


শ্রীকান্ত পড়্যা, তমলুক: অধিকার হারানোর যন্ত্রণা নিয়েই শুরু হল বাঙালির নববর্ষ। ভোটের আবহে এসআইআরে বাদ হাজার, হাজার নাম। পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুর ও ঝাড়গ্রাম জেলায় ৭৩ হাজার ৮৯ জন ভোটারের নাম তালিকা থেকে ছেঁটে ফেলেছে নির্বাচন কমিশন। সপ্তাহ ঘুরলেই ২৩ এপ্রিল তিন জেলায় নির্বাচন। অথচ, ভোটাধিকার খোয়ানো হাজার হাজার ভোটার ভোটের লাইনে দাঁড়াতে পারবেন না। শুধু ভোটের লাইনে নয়, সরকারি সুযোগ সুবিধা মিলবে কি না সেসব নিয়েও ভয় ভীতি কাজ করছে। আগামী দিনে ভোটার তালিকায় নাম থাকবে কি না সেটা নির্ভর করছে ট্রাইবুনালের উপর। আবারও অনলাইন আবেদন করার লাইন, এসডিও অফিসে নথি জমার দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে। এই ভোগান্তির শেষ ঠিক কোথায়, জানেন না নন্দীগ্রামের শেখ আলাউদ্দিন, নন্দকুমারের আফরোজা বিবি, সবংয়ের সন্ধ্যা অধিকারী, মেদিনীপুরের দীপালি রানা ও ফুলকুমারী সিংরা।
স্বাধীনতা আন্দোলনে বিপ্লবীদের চারণভূমি ছিল এই মেদিনীপুর। এখানকার তরুণরা শুধু গান্ধীজির অহিংস আন্দোলনেই সাড়া দেননি, একইসঙ্গে সশস্ত্র বিপ্লবের স্বপ্নও দেখতেন। সশস্ত্র বিপ্লবের পথপ্রদর্শক ছিলেন এই মাটির বীর সন্তান ক্ষুদিরাম বসু। ব্রিটিশ শাসন কালে ১৯৪২ সালের ১৭ ডিসেম্বর স্বাধীনতা সংগ্রামীরা সমান্তরাল জাতীয় সরকার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। নাম ছিল, তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকার। নবজাগরণের আলো জ্বালিয়েছেন মেদিনীপুরের আরেক সমাজ সংস্কারক ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। সেই মেদিনীপুরের মাটিতে আজ হাজার হাজার মানুষ ভোটাধিকার খুইয়েছেন। নির্বাচন কমিশনের এই সিদ্ধান্তে কোলাঘাট থেকে হলদিয়া, নন্দীগ্রাম থেকে কাঁথি, সবং থেকে মেদিনীপুর, কেশপুর থেকে ঘাটাল এবং জঙ্গলমহলে বাড়ছে ক্ষোভ। বাদ পড়া তালিকায় ৬০-৭০ বছর বয়সিরাও আছেন। তাঁদের প্রশ্ন, সাত পুরুষ ধরে বাস। কমিশন কি এভাবে ভোটাধিকার কেড়ে নিতে পারে?
পূর্ব মেদিনীপুর জেলায় ১৯ হাজার ৫৭২জন, পশ্চিম মেদিনীপুরে ৫২ হাজার ২৭৭জন, ঝাড়গ্রাম জেলায় ১২৪০ জন ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ গিয়েছে। প্রত্যেকের ভাগ্য এখন ট্রাইবুনালের হাতে। শেষমেশ ট্রাইবুনালে কী হবে, তা নিয়ে উদ্বেগের শেষ নেই। কারও স্বামীর নাম আছে স্ত্রীর নাম নেই, আবার কারও বাবার নাম আছে তো ছেলের নাম নেই। ঘোর অনিশ্চতার মুখে পড়েছেন ওই ভোটাররা।
মহিষাদল বিধানসভার রামবাগের উত্তর পশ্চিমপাড়া ১৩৪ নম্বর বুথের ৬৬ বছর বয়সি রেসিদান বিবির নাম বাদ। বয়সের ধকল সামলে রেসিদান এই বয়সে ভোটাধিকার ফিরে পেতে কখনও মহিষাদলে বিধায়ক কার্যালয় আবার কখনও হলদিয়া এসডিও অফিসে দৌড়ঝাঁপ করছেন। তাঁর মতো গোপালপুরের শেখ হাবিবুল রহমান, রামবাগের মনীষা বিবি, শুকলালপুরের বাহারান বিবি, গড়কমলপুরের জেরিনা বিবি, কাঞ্চনপুর জালপাই গ্রামের সিরাজ খান ও খোদেজা বিবির নামও বাদ। নন্দীগ্রাম বিধানসভার মহম্মদপুর পঞ্চায়েতের ৬৩ নম্বর বুথে ৭৯জন ভোটারের নাম বাদ গিয়েছে। ওই বুথের বাসিন্দা ২৮ বছরের আসফাক খান তাঁদের মধ্যে একজন। আসফাকের বাবা কুতুবউদ্দিন খান মহম্মদপুর পঞ্চায়েতের তৃণমূলের প্রাক্তন উপপ্রধান। কুতুবউদ্দিনের বয়স ৮৩। আসফাকের বয়স ২৮। বাবা-ছেলের বয়সের তফাত ৫৫বছর হওয়ায় অ্যাডজুডিকেশন লিস্টে আসফাকের নাম ছিল। শেষমেশ তাঁর নাম বাদ পড়েছে।
পশ্চিম মেদিনীপুরের সবং বিধানসভার বাগনাবাড় গ্রামের সন্ধ্যা অধিকারী, আরতি মাইতির নামও একইভাবে বাদ পড়েছে। মেদিনীপুর বিধানসভার তাঁতিগেড়িয়া বুথে দীপালি রানা, ফুলকুমারী সিং এবার ভোট দিতে পারবেন না। কারণ, সাপ্লিমেন্টারি লিস্টেও তাঁদের নাম প্রকাশিত হয়নি। তাই ট্রাইবুনালই শেষ ঠিকানা। কাজেই স্বাধীনতা আন্দোলনে শহিদের রক্তে ভেজা মাটিতে আজ ভোটাধিকার হারানোর আর্তনাদ।