাঁরা। নির্বাচনি নিবন্ধন আধিকারিকরা (ইআরও) ৯৭ জনের ক্ষেত্রেই নাম তোলার সবুজসংকেতও দেন। অভিযোগ, এরপরেও কমিশনের ইসিআই নেট সফ্টওয়্যারে তাঁদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি রহস্যময় কারণে।
নির্বাচন কমিশনের কাজ চিরদিনই নতুন যোগ্য ভোটারদের নাম তোলা। বিশেষ করে যাঁরা সদ্য আঠারো পেরিয়ে নতুন প্রজন্মের ভোটার, তাঁদের নাম তুলে ভোটদানে উৎসাহিত করাই কমিশনের প্রথম কর্তব্য। সেসব বন্ধ রেখে এই প্রথম সব কাজ ফেলে জ্ঞানেশ কুমারের ইসি যেন তেন প্রকারে নাম বাদ দেওয়াকেই ভোটের আগে দেশের অন্যতম শীর্ষ সাংবিধানিক সংস্থার পাখির চোখ করে এগিয়েছে। আর সেই গেরোয় গত দুবছর ধরে বিশেষ সামারি রিভিশন (এসএসআর) আটকে। জ্ঞানেশের ফারমানেই এসআইআরের তলায় চাপা পড়ে যায় চিরাচরিত বিশেষ সামারি রিভিশন ও নতুন যুব সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্তি। কীসের ভয়ে? দুই কমিশনার একাধিকবার আপত্তি জানিয়েও জেন-জি’দের নাম তোলার কাজ শুরু করতে ব্যর্থ হয়েছেন। স্বভাবতই প্রশ্ন উঠছে, এসআইআর আসলে জেন-জি’দের ভোটপর্ব থেকে দূরে রাখারই অত্যন্ত সুপরিকল্পিত প্রক্রিয়া ছিল কি না? কিন্তু এ কাজ কি জ্ঞানেশ একা করেছেন না পিছনে আর কারও হাত ছিল?
এটা ঠিক বর্তমান সরকারের উপর জেন জি-রা বেশ কিছুদিন ধরেই ক্ষুব্ধ। এর আগে গত জুন মাসে ডাক্তারির প্রবেশিকা পরীক্ষা ‘নিট’-এ জালিয়াতির প্রতিবাদে এবং তৎকালীন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে দিল্লির যন্তরমন্তরে ধরনায় বসেছিল ককরোচরা (সিজেপি)। সেই আন্দোলনের ধাক্কায় গোটা দেশ উত্তাল হয়েছিল। বিক্ষোভে যোগ দিয়ে অনশন পালন করেছিলেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুকও। কেঁপে গিয়েছিল সরকারের ভিত। যন্তরমন্তরের বিক্ষোভ তীব্র রূপ নিলে গত ২৫ জুলাই ইস্তফা দিতে বাধ্য হন ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান। তারপর মাত্র দু’মাস অতিবাহিত। এবারও একই কায়দায় ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ইস্তফা চেয়ে দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সলতে পাকাতে ময়দানে ককরোচ জনতা পার্টি। কেউ কেউ বলছেন, প্রথমবারের সাফল্যে উৎসাহিত হয়েই যন্তরমন্তর ভার্সন ২’-র প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছে জেন জি-রা। আবারও যদি নতুন করে আত্মপ্রকাশ করা এই জেন জি-রা নির্বাচন কমিশনকে মোক্ষম শিক্ষা দেওয়ার নাম করে সরকারকে নাস্তানাবুদ করতে সমর্থ হয়, যদি শেষপর্যন্ত জ্ঞানেশ কুমার ইস্তফা দিতে বাধ্য হন, তাহলে তা শুধু জেন জি’দের আন্দোলনের জয় হিসাবেই সূচিত হবে না, ভারতের একপেশে জাতীয় রাজনীতির মরা গাঙেও নতুন ঢেউ উঠবে। বিরোধী রাজনীতির সেই মোড় ঘোরানো অধ্যায় নতুন সম্ভাবনার জন্ম দেবে, না বিশৃঙ্খলায় উসকানি দেবে তা ভবিষ্যৎই বলবে। বাংলায় ভরাডুবির পর মনে হয়েছিল বিরোধীদের দিন বুঝি শেষ। কিন্তু গত চারমাসের ঘটনাপ্রবাহ বিজেপির পক্ষেও মোটেই খুব সুখ ও স্বস্তি বয়ে আনেনি। এই ক্ষোভের উপর দাঁড়িয়ে