


‘আপনি মিসা ‘সি’ বন্দি, এখানে আপনাকে আমি রাখি কোথায় বলুন দেখি! এখানে তো ডিভিশন প্রিজনার রাখার কোনও ব্যবস্থাই নেই!’
বরুণ সেনগুপ্ত সবে এসে পৌঁছেছেন। ‘জেল’ নামে বাড়িটার সামনে হাতল ভাঙা চেয়ারে প্রখর রৌদ্রতাপে ঘর্মাক্ত শ্রান্ত দেহটা এলিয়ে ভাবছেন, কলম যখন অস্ত্র হয়ে ওঠে, সরকারের সার্কুলারও ভোঁতা হয়ে পড়ে। ‘স্বাধীন’ কমনওয়েলথ ভারতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের চরম সীমা তাঁকে জীবন দিয়ে উপভোগ করতে হবে। পরিত্যক্ত হাসপাতাল-বাড়ির নিচুতলার ঘরটা বরাদ্দ হয়েছে। নোংরায় গা ঘিন ঘিন করে। দূরের কয়েদি ঘরগুলি থেকে ঠিকরে পড়া আলোয় দেখলেন, কালো ঝুলে ট্রাপিজের খেলা দেখাচ্ছে মাকড়সার দল।
‘তাকিয়া লাও! বাঙালিবাবু শোয়ে গা!’ বাচনভঙ্গিতে মনে হয়, বাজনা বাজিয়ে জোর করে যেন কুম্ভকর্ণের ঘুম ভাঙাচ্ছে ইন্দিরা সরকার। পাশের স্যাঁতস্যাঁতে একটা জায়গায় পাইকারি মলমূত্র ত্যাগের ব্যবস্থা। তীব্র দুর্গন্ধে প্রাণ ওষ্ঠাগত। সেখানে রাত্রিবাস সাক্ষাৎ নরক যাপন! ছুটতে ছুটতে নোংরা ভাঙাচোরা একটা খাট বৃদ্ধ জেলারের সামনে রেখে অহেতুক সেলাম ঠুকল দুই কেরানিবাবু। তেলা মাথায় তেল দেওয়া তো ‘ইন্দু বিটিয়া’র জমানায় ফ্যাশন স্টেটমেন্ট!
‘সাহাব, ইয়ে আপ কে লিয়ে’।
সন্ধ্যা নেমেছে জেল-পাঁচিলের ওপারে। পুরুলিয়া জেলা কারাগারের ভিতরে দৈত্যের মতো মাথা তুলে দাঁড়িয়ে অশ্বত্থ গাছেদের মেলা।
‘জমাদার! বক্সা চেক কর!’ জেলারের কর্কশ বাজখাঁই গলায় নির্দেশ। ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে এল জমাদার। পাথরের মতো স্থির হয়ে বরুণবাবু তাকিয়ে ছিলেন নিজের নতুন ঠিকানার দিকে। তাঁর মতো সাংবাদিকের যদি এমন অবস্থা হয়, না জানি গণতন্ত্রের স্তম্ভ বিরোধী রাজনৈতিক কর্মীদের জন্য ‘মিসা’ আইনে কী বরাদ্দ রয়েছে! এই ইন্দিরা গান্ধীকেই নাকি কিছু স্তাবক সংবাদমাধ্যম বাংলাদেশ নির্মাণের জন্য ‘এশিয়ার মুক্তিসূর্য’ বলে প্রচার করে!
