


টি২০ বিশ্বকাপে তাঁর উত্থান চমকপ্রদ। প্লেয়ার অব দ্য টুর্নামেন্ট খেতাব জিতে নিয়েছেন তিনি। সঞ্জু স্যামসনের লড়াইয়ের দিনগুলি তুলে ধরলেন সৌগত গঙ্গোপাধ্যায়।
দিল্লির জুনিয়র ক্রিকেট টুর্নামেন্ট। বছর দশেকের এক ছোট্ট ছেলে আটটি ম্যাচে ব্যাট করল। আউট হল না বললেই চলে। ইনিংসের পর ইনিংস রান করে গেল — শেষমেশ মোট রান ৫০০-এরও বেশি। গ্যালারিতে বাবা দেখছেন, মনে মনে ভাবছেন, এবার নিশ্চয়ই দিল্লির অনূর্ধ্ব-১৩ দলে ডাক আসবে। কিন্তু, ডাক এল না। উলটে নির্বাচকরা জানালেন, ছেলেটির বয়স মাত্র দশ। এই টুর্নামেন্ট তেরো বছরের জন্য। তাই জায়গা হবে না। বাবা বিশ্বনাথ স্যামসন রীতিমতো থ বনে গেলেন। পরে সাংবাদিকদের কাছে তিনি বলেছিলেন, ‘আমার ছেলে ৫০০ রান করেছিল, তবুও দলে নেওয়া হল না। বলা হল বয়স কম। কিন্তু যদি বয়সই মাপকাঠি হয়, তাহলে মেসি ১৭ বছর বয়সে আর শচীন ১৫ বছর বয়সে আন্তর্জাতিক মঞ্চে কীভাবে খেললেন?’
সেদিন সেই প্রশ্নের উত্তর কেউ দেয়নি। কিন্তু স্যামসন পরিবারের ভেতরে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিল— যে আগুন বহু বছর পর আমেদাবাদের মোতেরা স্টেডিয়ামে আসমুদ্রহিমাচলকে আলো দিয়েছিল। ৫০০ রান করেও যাঁকে বাদ দেওয়া হয়েছিল, তিনিই হলেন ২০২৬ সালের টি-২০ বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড়।
সঞ্জু স্যামসনের জন্ম কেরলের তিরুবনন্তপুরমের কাছে পুল্লুভিলা নামের একটি ছোটো উপকূলীয় গ্রামে। বাবা বিশ্বনাথ ছিলেন দিল্লি পুলিশের কনস্টেবল। শুধু পুলিশ নন— সন্তোষ ট্রফিতে দিল্লির হয়ে ফুটবলও খেলেছেন। এই পরিবারের খেলাধুলোর প্রতি টান বহু কালের। ছোট্ট সঞ্জুর ভেতরেও সেই রক্ত টগবগ করত। মাত্র সাড়ে তিন বছর বয়সে যখন বাবা ব্যাট হাতে দিলেন, তখনই বিশ্বনাথ বুঝতে পেরেছিলেন— এই ছেলে আলাদা।
দিল্লির জিটিবি নগর পুলিশ কলোনিতে বড়ো হওয়া সঞ্জু রোজ অনুশীলন করতেন। বাবা তাঁকে আর দাদা সালিকে নিয়ে যেতেন দিল্লি পুলিশ ক্রিকেটের প্র্যাকটিস সেশনে। সেখানে ২৫ বছরের পেসাররা মাত্র ১৫ গজ দূর থেকে বোলিং করতেন দুই ভাইকে। ছেলে দু’টি অনায়াসে সামলে নিতেন। বাবা অবাক হয়ে দেখতেন। কিন্তু দিল্লির জুনিয়র ক্রিকেটে যে সেই প্রতিভার কোনো দাম নেই! বিশ্বনাথ বুঝলেন, এখানে থাকলে ছেলের প্রতিভা একদিন নিভে যাবে। তারপর যা করলেন, তা সাহস ছাড়া সম্ভব নয়। বাইশ বছরের নিশ্চিত সরকারি চাকরি ছেড়ে দিলেন। পুরো পরিবার নিয়ে চলে এলেন কেরলে। ছেলের স্বপ্নের জন্য নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দিলেন। বাবা চাকরি ছাড়লেন যেদিন, সেদিন থেকেই আসলে শুরু হয়েছিল সঞ্জুর বিশ্বজয়ের যাত্রা। কেরলে এসে সঞ্জু যেন নতুন জীবন পেলেন। অনূর্ধ্ব-১৩ দলে পাঁচ ম্যাচে চারটি সেঞ্চুরি। গড় ১০৮। সেরা খেলোয়াড়। মাত্র ১৪ বছর বয়সে কেরলের রঞ্জি দলে ডাক পেলেন। কেরলের ইতিহাসে সবচেয়ে কম বয়সে রঞ্জি টিমে খেলেন সঞ্জু। আইপিএলে রাজস্থান রয়্যালসের হয়ে দুর্দান্ত ব্যাটিং করে নজর কাড়লেন গোটা দেশের। ভারতের নীল জার্সি গায়ে চড়ল। কিন্তু জাতীয় দলে টিকে থাকা ছিল আরও কঠিন লড়াই— একবার সুযোগ, একটু রান, তারপর দলের বাইরে। বছরের পর বছর চলল এভাবে। সমালোচনা, প্রশ্ন, সন্দেহ— সব মিলিয়ে একটা দীর্ঘ যুদ্ধ।
