


সুখেন্দু পাল, বর্ধমান: পুজোর দিনগুলিতে বাড়ি মাতিয়ে রাখত ছোট অরণ্য। ঘুম থেকে উঠেই পুজো মণ্ডপে ছুটে যেত। আবার কখনও দৌড়াতে দৌড়াতে মায়ের কাছে এসে কোনওকিছু দেওয়ার জন্য বায়না ধরত। সপ্তমীর ভোরে ঢাকের আওয়াজ শুনে সবার আগে তার ঘুম ভেঙে যেত। নতুন জামা পরে বন্ধুদের সঙ্গে দৌড়ে যেত। ক্লান্ত হত না। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত তার চঞ্চলতায় পুজোর দিনগুলিতে যেন অন্য এক আনন্দ ছড়িয়ে পড়ত রায় বাড়িতে। গতবছর পর্যন্ত তেমনটাই ছিল। কিন্তু এবার আর অরণ্য নেই। ভুয়ো ডাক্তারের অপারেশনের নামে চার বছরের শিশুটিকে ঠিক পুজোর আগেই ‘হত্যা’ করেছে। রায়বাড়িতে আর আনন্দ নেই।
একরত্তি অরণ্যর মা শিল্পা রায়কে ঘুমের ওষুধ খেয়েই কাটাতে হচ্ছে। পুজো মণ্ডপ দেখলেই চোখে জল আসছে তার বাবার। ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠছেন তিনি। অরণ্যর বাবা জয়ন্ত বলছিলেন, এখনও একজন চিকিৎসক গ্রেপ্তার হয়নি। তাঁর গ্রেপ্তারের দাবিতে আমরা শুক্রবার বর্ধমান থানায় গিয়েছিলাম। পুজো মণ্ডপ দেখে স্ত্রী অসুস্থ হয়ে পড়ে। বারবার মনে পড়ছিল ছেলের কথা। গত বছরও আমরা ওকে নিয়ে বর্ধমানে ঠাকুর দেখতে বেরিয়েছিলাম। এবার আমাদের সমস্ত আনন্দ কেড়ে নিয়েছে ভুয়ো ডাক্তার সাইদুল হক, চিকিৎসক বনোজ দে এবং নবাবহাটের ওই নার্সিংহোমের মালিকরা। শিল্পাদেবী বলেন, মায়ের কাছে আমি প্রার্থনা করব, আমার ছেলেকে যারা খুন করেছে তাদের যেন কঠোর সাজা হয়। আর কোনো মায়ের কোল যেন তারা খালি করতে না পারে। আমাদের সমস্ত স্বপ্ন ভেঙে দিয়েছে ওই ভুয়ো চিকিৎসকরা।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, ভুয়ো চিকিৎসক সাইদুল হক দুবাই পালিয়ে গিয়েছিল। সেখান থেকে দিল্লি ফিরে আসার পর তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। নার্সিংহোমের তিন মালিকও গ্রেপ্তার হয়েছে। আর এক চিকিৎসকের খোঁজেও তল্লাশি চলছে। তিনিই অ্যানাস্থেসিয়া দিয়েছিলেন। জেলা পুলিশের এক শীর্ষ আধিকারিক বলেন, অরণ্যর মায়ের বুকফাটা কান্না দেখে আমারই চোখে জল চলে এসেছিল। ওঁকে কথা দিয়েছিলাম, কাউকে ছাড়া হবে না। কিন্তু অরণ্যকে তো আমরা আর ফেরাতে পারব না। মা-বাবার এই হাহাকার দেখা সত্যিই কষ্টের।
পিতৃপক্ষের অবসান হয়েছে। বাংলার বাতাসে এখন উৎসবের আমেজ। মন্তেশ্বরের আকাশেও ‘বেজে উঠেছে আলোর বেণু’। কিন্তু তা যেন থমকে গিয়েছে অরণ্যদের বাড়িতে। সেখানে শুধুই বেদনার সুর। চোখ বন্ধ করলেই পরিবারের লোকজনদের সামনে ভেসে উঠছে অরণ্যর চঞ্চলতা। এই বুঝি সে মণ্ডপ থেকে দৌড়ে এসে বায়না ধরবে, ‘বাবা আমাকে বর্ধমানে ঠাকুর দেখাতে নিয়ে চলো। এখনই নিয়ে যেতে হবে। মা তুমি তৈরি হয়ে নাও।’