আরশোলাদের যেমন উত্থান হয়েছে তেমনি কংগ্রেসেরও গ্রহণযোগ্যতা কিছুটা হলেও বেড়েছে। এসআইআরের আড়ালে নির্বাচন কমিশনের ভাবের ঘরে চুরি নিয়ে বিরোধীরা প্রথম থেকেই যেমন মারমুখী, তেমনি ঐক্যবদ্ধ। সেই আগুনে মেজাজেই রাহুল গান্ধী বলেছেন, “দেশ বিরোধী কাজ করেছেন জ্ঞানেশ কুমার। নাগরিকের ভোটাধিকার কেড়েছেন মানে তিনিও দেশদ্রোহী। শাস্তি তাঁকে পেতেই হবে। সব ফাঁস করব আমরা।” এখানেই না থেমে লোকসভার বিরোধী দলনেতা বলেন, গণতন্ত্রের উপর এত বড়ো আক্রমণ আগে হয়নি। ভোট কাড়া হচ্ছে মানে গণতন্ত্রকেও ধ্বংস করা হচ্ছে। অবিলম্বে জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করে রাহুল বলেন, ‘২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচন এবং পরবর্তী বিধানসভা নির্বাচনে ভোটচুরি হয়েছে, তিনি ও তাঁর দল একশো শতাংশ নিশ্চিত।’ ভোটে চুরি, সংবিধান চুরি, আইন চুরি এবং শেষে দল চুরি... এভাবে চলতে থাকলে পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্রের আর কীই-বা অবশিষ্ট থাকে?
নির্বাচন কমিশন বিশ্বাসযোগ্যতা হারালে, তাকে দলদাস বলে দাগিয়ে দিলে ভারতীয় গণতন্ত্রের বেঁচে থাকা কঠিন। সেক্ষেত্রে সংবিধান ও সংসদ যে দুই পিলারের উপর দাঁড়িয়ে দেশটা পরিচালিত হয় তা বিপন্ন হতে বাধ্য।
কমিশনের নিরপেক্ষতা ধংস করার শুরুটা ২০২৩ সালে। যখন নির্বাচন কমিশনের উপর নিরঙ্কুশ দখল প্রতিষ্ঠায় প্রতিষ্ঠিত আইন বদলের পথে হেঁটেছিল মোদি সরকার। এর আগে পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী, সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি এবং বিরোধী দলনেতার হাতে ওই ক্ষমতা ছিল। আইন বদলে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির জায়গায় স্থান করে দেওয়া হয়েছে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার একজন সিনিয়র সদস্যের। অর্থাৎ মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের নিয়োগের ক্ষমতা এতদ্দ্বারা সম্পূর্ণ সরকারের কুক্ষিগত। আরও মনে করিয়ে দিই, এমন বিতর্কিত আইন যখন পাশ হয়েছে তখন সংসদ ছিল প্রায় বিরোধী-শূন্য। কারণ শতাধিক এমপি সাসপেন্ড ছিলেন। স্বভাবতই বিলের বিরুদ্ধে বক্তব্য রাখার সুযোগ পেয়েছিলেন হাতে গোনা কয়েকজন। সেই থেকেই নির্বাচন কমিশন কার্যত প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয়েরই আর একটা এক্সটেনশন মাত্র। সম্ভবত এসআইআরের ব্লুপ্রিন্ট তখন থেকেই চূড়ান্ত হয় গিয়েছে।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস একটা ছবি তুলে ধরেছে মাত্র। দেশ উত্তাল। এই সংক্রান্ত বিরোধীদের তাবৎ অভিযোগ ভুল প্রমাণ করার দায় এখন নির্বাচন কমিশন ও ক্ষমতাসীন সরকারের। একবার বিশ্বাস চোট খেলে বিকশিত ভারত গড়ার স্বপ্নই শুধু ধাক্কা খাবে না, যে উদার ও সবাইকে নিয়ে চলার নীতির জোরে গত আট দশক ভারত বিশ্বের আর পাঁচটা রাষ্ট্র থেকে নিজেকে আলাদা করে প্রতিষ্ঠিত করেছে তা ধ্বংস হয়ে যাবে।
নির্বাচন কমিশন বিশ্বাসযোগ্যতা হারালে পরিণতি ভয়ংকর। ভোটতন্ত্রের সর্বনাশ!