২০২৪ সালের টি-২০ বিশ্বকাপের পর থেকে আরেকটু যন্ত্রণা যোগ হল। সেই বিশ্বকাপ ফাইনাল তাঁর খেলা হয়নি। কিন্তু ফাইনালের আগে প্রায় আধ ঘণ্টা তাঁকে সান্ত্বনা দিয়েছিলেন তত্কালীন ভারতীয় ক্যাপ্টেন রোহিত শর্মা। কারণ, হিটম্যানও জানতেন, সঞ্জু কত বড়ো প্রতিভা! তবে এরপর বিরাট-রোহিতরা টি-২০ ক্রিকেট থেকে অবসর নিলে সঞ্জুরা প্রথম একাদশে নিয়মিত জায়গা পান। ২০২৬ সালের বিশ্বকাপের আগে ওপেনার নিয়ে ভাবনা চিন্তা চলছিল। কিন্তু এই মেগা টুর্নামেন্টের আগে নিউজিল্যান্ড সিরিজে কেরালাইটের অফ ফর্ম তাঁকে আবার ব্যর্থতার কানাগলিতে ঠেলে দিল। বিশ্বকাপ শুরু হল— সঞ্জুর ঠিকানা ডাগআউট। সেই দিল্লির প্রত্যাখ্যানের মতোই নীরব যন্ত্রণা। আর বাড়িতে মা লিজি তখন অসুস্থ। ছয় দিন ধরে শয্যাশায়ী। মাঠে যেতে পারেননি। শুধু ফোনে ছেলের রানের খবর শুনছিলেন।
কিন্তু, সুপার এইটে দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে ভারতের হার আবার সঞ্জুকে একটা সুযোগ করে দিল। হারের পর থিঙ্ক ট্যাংকের টনক নড়ে। টপ অর্ডারে তিনজন বাঁহাতি ব্যাটার হয়ে যাওয়ায় অফ স্পিনারের বিরুদ্ধে এক্সপোজ হয়ে যাচ্ছিল ভারতীয় ব্যাটিং। তাই ডান হাতি সঞ্জুকে ওপেনে ফেরানো হল অভিষেক শর্মার সঙ্গে। তিনে ঈশান কিষান। আর তিলক ভার্মাকে পাঠানো হল লোয়ার অর্ডারে। অর্থাত্, জিম্বাবোয়ে ম্যাচে ফিরলেন সঞ্জু। সেই ম্যাচে শুরুটা ভালো করেও বড়ো রান আসেনি। তবে পরের ম্যাচে অবিশ্বাস্য কিছু ঘটল— কলকাতার ইডেন গার্ডেন্সে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে অঘোষিত কোয়ার্টার ফাইনাল। হারলেই বিদায়। লক্ষ মানুষের গর্জনে কাঁপছে ইডেন। মাঠে নামলেন সঞ্জু — হাতে ব্যাট, বুকে ছোটোবেলার সেই জমানো রাগ, অপমান আর স্বপ্ন। অপরাজিত ৯৭ রান। প্রতিটা শট যেন একটা উত্তর। ভারত সেমিফাইনালে।
সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ৮৯। তারপর ফাইনাল— আমেদাবাদে নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে। ৪৬ বলে ৮৯ রান। টি-২০ বিশ্বকাপ ফাইনালের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত স্কোর। ভারত জিতল ৯৬ রানে। তৃতীয়বারের মতো টি-২০ বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন। প্রায় ২০০ স্ট্রাইক রেটে ৫ ইনিংসে ৩২১ রান— টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় সঞ্জু স্যামসন।
ট্রফি হাতে নেওয়ার পরই সঞ্জু ছুটলেন তিরুবনন্তপুরমে। বাড়িতে ঢুকতেই বাবা এগিয়ে এলেন— পিঠে হাত রাখলেন, জড়িয়ে ধরলেন। মা লিজি অসুস্থ শরীরেও ছেলেকে আদর করলেন। দাদা সালি জড়িয়ে ধরলেন। সঞ্জু পরে লিখেছিলেন, ‘বিশ্বকাপ জিতে প্রথমেই বাড়ি ফিরতে চেয়েছিলাম। প্রথম যাঁদের কাছে গেলাম, তারা আমার বাবা-মা। আমাকে ক্রিকেটার তৈরির সম্পূর্ণ কৃতিত্ব তাঁদের।’ বিশ্বনাথ স্যামসন সেদিন বলেছিলেন, ‘যেদিন চাকরি ছেড়েছিলাম, অনেকে বলেছিল পাগল। আজ বুঝতে পারছি, সেটাই ছিল আমার জীবনের সেরা সিদ্ধান্ত।’
সঞ্জু স্যামসনের গল্পটা তাই শুধু একজন ক্রিকেটারের গল্প নয়। এটা সেই প্রতিটা ছেলেমেয়ের গল্প, যাঁর সামনে একদিন প্রতিবন্ধকতার দেওয়াল তোলা হয়েছে। এটা সেই বাবার গল্প, যিনি ছেলের স্বপ্নকে নিজের স্বপ্নের চেয়ে বড়ো মনে করেছেন। আর এটা সেই মানুষটার গল্প, যিনি বারবার ভেঙে পড়েছেন, কিন্তু প্রতিবারই উঠে দাঁড়িয়েছেন। ৫০০ রান করেও যাঁকে বাদ দেওয়া হয়েছিল, তিনি হার মানেননি বলেই আজ ক্রিকেট বিশ্ব তাঁকে কুর্নিশ জানাচ্ছে।