ভারতের শিরা-ধমণী বেয়ে শীতল চোরাস্রোতের মতো বয়ে চলেছে দুর্নীতি। বৃদ্ধ জয়প্রকাশ নারায়ণের জনতা আন্দোলন ইন্দিরা গান্ধীর সেই রাষ্ট্রদ্রোহের বিরুদ্ধে জনজাগরণ। বরুণবাবুর কলম ঈশ্বর ছাড়া কাউকেই ভয় করে না। তাই তো ‘ইমার্জেন্সি’ জারির আগেই দিল্লিতে গ্রেপ্তার হলেন। অন্দরের খবর, ইন্দিরা নন, বরুণবাবুর গ্রেপ্তারির নেপথ্যে ছিলেন বাংলার তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়।
কালো কালো নেংটিপরা কয়েকজন অবাক চোখে খানিক দূরে দাঁড়িয়ে দেখছিল বরুণবাবুকে। জটলা থেকে দু’জন এগিয়ে এল। ‘পেন্নাম রিপোর্টারবাবু! আমি মৃত্যুঞ্জয় আর ও বাসু। আপনার রান্নাবান্না, ঘর পরিষ্কার সব করে দিব। জেলারবাবু বলেচেন!’
হাসি পেল বরুণবাবুর। টিমটিমে আলোয় দেখা যাচ্ছে ঘরটা। আধখাওয়া ঝাঁটা, বিগত আসামির পরিধান, ইঁদুরের কিচকিচ... এ ঘর সাফ করা আলাদিনের জিনেরও দুঃসাধ্য। তবে আশপাশের মানুষগুলোকে দেখে বরুণবাবুর বেশ লাগল। অবনত সমাজ, শ্বাশ্বত ভারতবর্ষের প্রতিভূ! স্বামীজির কথায় এরা ভারতের চালিকাশক্তি। লকআপে ভারী বুটের শব্দ। জেলারবাবুর প্রস্থান। একটা নতুন ঝাঁটা আর বালতি রাখা। পাথরেও তবে ফুল ফোটে! প্রথম দর্শনে জেলারকে দেখে এতটা আশা করা যায়নি। রাতে ঘুম এল না। খসে পড়া দেওয়ালে মৃদু বাল্বের আলোর প্রতিফলন দেখতে দেখতে বরুণ সেনগুপ্ত হারিয়ে যেতে লাগলেন সাম্প্রতিক অতীতে।
দিল্লি অফিসে বিয়াল্লিশতম জন্মদিন। শুভেচ্ছাবার্তা এসেছে বহু সহকর্মী, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের কাছ থেকে। ঠিক পরের দিনই রাইটার্সের সোর্স দিলেন অশনি সংকেত। ঘণ্টাদুয়েকেই তড়িৎগতিতে দাপাদাপি করে এল পুলিস। হাতে ‘মিসা’ আইনানুগ গ্রেপ্তারি পরোয়ানা। সপ্তাহ তিনেক প্রেসিডেন্সি জেলে। রাইটার্সে রিপোর্ট যায়, রাজনৈতিক কর্মী-বন্ধু সমভিব্যাহারে বেশ রয়েছেন বরুণবাবু। জীবন নরক করতে পকেটমার, চোর-ছিনতাইবাজদের সঙ্গে আলিপুর জেলে একমাত্র ‘মিসা’ বন্দি রাখা হয় বরুণবাবুকেই। আড়াই মাস পরে চালান করা হল পুরুলিয়া জেলে!
