


রোভারের পাঠানো ছবিতে মঙ্গলের মাটিতে দেখা যায় চৌকো খোপ। এই খোপগুলির রহস্য কী? জানালেন স্বরূপ কুলভী।
মঙ্গল গ্রহ নিয়ে মানুষের আগ্রহ নতুন কিছু নয়। প্রাচীনকাল থেকেই লালগ্রহকে নিয়ে নানান কৌতূহল তৈরি হয়েছে। এই গ্রহ দেখতে লাল রঙের। তাই একে লালগ্রহ বলা হয়। ছোট্ট বন্ধুরা, আমরা সবাই জানি সূর্য থেকে দূরত্বের হিসাবে সৌরমণ্ডলের চতুর্থ গ্রহ মঙ্গল। আর ভরের নিরিখে তৃতীয়। যুগ যুগ ধরে মানুষ কল্পনা করেছে মঙ্গলে বসতি গড়ে তোলার। প্রতিনিয়ত নতুন নতুন তথ্য আবিষ্কার হচ্ছে। কিন্তু সেখানে লুকিয়ে থাকা বিস্ময়ের খুব অল্পই আমরা জানি। লাল গ্রহে প্রাণের সন্ধান, ভূমিরূপ, তার গঠন ও যুগের সঙ্গে কীভাবে তার পরিবর্তন ঘটেছে, মানব অভিযানের জন্য সেখানকার পরিবেশ উপযুক্ত কি না— এমন বিষয়গুলি খতিয়ে দেখছেন মহাকাশ বিজ্ঞানীরা। আমেরিকার মহাকাশ গবেষণা সংস্থা মঙ্গলের বুকে একাধিক রোভার পাঠিয়েছে। সেগুলি প্রতিমুহূর্তে নতুন নতুন তথ্য পাঠাচ্ছে পৃথিবীতে। আর ওই সব তথ্য নতুন করে চেনাচ্ছে লালগ্রহকে। নাসার এমনই একটি রোভার হল কিউরিওসিটি। সে তার যাত্রাপথে মঙ্গলের একটি ধু ধু প্রান্তরে প্রায় মাস ছয়েক কাটিয়ে ফেলেছে। দীর্ঘদিন ধরেই ওই প্রান্তর বিজ্ঞানীদের নজর কেড়ে নিয়েছিল। মহাকাশ থেকে দেখলে মনে হবে যেন বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে সুবিশাল মাকড়সার জাল। সেই মাকড়সার জালের সুলুকসন্ধানের জন্য সেখানে পৌঁছে গিয়েছিল নাসার রোভার। সেখানকার ছবিও পাঠিয়েছে সে। রোভারের অনুসন্ধান লালগ্রহে প্রাণের অস্তিত্ব নিয়ে গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলতে পারে বলে অনুমান বিজ্ঞানীদের। রোভারের পাঠানো ছবি বিশ্লেষণ করে কী বোঝা গিয়েছে? ইঙ্গিত মিলেছে, লালগ্রহে প্রাণের অনুকূল পরিবেশ বিজ্ঞানীদের অনুমানের তুলনায় অনেক বেশি সময় ধরে থাকতে পারে। কেন এমন ধারণা করা হচ্ছে? উত্তর লুকিয়ে এই বিশেষ ভূতত্ত্বের মধ্যে।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, মঙ্গলে একটা সময় জল ছিল। কালক্রমে তা শুকিয়ে যায়। জল থাকলে জীবনের অস্ত্বিত্বও থাকতে পারে। তাহলে কী মঙ্গলে একটা সময় প্রাণের অস্তিত্ব ছিল? তার খোঁজই মঙ্গলের সবচেয়ে নজরকাড়া এলাকায় ঘুরছে কিউরিওসিটি। শৈলশিরাগুলি দিয়ে আঁকিবুঁকি কাটা মঙ্গলের ওই অংশে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কাছ থেকে ভূমিভাগের এই গঠন বৈজ্ঞানিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
মঙ্গলে এই মাকড়সার জাল আসলে কী?
চৌকো চৌকো খোপের মতো এই ভূমিভাগকে বলা হয় বক্সওয়ার্ক। চারপাশ জমির আলের মতো উঁচু। ওই আলগুলি মোটামুটি ৩ থেকে ৬ ফুট উঁচু। মাঝখানটা বালিতে ভরা। এই চৌকো চৌকো খোপ একে অপরের উপর আঁকিবুঁকি কেটে মঙ্গলের জমির বহু কিলোমিটার জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে। মহাকাশ থেকে ওই ভূমিভাগকে মাকড়সার জালের মতো মনে হয়। একটা সময় মঙ্গলের ভূগর্ভস্থ জল পাথরের ফাটলের মধ্যে দিয়ে বয়ে যেত। জলের প্রবাহের পাশে খনিজ জমা হতে থাকে। আর খনিজ জমা অংশটিই জমির আলের মতো দেখতে লাগে। বাকি কাজটা করে বায়ুপ্রবাহ। বাতাসের ঝাপটায় ধীরে ধীরে দুর্বল অংশগুলি ক্ষয়ে যায়। আল ঘেরা অংশগুলির মাঝখানটা বালিতে ভরে যায়। এভাবেই গড়ে উঠেছে ওই বক্সওয়ার্ক। লালগ্রহের ভূপৃষ্ঠ থেকে তিন মাইল উঁচু মাউন্ট শার্পে রয়েছে। সেখানে জল প্রবাহের কারণে তৈরি এই ভূভাগই বিজ্ঞানীদের তাক লাগিয়ে দিয়েছে।
এই ভূভাগের ছবি দেখে গবেষণাকারী দলের অন্যতম বিজ্ঞানী রাইস ইউনিভার্সিটির টিনা গিগের বলছেন, এর থেকে বোঝা যায় লালগ্রহে ভূগর্ভস্থ জল অনেকটাই উপরে ছিল। খুব বেশি নীচে ছিল না। এর অর্থ হল, দীর্ঘ সময় ধরে সেখানে জল ছিল। প্রাণের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে যতটা সময় লাগে, তার চেয়ে বেশি সময় ধরে সেখানে জল ছিল। তাহলে কি মঙ্গলে কোনো কালে প্রাণ সৃষ্টি হয়েছিল? সেই প্রশ্নের উত্তর কি দিতে পারবে কিউরিওসিটি?