


অনির্বাণ রক্ষিত: ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট, প্রায় ২০০ বছর ধরে অত্যাচারী ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের শাসনের হাত থেকে মুক্তি পেয়েছিল ভারত। কিন্তু এই স্বাধীনতা খুব সহজে আসেনি। দীর্ঘদিন ধরে লড়াই, রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম এবং দেশবাসীর ত্যাগ, আত্মবলিদানের ফল ভারতের স্বাধীনতা। স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু হয় ১৯৪৭ সালের অনেক আগেই। দেশকে পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করতে নিজের সর্বস্ব দিয়েছিলেন দেশনায়ক নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু। হাসতে হাসতে ফাঁসির দড়ি গলায় পড়েছিলেন বহু বীর বিপ্লবী। কারও হয়েছিল জেল, আবার কারও দ্বীপান্তর। অবশেষে আসে স্বাধীনতার সুখ। কিন্তু সেই লড়াই শুরু হয়েছিল স্বাধীনতার ৯০ বছর আগে।
১৭৫৭ সালে পলাশির যুদ্ধে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজদৌল্লার পরাজয়ের পর ডুবে যায় ভারতের স্বাধীনতার স্বপ্ন। তারপর শুরু হয় ইংরেজদের অকথ্য অত্যাচার। যে ব্রিটিশরা নিছক বাণিজ্য করতে মুনাফার লোভে এসেছিল এদেশে, তারাই হয়ে ওঠে ভারতের শাসক। সেই সময় দিল্লির মসনদে ভাঙাচোরা মুঘল সাম্রাজ্যের বাদশা শাহ আলম এক কথায় বাধ্য হন সবকিছু ছেড়ে দিতে। মীরজাফরের পর মীর কাসিমকে নবাব করা হলে তিনি সামান্য চেষ্টা করেছিলেন ব্রিটিশদের প্রতিহত করার জন্য। কিন্তু বক্সার যুদ্ধে সেই সম্ভাবনাও শেষ হয়ে যায়। ফলে পুরোপুরি পরাধীনতার অন্ধকারে ডুবে যায় ভারত।
ভারতের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম পলাশির যুদ্ধের ঠিক ১০০ বছর পর অত্যাচারী ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির গোলামি করে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছিল গোটা ভারত। সংগ্রামের আগুন জ্বলে ওঠে তখন থেকেই। এরপরেই শুরু হয় ঐতিহাসিক মহাবিদ্রোহ, যাকে ভারতের স্বাধীনতার প্রথম সংগ্রাম বলে ধরা হয়ে থাকে। সেটি ছিল ভারতের ইতিহাসের এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। বিপ্লবী বীর দামোদর সাভারকার তাঁর গ্রন্থে সিপাহী বিদ্রোহকেই ভারতের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম বলে উল্লেখ করেছেন।
মহাবিদ্রোহের প্রেক্ষাপট ভারতকে সম্পূর্ণ গ্রাস করতে ব্রিটিশরা নিয়ে আসে স্বত্ত্ব বিলোপ নীতি, চিরস্থায়ী বন্দোবস্তর মতো নীতি। যা একদম মেনে নেননি তৎকালীন প্রাদেশিক রাজারা। এরপরেই আসে এনফিল্ড রাইফেল, যার টোটা মুখ দিয়ে কেটে বন্দুকে ভরতে হত। জানা যায়, সেই টোটা তৈরি হয়েছিল গোরু ও শূকরের ছাল চর্বি দিয়ে, আর সেটিতে মুখ দিতে অস্বীকার করেন সব ভারতীয় সিপাহীরা। এই অস্থির পরিবেশেই আচমকা ব্যারাকপুরে মঙ্গল পাণ্ডের নেতৃত্বে যুদ্ধ শুরু করে দেন। এরপর ১৮৫৭ সালের ১০ মে মীরাটে সিপাহী বিদ্রোহ হিসাবে বিদ্রোহ শুরু হয়। বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির সিপাহীরা ব্রিটিশ অফিসারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। এই বিদ্রোহে একের পর এক যুক্ত হন ঝাঁসির রানী লক্ষীবাঈ, মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ প্রমুখ। সিপাহী বিদ্রোহ শেষ পর্যন্ত সার্থক না হলেও এই বিদ্রোহকে মহাবিদ্রোহ বলে গণ্য করা হয় ভারতের ইতিহাসে।