জরুরি অবস্থার সুযোগ নিয়ে বরুণবাবুকে গ্রেপ্তার করেন প্রতিহিংসাপরায়ণ মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থশংকর রায়। জনসমক্ষে অপদস্থ এবং হেনস্তা করাই ছিল প্রধান উদ্দেশ্য। কারণ— সরকারের ব্যর্থতা নিয়ে জনসমক্ষে সত্য সংবাদ পরিবেশন। বরুণবাবুর অবশ্য মনে পড়ছিল পুরনো দিনের কথা। একটা সময় ছিল, বরুণবাবু মন খুলে আড্ডা দিতে যেতেন বেলতলায় সিদ্ধার্থশংকর রায়ের বাড়িতে। রাজ্য রাজনীতি, আন্তর্জাতিক ঘটনা—সমস্ত কিছু তুফান তুলত চায়ের কাপে। সিদ্ধার্থবাবুর মা অপর্ণা দেবী ছিলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ এবং বাসন্তী দেবীর জ্যেষ্ঠা কন্যা। তাই বরুণবাবুর একটা বাড়তি ভালো লাগার জায়গা তো ছিলই। কিন্তু সব ম্লান হয়ে ওঠে জরুরি অবস্থায় বরুণবাবুর গ্রেপ্তারি পরোয়ানায়।
প্রথমে একগাল ভর্তি দাড়িতে ছদ্মবেশে ছিলেন ‘জনতা’ আন্দোলনের নেতা জর্জ ফার্নান্ডেজ। পরে সেইসব ছেঁটে পুরু গোঁফ এবং হিপিদের মতো বাবরি চুল। তবু শেষরক্ষা হল না। ১৯৭৬ সালের ১০ জুন কলকাতার আস্তানা থেকে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দার দলের হাতে গ্রেপ্তার হলেন। তিহার জেলের অন্ধকারে তাঁর কণ্ঠরোধের প্রশাসনিক প্রয়াস চলতে থাকে। জয়প্রকাশ নারায়ণের ‘সম্পূর্ণ ক্রান্তি’ বিপ্লবের অন্যতম সেনাপতি জর্জের উপর সরকারি নির্যাতনের কথা চাপা থাকেনি। ৪ অক্টোবর দিল্লির চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে দাঁড়িয়ে ভারতের ‘সোশ্যালিস্ট’ পার্টির চেয়ারম্যান জর্জ ইন্দিরা সরকারের উদ্দেশে যে বক্তব্য রাখেন, সেই সাবধানবাণী সফদরজঙ্গের বাড়ির ইট-পাথর নাড়িয়ে দিয়েছিল। সরকারি ‘মিসা’ বিধি অগ্রাহ্য করে ‘শেকল বাঁধা হাত’ নামে সেই বক্তৃতা গোপনে নানা ভাষায় অনুদিত হয়ে ছেপে বিলি করা হয়।
জর্জ সেখানে নিজের কারাজীবনের বিবরণে বলেন, ‘...আপনাদের চোখের সামনে আমরা যে আজ শিকল পরে আছি, তা গোটা জাতিরই প্রতীক। এই জাতি আজ শৃঙ্খলিত এবং আমাদের দেশে চেপে বসা একনায়কত্বের দ্বারা বিধ্বস্ত। ...জেলে আমরা যে ব্যবহার পেয়েছি, এবং এখনও পাচ্ছি, তা আদৌ সন্তোষজনক নয়। গত কয়েকদিন অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলেও, রাজনৈতিক বন্দিদের ক্ষেত্রে যে ব্যবহার আশা করা উচিত, তার মতো নয়। চিকিৎসা ব্যবস্থা নামমাত্র এবং প্রয়োজনের তুলনায় খুবই সামান্য। হার্ট অ্যাটাকের জন্য কর্তৃপক্ষ দু’জনকে হাসপাতালে পাঠাতে বাধ্য হয়েছেন।’
বরোদা ডিনামাইট মামলাতেও নাম জড়িয়েছিল জর্জের। সেই মামলায় তথ্যপ্রমাণ জোরালো নয় বুঝে ইন্দিরা সরকার ‘মিসা’তে তাঁকে গ্রেপ্তার করে। তিহার জেলে বন্দি জর্জ ফার্নান্ডেজের গর্জনে ম্যাডাম প্রাইম মিনিস্টারের রুদ্রাক্ষের মালা কেঁপে উঠতে লাগল।
‘আমাদের বিরুদ্ধে পুলিস ও অন্যান্য তদন্তকারী সংস্থা নির্মম ও অশ্লীল পদ্ধতি ব্যবহার করেছে এবং আমাদের সকলকে দৈহিক ও মানসিক উৎপীড়নের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে। পুলিস রাষ্ট্রের কাছ থেকে আমরা এছাড়া আর কী আশা করতে পারি।’
গ্রাউন্ড রিপোর্ট পেয়ে ক্রোধে স্থাণুবৎ পাথরের মতো হয়ে যান প্রধানমন্ত্রী। সেন্সরশিপ এড়িয়ে জর্জের আত্মকথা কেমন করে জেলের গরাদ গলে বাইরে বেরিয়ে আসছে? আবার পঁচিশ পয়সা মূল্যে ছেপে আবেদন জানানো হয়েছে, ‘সারা দেশের মেহনতি মানুষ উৎকণ্ঠায় লক্ষ্য করে যাচ্ছে কীভাবে গণতন্ত্র হত্যাকারী সরকার নিপীড়ন-নীতি গ্রহণ করে দেশের বিচার ব্যবস্থাকে প্রহসনে পরিণত করেছে। দেশের জনসাধারণের কাছে আমাদের আবেদন, ২৫ জন রাজনৈতিক বন্দির ‘মুক্তিসংগ্রাম’ তহবিল-এ তাঁরা মুক্তহস্তে দান করুন।’ টেবিলে রাখা রিসিভারটা মুহূর্তে তুলে সরাসরি কানেক্ট করলেন আইবি প্রধানের সঙ্গে। মিসেস গান্ধী বিলক্ষণ জানেন, এ ভাষা জর্জের ভাষা! কেউ তো রয়েছে যে জর্জের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। সোশ্যালিস্ট পার্টিকে নিশ্চিহ্ন না করতে পারলে শান্তি নেই!
