


মরুভূমি মানে ধুধু ঊষর বালির রাশি। কিন্তু অনেক সময়ই দেখা যায় সমুদ্রের পাশেই মরুভূমির অবস্থান। কেন এমন ঘটে জানালেন
অনির্বাণ রক্ষিত
মরুভূমি নামটা শুনলেই আমাদের মনে আসে চারদিকে ধু ধু বালি। জলের উৎস থেকে শত শত মাইল দূরে এক রুক্ষ প্রান্তর। এমনটাই তো ভাবছ, ছোট্ট বন্ধুরা? কিন্তু মজার ব্যাপার হল, পৃথিবীর সবচেয়ে শুষ্ক কিছু মরুভূমি কিন্তু সাগরের একদম গা ঘেঁষেই অবস্থিত!
চিলির আটাকামা কিংবা দক্ষিণ আফ্রিকার নামিব মরুভূমির কথাই ধরা যাক। এগুলো সবই সমুদ্রের তীরে গড়ে উঠেছে। কিন্তু সাগরের এত জল থাকতেও এই জায়গাগুলো এমন খাঁ খাঁ মরুভূমি হল কীভাবে? সাগরের পাশে মরুভূমি তৈরির প্রধান তিনটি কারণ রয়েছে। প্রথম কারণটি হল বাতাসের উপর-নীচ চলাচল। দ্বিতীয় কারণ হল বাতাসের আড়াআড়ি চলাচল। তৃতীয় এবং সর্বশেষ কারণ পাহাড়-পর্বতের বাধা। এই তিনটি কারণ একটু খতিয়ে দেখা যাক।
বাতাসের উপর-নীচে চলাচল
পৃথিবীর মানচিত্রের দিকে তাকালে একটা জিনিস খেয়াল করবেন। বেশিরভাগ মরুভূমিই বিষুবরেখার একটু ওপরে বা নীচে অবস্থিত। কিন্তু কেন? বিষুবরেখা অঞ্চলে সূর্যের আলো একদম লম্বভাবে পড়ে। এতে সেখানকার বাতাস গরম হয়ে হালকা হয়ে যায়। গরম বাতাস সবসময় ওপরের দিকে উঠে যায়। বাতাস ওপরে উঠলে সেখানে একটা নিম্নচাপ তৈরি হয়। তখন বাতাসের জলীয় বাষ্প ঠান্ডা হয়ে মেঘ ও বৃষ্টিতে পরিণত হয়। এ কারণেই বিষুবরেখা অঞ্চলে আমাজনের মতো ঘন ও চিরসবুজ বন দেখা যায়।
কিন্তু ওই যে বাতাসটা ওপরে উঠল, তার কী হবে? সেই বাতাস বিষুবরেখা থেকে উত্তর ও দক্ষিণে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর তা আবার নীচে নামতে শুরু করে। এই নীচের দিকে নামা বাতাস মেঘ তৈরি হতে বাধা দেয়। আর মেঘ না থাকলে তো বৃষ্টিও হয় না! ঠিক এ কারণেই সাহারা বা কালাহারির মতো বড়ো বড়ো মরুভূমিগুলো তৈরি হয়েছে।
বাতাসের আড়াআড়ি চলাচল
বিষুবরেখার কাছাকাছি অঞ্চলে বায়ু পূর্ব থেকে পশ্চিম দিকে বয়ে যায়। এই বাতাস মহাদেশগুলোর পূর্ব দিকে প্রচুর বৃষ্টিপাত ঘটায়। কিন্তু পশ্চিম দিকে পৌঁছতে পৌঁছতে বাতাসের সব জল ফুরিয়ে যায়। ফলে পশ্চিম দিকটা শুকনো খটখটে থেকে যায়! নামিব মরুভূমির ক্ষেত্রে ঠিক এমনটাই ঘটে। সেখানে যা বৃষ্টি হওয়ার, তা মরুভূমির পূর্ব দিকের পাহাড়েই হয়ে যায়। এর সঙ্গে আরও একটা বিষয় যুক্ত হয়। তা হল সাগরের শীতল স্রোত। এই শীতল স্রোতের ওপর দিয়ে যখন বাতাস বয়ে যায়, তখন বাতাসটাও ঠান্ডা হয়। ঠান্ডা বাতাস খুব একটা ওপরে উঠতে পারে না। ওপরে উঠতে না পারায় মেঘ বা বৃষ্টিও তৈরি হয় না। কিন্তু এই ঠান্ডা বাতাস বেশ কিছু জলীয় বাষ্প ধরে রাখতে পারে। ফলে বৃষ্টি না হলেও মরুভূমির এই উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতে প্রচুর কুয়াশা তৈরি হয়।
পাহাড়-পর্বতের বাধা
তৃতীয় কারণটি হল পাহাড় বা পর্বতের বাধা। একে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় রেন ফরেস্ট। জলীয় বাষ্পে ভরা বাতাস যখন কোনো উঁচু পাহাড়ে ধাক্কা খায়, তখন সে বাধ্য হয়ে ওপরে ওঠে। ওপরে উঠলেই বাতাস ঠান্ডা হয়ে পাহাড়ের ওই পাশেই প্রচুর বৃষ্টি ঝরায়। কিন্তু পাহাড় টপকে বাতাস যখন অন্য পাশে যায়, তখন তার ভেতরে আর কোনো জল থাকে না!
আটাকামা মরুভূমির ক্ষেত্রে ঠিক এমনটাই ঘটে। দক্ষিণ আমেরিকার বাতাস প্রথমে আমাজনে প্রচুর বৃষ্টি ঝরায়। এরপর সেই বাতাস গিয়ে ধাক্কা খায় বিশাল আন্দিজ পর্বতমালার গায়ে। আন্দিজ পর্বত বাতাসের বাকি জলটুকুও শুষে নেয়। ফলে পাহাড় পেরিয়ে চিলির দিকে বা আটাকামা মরুভূমিতে যখন বাতাস পৌঁছয়, তখন তা একদম শুকনো!