


অনিমেষ মণ্ডল, কাটোয়া: ষোলো বছর আগেকার কথা। ফেব্রুয়ারি মাসের এক রাতে মঙ্গলকোটের বক্সিনগর গ্রাম থেকে আলাউদ্দিন শেখ নামে এক যুবককে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। তারপর তাঁকে বটতলার কাছে নৃশংস ভাবে হাত ও পায়ের শিরা কেটে হত্যা করা হয়। অপরাধ? আলাউদ্দিন তৃণমূল করে।
একফোঁটা জলের জন্য আলাউদ্দিন রাস্তায় পড়ে কাতরাতে থাকলেও কেউ তাঁকে জল দিতে সাহস করেনি। কুখ্যাত গ্যাং স্টার তথা রাজনীতিবিদ ডাবলু ও তার ভাই বাবলু আনসারির নাকি নির্দেশ! মঙ্গলকোটের আনাচে কানাচে এরকম একাধিক হাড়হিম করা খুনের ঘটনা শোনা যায়। যার নেপথ্যে সিপিএম নেতা ডাবলু ও তার ভাই বাবলু আনসারির হাত ছিল বলে অভিযোগ।
মঙ্গলকোটে ২০১১ সালের পর ঘাসফুল ফোটে। এখন ডাবলুর প্রভাব শূন্য। কিন্তু গত পনেরো বছর ধরে সেই ডাবলু ও বাবলু কোথায়? এখনও নির্বাচন এলেই তাদের কথা মনে করে আঁতকে ওঠেন বাসিন্দারা। ১৯৯৮ সালে মঙ্গলকোট পঞ্চায়েতে কংগ্রেসের উপপ্রধান হিসেবে রাজনীতিতে আত্মপ্রকাশ ডাবলু আনসারির। মতবিরোধের জেরে কংগ্রেস থেকে সিপিএমের উপপ্রধান হয়ে সে। তারপর টানা কুড়ি বছর কেউ তাকে টলাতে পারেনি। অনেকেই বলছেন, গ্রামে ডাবলু নাকি প্রকাশ্যে বিচারসভা বসাত। যেটাকে খাপ পঞ্চায়েতেও বলা যায়। অনেককেই সেখানে গাছের ডাল দিয়ে পেটানো হতো। নতুনহাটের রেজিস্ট্রি অফিসের পিছনে এক ব্যক্তি বলছেন, আমাকে এমন মার দিয়েছিল যে, বহুদিন তার ঘা শুকোয়নি। বাস স্ট্যান্ড চত্বরে দাঁড়িয়ে ছিলেন নিরু শেখ। তিনি বলেন, থানা পুলিশ নয়, সিপিএমের জোরে ডাবলু নিজেকে মঙ্গলকোটের মসীহা ভাবতে শুরু করেছিল। তৃণমূলের আমলে মঙ্গলকোট হিংসামুক্ত হয়। আড়াল গ্রামে কুনুর নদীর তীরে ডাবলু বাহিনী ওয়াচ টাওয়ার গড়ে নজরদারি চালাত। বিরোধী রাজনৈতিক দলের লোককে দেখলেই তুলে নিয়ে গিয়ে হয় মোটা টাকা জরিমানা করত। না হলে খুন করে দেওয়া হতো।
মঙ্গলকোট গ্রামে টালিপাড়ায় ডাবলুর সেই প্রাসাদোপম বাড়িটা এখন পরিত্যক্ত। ঝোপঝাড় জঙ্গলে ভরে উঠেছে চারদিক। ২০২১ সালে ডাবলু বিজেপিতে যোগ দিয়ে মাথাচারা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। তবে সে চেষ্টা বিফলে যায়।
বক্সিনগর গ্রামে নিহত আলাউদ্দিনের নাম করতেই সবাই মুখ খুলতে এগিয়ে এলেন। আলাউদ্দিনের বোন মবিউন্নেসা বেগম বলেন, সেদিন কেউ ভয়ে মুখ খোলেনি। এখন সবাই ডাবলু আর তার ভাই বাবলুর অত্যাচারের কথা বলছে। আমার দাদার কোনো দোষ ছিল না। আমরা তৃণমূলের পতাকা বইতাম বলে ওভাবে দাদাকে হারাতে হল। আলাউদ্দিনের বৃদ্ধা মা আজিজা বিবি বলেন, ওদের বিচার এখনও হয়নি। মামলা চলছে। আমার ছেলের ভাতের থালায় লাথি মেরে তুলে নিয়ে গিয়ে খুন করল ডাবলু-বাবলু। খুনি সিপিএম আর ফিরে আসুক চাই না। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আসুক আবার।
সিপিএম দলের নামেই আক্ষেপের সুর ডাবলুর ভাই বাবলুর গলায়। সে বলে, যা করেছি সিপিএম নেতাদের কথাতেই করেছি। অথচ দল আমাদের পাশে দাঁড়াল না। আজও আমরা ঘড়ছাড়া। ষড়যন্ত্র করে মিথ্যে মামলা দিয়ে আমাদের ফাঁসিয়েছে। মঙ্গলকোটের সিপিএম প্রার্থী মীরাজ আলম শেখ বলেন, রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের শিকার ওরা। তৃণমূল প্রার্থী অপূর্ব চৌধুরী বলেন, ডাবলু-বাবলুর সেই ছায়া এখন আর নেই। দিদির আমলে মঙ্গলকোট শান্ত। সিপিএম দলটা যা করেছে, তা এলাকার মানুষ জানেন।