‘তিহার জেলে সিকিউরিটি ব্রিচ হচ্ছে কেন? শার্প অ্যাকশন চাই আমি!’
১৯৭৫ সালের ২৬ জুন। ইন্দিরা গান্ধী সুপ্রিম কোর্টে নির্বাচনী মামলার আপিলের রায়ে লোকসভার ভোটাভুটিতে অংশগ্রহণের অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছিলেন। তাই বিরোধী কণ্ঠ তথা গণতন্ত্র রুখতে তিনি এমন অসাংবিধানিক ব্যবস্থা চালু করেন। জর্জ ফার্নান্ডেজ ছিলেন বিহারের মজফ্ফরপুর লোকসভা কেন্দ্রের প্রার্থী। তবু তাঁকে বরোদা বোমা মামলায় ফাঁসিয়ে রাখা হয়।
সোশ্যালিস্ট পার্টির নেতা-কর্মীদের বাড়ির টেলিফোন ট্যাপ করার জন্য টেপ লাগিয়ে রাখা হতো। দায়িত্বে ছিল প্রধানমন্ত্রীর সেক্রেটারিয়েটের অধীন সাবসিডিয়ারি ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো। জর্জ ফার্নান্ডেজ খোলা চিঠিতে লিখলেন— ‘ম্যাডাম ইন্দিরা নেহরু গান্ধী তাঁর গুরু হিটলারকে অনুসরণ করছেন। হিটলার প্রথমে ইহুদি, তারপর কমিউনিস্ট, সোশ্যালিস্ট, তারপর অন্য দল, তারপর সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবীদের একে একে আক্রমণ করেছিল, সকলকে একসঙ্গে নয়, ভারতেও তাই হতে চলেছে। জয়প্রকাশের আন্দোলনে শরিকরা গ্রেপ্তারের পর কমিউনিস্টরাও রেহাই পাবে না, বুদ্ধিজীবীদের উপরেও পরে আক্রমণ হবে।’
বিদেশেও যাতে জনতা আন্দোলনের প্রভাব পড়ে এবং স্বৈরতন্ত্রী ইন্দিরা সরকার সম্পর্কে প্রতিবাদ ওঠে, সেই উদ্দেশ্যে দিল্লির সাংবাদিক সতীশ কুমারকে বিলেতে পাঠিয়ে সেখান থেকে ‘স্বরাজ’ পত্রিকা প্রকাশের ব্যবস্থা করা হয়। এভাবেই ইন্দিরা গান্ধীর সেন্সরশিপ এড়িয়ে প্রচার চলতে থাকে। সোশ্যালিস্ট ইন্টারন্যাশনালের সঙ্গেও যোগাযোগ করেন জর্জ। ভারতের সমাজতন্ত্রীদের উপর ঘটে চলা নির্যাতনের কথা জানাতে থাকেন নানা দেশে। ফলে ইমার্জেন্সির পক্ষে স্বার্থান্বেষী ইন্দিরার বিদেশ প্রচার ব্যর্থ হয়। জর্জকে উৎখাত করতে ইন্দিরা কুৎসা রটাতে লাগলেন তাঁর সম্পর্কে। ব্যক্তি হত্যা নয়, জর্জের ব্যক্তিত্বকে হত্যা করতে হবে।
‘আমার কাছে প্রমাণ আছে, আপনাদের এই জর্জ রেল ধর্মঘটের নামে বিদেশ থেকে টাকা পায়! ও বিদেশের এজেন্ট!’ এমন প্রচারে মুচকি হেসে জর্জ লিখেছিলেন খোলা চিঠি। ম্যাডাম প্রাইম মিনিস্টারের উদ্দেশে।
