


মেহেবুব হোসেন সরকার, তপন: সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বদলাচ্ছে গ্রাম বাংলার চিরচেনা বৈশাখের রূপ। একসময় বৈশাখ মানেই ছিল চড়ক মেলা, বাউল গানের আসর, গ্রামীণ হাটের ভিড় এবং হালখাতার আমেজ, আজ সেই ছবিতে ধীরে ধীরে পড়ছে আধুনিকতার ছাপ।
দক্ষিণ দিনাজপুরের তপন ব্লকের বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে এমনই এক পরিবর্তনের চিত্র উঠে এল। বৈশাখ এখন এক দ্বৈত চিত্র বহন করছে। একদিকে হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যের হাহাকার, অন্যদিকে তাকে আঁকড়ে ধরে রাখার আন্তরিক চেষ্টা। সময়ের স্রোতে বদল এলেও, মানুষের মনে এখনও বেঁচে আছে সেই পুরনো বৈশাখের আবেগ। যা হয়তো নতুন প্রজন্মের হাত ধরেই আবার ফিরে পেতে পারে তার হারানো রূপ।
হরসুরা, গুড়াইল, জামালপুর, রামচন্দ্রপুর, রামপাড়া চেঁচড়া সহ একাধিক এলাকায় প্রবীণদের মুখে উঠে আসে স্মৃতির পাতা। রামচন্দ্রপুরের স্থানীয় বাসিন্দা বাপ্পা বর্মন বলেন, আগে বৈশাখ এলেই গ্রামে মেলা বসত, চড়ক পুতো হত। সবাই নতুন কাপড় পরত। এখন সেসব আর তেমন দেখা যায় না। এখনকার ছেলেমেয়েরা মোবাইল নিয়েই বেশি ব্যস্ত থাকে। আগে হালখাতা করতে দোকানে দোকানে লোক ভিড় করত, মিষ্টি খাওয়ানো হত। নববর্ষ মানেই ছিল হালখাতা।
শুধু মেলা বা হালখাতা নয়, একসময় পয়লা বৈশাখ মানেই ছিল ঘরে ঘরে উৎসবের আমেজ। ভোর থেকেই শুরু হতো নানা পদের রান্না, পুকুরে মাছ ধরা, সেই মাছ দিয়েই হত মধ্যাহ্নভোজন। পরিবারের সকলে মিলে খাওয়াদাওয়া, আত্মীয়-স্বজনের আনাগোনা, সব মিলিয়ে এক অন্যরকম আবহ তৈরি হতো গ্রামবাংলায়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই চিত্র অনেকটাই ফিকে হয়ে এসেছে বলে জানাচ্ছেন স্থানীয়রা।
তবে, এখনও তপনের কিছু এলাকায় টিকে আছে ঐতিহ্যের ছাপ। হরসুরা বর্মনপাড়া, করদহ কাঁটাবাড়ি এবং রামপাড়ায় এখনও পয়লা বৈশাখে চড়ক পুজোকে কেন্দ্র করে মেলার আয়োজন করা হয়। গ্রামবাসীদের অংশগ্রহণে সেই মেলা আজও আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। হরসুরা বর্মন পাড়ার বাসিন্দা গোপাল বর্মন বলেন, আমাদের এলাকায় এখনও পয়লা বৈশাখ মানেই চড়ক পুজো আর মেলা। ছোট থেকে বড় সবাই অংশ নেয়। আমরা চেষ্টা করি এই ঐতিহ্য ধরে রাখতে।’
রামপাড়ার বাসিন্দা সুভাষ সরকারের কথায়, আগের মতো জাঁকজমক না থাকলেও এখনও মেলা করি। নতুন প্রজন্মকে এসব দেখাতে চাই, যাতে তারা নিজেদের সংস্কৃতি ভুলে না যায়। অন্যদিকে, হাড়দিঘিতে ব্যবসায়ী সমিতির উদ্যোগে তরুণদের হাত ধরে এখনও ভোরবেলায় প্রভাত ফেরির আয়োজন করা হয়।
হাড়দিঘির এক উদ্যোক্তা বিকাশ দাস বলেন, নববর্ষের সকালে প্রভাত ফেরি আমাদের বহু বছরের ঐতিহ্য। তরুণরাই এখন এটা এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। সবাই মিলে অংশ নেওয়ায় আলাদা একটা আনন্দ হয়। স্থানীয়দের একাংশের মতে, কর্মব্যস্ততা, শহরমুখী জীবনযাত্রা এবং প্রযুক্তির প্রভাবেই এই পরিবর্তন। অনেকে কাজের সূত্রে বাইরে চলে যাওয়ায় গ্রামে আগের মতো জমজমাট পরিবেশ তৈরি হয় না। পাশাপাশি টেলিভিশন ও ইন্টারনেটও উৎসবের ধরন বদলে দিয়েছে।