‘ধর্মঘটে চাকরি হারানো রেল ও অন্যান্য শ্রমিকদের শিক্ষার জন্য জাপানের রেলশ্রমিকরা চাঁদা তুলে একটি প্রতিনিধি দল পাঠায়। তাঁরা জরুরি অবস্থা ঘোষণার কয়েক সপ্তাহ আগে যোধপুরে রেলশ্রমিক সম্মেলনে সকলের সামনে চেক দেন। পুরো টাকাই এখনও ব্যাঙ্কে পড়ে রয়েছে।’
প্রতিটি প্রত্যুত্তর শাণিত ফলার মতো বিঁধেছিল অপপ্রচারকারী ইন্দিরা গান্ধীর বুকে। জর্জের খোলা চিঠি দেওয়ালে সাঁটানো পাওয়া যায়, রাস্তায় রাস্তায় লোকে পড়ে। কিন্তু জর্জকে দেখা যায় না। তাঁকে ধরতে বহু জায়গায় পুলিসের মধ্যে তাঁর ছবি বিলি করা হয়। তাঁর অনুসারী রেলকর্মীদের গ্রেপ্তার, চাকরি থেকে ছাঁটাই করা হয়। সেই সময় ছদ্মবেশে জর্জ বিদেশি সাংবাদিকদের সঙ্গে দেখা করে দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতির কথা জানাতেন। বহু দূরদেশে তাঁর প্রতিফলন লক্ষিত হতো।
শেষে জর্জের সন্ধান না পেয়ে ব্যর্থ মনোরথ এজেন্সির পুলিস এসে জর্জের সম্পাদিত ‘প্রতিপক্ষ’ পত্রিকার অফিসে তালা ঝুলিয়ে দেয়। পুলিসের আশকারাতেই সমাজবিরোধীরাও জর্জের খোঁজ করতে বিহার-ওড়িশার নানা স্থানে সন্ত্রাস চালিয়েছিল। ‘প্রতিপক্ষ’ পত্রিকার কার্যকরী সম্পাদক গিরিধারী রাঠি গ্রেপ্তার হলেন। জর্জের স্ত্রী লায়লা কবির শিশুপুত্রকে নিয়ে গোপনে বিদেশে পাড়ি দিলেন। সেখানেও গড়ে ওঠে জর্জের অন্যতম প্রচারকেন্দ্র। রাষ্ট্রসঙ্ঘে মানবাধিকার কমিশনের সামনে লায়লা নিজ পুত্রকে নিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করতেই ভারত সরকার তাঁর পাসপোর্ট বাতিল করে। জর্জের দুই ভাই লরেন্স এবং মাইকেলকে মিসা আইনে বন্দি করে কর্ণাটকের জেলে পাঠানো হয়। লরেন্সকে মারতে মারতে চার-চারটে লাঠি ভাঙে পুলিস। তারপর বটগাছের শিকড় দিয়ে পেটায়। মাটিতে শুইয়ে বুট দিয়ে এমনভাবে লাথি মারে যে সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারতেন না লরেন্স। দেশজুড়ে জর্জের সন্ধানে পুলিসি তাণ্ডব অব্যাহত। শেষ পর্যন্ত ১৯৭৬ সালের ১০ জুন রাতে কলকাতার ক্যাথিড্রাল চার্চের মাঠে জর্জ ধরা পড়লেন। বিদেশ থেকে এল প্রতিবাদের অনুরণন। জনপ্রিয় সমাজতন্ত্রী নেতা জর্জ ফার্নান্ডেজের সমর্থনে পশ্চিম জার্মানির প্রাক্তন চ্যান্সেলার বিলি ব্রান্ট, অস্ট্রিয়ার চ্যান্সেলার ব্রুলো ক্রেইস্কি, সুইডেনের প্রধানমন্ত্রী ওলোফ পাম প্রতিবাদী বার্তা দিয়ে তাঁর মুক্তির দাবি জানালেন। ইন্টারন্যাশনাল ট্রান্সপোর্ট ওয়ার্কাস ফেডারেশন ঘোষণা করে, জর্জের মুক্তি না হলে একদিন বিশ্বের সমস্ত বন্দর বন্ধ থাকবে।
জর্জের জন্য যখন দেশে-বিদেশে জ্বলছে প্রতিবাদের আগুন, আর জেলের ভিতরে তখন নৃশংস অত্যাচারে ক্ষয়িষ্ণু শরীর নিয়ে প্রতিবাদ ব্যক্ত করে যাচ্ছেন স্নেহলতা রেড্ডি। ব্যাঙ্গালোর ও মাদ্রাজের থিয়েটার ও সিনেমা আন্দোলনে যুক্ত নৃত্যশিল্পী!
১৯৭৬ সালের ১ মে। তেলুগু চিত্র পরিচালক স্বামী পট্টভিরাম রেড্ডির সঙ্গে মাদ্রাজে পরবর্তী সিনেমার লোকেশন-স্ক্রিপ্ট ঠিক করতে গিয়েছিলেন স্নেহলতা। তাঁর পিতা বাঙালি খ্রিস্টান। রয়্যাল আর্মি সার্ভিস কর্পসের মেজর হিসেবে এডেনেই থাকতেন। স্নেহলতা কথক, ভরতনাট্যম এবং মণিপুরি নৃত্যে পারদর্শী ছিলেন। ‘মাদ্রাজ প্লেয়ারস’ নামে এক নাট্যগোষ্ঠী গড়ে তুলেছিলেন। পরে বিশিষ্ট সমাজবাদী নেতা ডঃ রামমনোহর লোহিয়ার সংস্পর্শে এসে সমাজতন্ত্রী দৃষ্টিকোণ থেকে সম্পাদনা করতেন দু’টি পত্রিকা—‘ফোকাস’ ও ‘ম্যাজিক গার্ডেন’।
ইন্দিরা গান্ধীর সন্ত্রাসী ছায়া নেমে এসেছিল স্নেহলতার পরিবারে। ‘জর্জ! জর্জ! কোথায় জর্জ!’ বারবার একই প্রশ্ন। যে প্রশ্ন উত্তরের অপেক্ষা করে না। স্নেহলতার মেয়ে নন্দনাকে দু’বার বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে মানসিক নির্যাতন করে পুলিস। ১৯৭৬ সালের ২ এপ্রিল বিকেল চারটে নাগাদ বাড়ির সামনে থেকে একরকম জোর করে গাড়িতে তুলে নিয়ে যায়। পরে সন্ধ্যায় তিনি ছাড়া পান। ৩০ এপ্রিল মধ্যরাত। স্নেহলতা স্বামীর সঙ্গে মাদ্রাজে ছিলেন। ওদিকে বাড়িতে তাঁর অশীতিপর বৃদ্ধ পিতা ও ছেলে কোণার্ক। হঠাৎ দরজায় সজোরে কড়া নেড়ে কারা যেন চিৎকার করতে থাকে, ‘টেলিগ্রাম! টেলিগ্রাম!’ আতঙ্কিত বৃদ্ধ মেজর সাহেব দরজা খুলতেই হুড়মুড়িয়ে ঢুকল পুলিস। হিড়হিড় করে টানতে টানতে গেল স্নেহলতার পুত্র কোণার্ককে। সেও কি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ‘সন্ত্রাসী’ ছিল? ইন্দিরা গান্ধীর ‘মিসা’ আইন তার জবাব দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেনি। পরদিন সকালে প্রতিবেশীর বাড়িতে ফোন করে স্নেহলতা জানতে পারলেন, পুলিস ছেলেকে তুলে নিয়ে গিয়েছে। উদ্বিগ্নমনা দম্পতি ব্যাঙ্গালোরে ফিরে এল। ‘আমরা তো বলতে পারব না, আপনারা কার্লটন হাউসের অফিসে এসে যোগাযোগ করবেন।’ লোকাল থানায় এমন জবাব পেয়ে ছুটে সেখানে গিয়েও ছেলের কোনও হদিশ মিলল না। ৮ মে স্নেহলতাকে গ্রেপ্তার করে ব্যাঙ্গালোর সেন্ট্রাল জেলে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাঁকে উলঙ্গ করে তল্লাশির নামে চূড়ান্ত হেনস্তা করা হয়। সেটাও বহু মানুষের সামনে। জেলে হাঁপানির সমস্যায় আক্রান্ত হয়েও কার্যত বিনা চিকিৎসায় তাঁকে থাকতে হয়েছিল। মিসা বন্দিদের জন্য নির্দিষ্ট সুযোগ সুবিধার কিছুই পাননি। জেল থেকে প্যারোলে মুক্তির পরে বেশিদিন বাঁচতে পারেননি স্নেহলতা। শরীরে দানা বেঁধেছিল রোগ। ১৯৭৭ সালের ২৫ জানুয়ারি মাত্র চুয়াল্লিশ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়।
ইমার্জেন্সির বিরুদ্ধে বক্তব্য রেখে রাজরোষে পড়েন দুর্গা ভাগবত। মারাঠি সাহিত্য পরিষদের সভানেত্রী দুর্গাবাঈ প্রশ্ন তুলেছিলেন ইন্দিরা সরকারের বিচার প্রহসন এবং জেপি’র গ্রেপ্তারির বিরুদ্ধে। ব্যস, ১৯৭৬ সালের ৯ সেপ্টেম্বর ‘মিসা’ আইনে গ্রেপ্তার!
১৯৭৫ সালের ২৫ জুন। মধ্যরাত। ভারতের প্রধানমন্ত্রীর মস্তিষ্কপ্রসূত ‘ইমার্জেন্সি’ ঘোষণা করলেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ফকরুদ্দিন আলি আহমেদ। সেদিন সকালেই ‘জনতা’ আন্দোলনের প্রধান মুখ জয়প্রকাশ নারায়ণ এক বিশাল জনসভা করেছেন দিল্লির রামলীলা ময়দানে। দেশবাসীকে আহ্বান জানিয়েছেন, স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে একজোট হতে হবে। কবি রামধারী দিনকরের ‘জনতন্ত্র কা জন্ম’ কবিতা তখন ‘জেপি’র গলায়— ‘জনতার সরকার আসছে, দিন ফুরোতে চলেছে স্বৈরতন্ত্রের!’ সেই অপরাধে আটক করা হয়েছিল তাঁকেও।
শেষ পর্যন্ত, সেবছরই (১৯৭৫) নভেম্বর মাসে চণ্ডীগড়ের জেল জীবন থেকে মুক্তি দেওয়া হয় ‘জেপি’কে। ক্ষয়প্রাপ্ত কিডনি, হাতে ক্যাথিটার নিয়ে বেরিয়ে আসেন তিনি। তাঁর ক্ষীণ, তবু বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর আজও ভারতীয় গণতন্ত্রের স্তম্ভ হয়ে আছে...
‘সিংহাসন খালি করো কি জনতা আতি হ্যায়!’
গ্রাফিক্স : সোমনাথ পাল
সহযোগিতায় : বিশ্বজিৎ চক্রবর্তী