


রাজা ভট্টাচার্য: চিৎপুরের বড় রাস্তা দিয়ে লম্বা লম্বা পা ফেলে হাঁটছিলেন রসময় দে। পরনে সাদামাটা ধুতি ও পাঞ্জাবি, কাঁধের উপর অগোছালোভাবে পড়ে আছে চাদরটা। এখন সকাল। একটু আগেই ন’টার তোপ পড়েছে। চিৎপুরের বড় রাস্তায় এই মুহূর্তে সাংঘাতিক ভিড়। গাড়ি চলে যাচ্ছে ঘড়ঘড় শব্দ করে; শোনা যাচ্ছে সহিসদের ‘পইস্ পইস্’, ঝাঁকামুটেদের ‘বাগাল বাগাল’ চিৎকার।
সেই ভয়ঙ্কর এবং উচ্ছৃঙ্খল ভিড় ঠেলে উদ্ভ্রান্তের মতো হেঁটে যাচ্ছিলেন রসময়। দেখলেই বোঝা যায়, অফিসে যাওয়ার জন্য বেরিয়েছেন তিনি। কিন্তু আজ কোনও কারণে তাঁর মন বশে নেই। ক্রমাগত ধাক্কা খাচ্ছেন, লোকের গালি খাচ্ছেন, এবং সেদিকে ফিরেও তাকাচ্ছেন না।
অন্যমনস্কভাবে ‘টোব্যাকো হাউস’ নামের দোকানটির সামনের ঢাকা বারান্দাটা পার হওয়ার সময় একটা মোক্ষম ধাক্কা খেয়ে দাঁড়িয়ে পড়তে হল রসময়কে। দোকানের কাচের দরজা খুলে হঠাৎই বেরিয়ে এসেছেন এক মোটাসোটা সাহেবি পোশাক পরা আধা-ফিরিঙ্গি বাঙালি ভদ্রলোক। ধাক্কাটা লেগেছে তাঁর সঙ্গে।
রসময় দস্তুরমতো তটস্থ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন। সাহেবদের চাইতেও বেশি ভয় পান তিনি এই বাঙালি সাহেবদের। এরা ডিহি কলকেতার নতুন অলংকার। অনেকেই এমনকী বাঙালিদের সঙ্গেও বাংলায় কথা বলতে রাজি হন না। পরনে থাকে খাঁটি সাহেবি পোশাক। ইনিও সেই বিজাতীয় বাঙালির এক সাক্ষাৎ উদাহরণ। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এঁরা অতিশয় বদমেজাজি হয়ে থাকেন। ধাক্কা খাওয়ায় রসময় এমনিতেই অপ্রস্তুত হয়ে পড়েছিলেন। তার উপর এমন একটি নমুনার সামনে পড়ে যাওয়ায় তিনি আরও ঘাবড়ে গিয়ে তাড়াতাড়ি জোড়হাত তুলে বললেন, ‘মাফ করবেন। আমি একদম দেখতে পাইনি।’
মোটাসোটা সাহেবি বাঙালি ভদ্রলোক কিন্তু অন্য ফিরিঙ্গিদের মতো খেঁকিয়ে উঠলেন না। তার বদলে কয়েক মুহূর্ত তীক্ষ্ণ চোখে রসময়ের দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন,‘ডু ইউ হ্যাভ এনি প্রবলেম, বাবু?’
রসময় ছাড়া ছাড়া গোছের ইংরেজি বলতে পারেন। কিন্তু ওই ক’টি মাত্র ইংরেজি শব্দ থেকেই তিনি বুঝে নিয়েছেন, এই বাঙালি ভদ্রলোক খাঁটি সাহেবি ইংরেজিতেই কথা বলবেন। তার সঙ্গে পাল্লা দেওয়া রসময় দে-র কর্ম নয়। ঝুঁকি না নিয়ে তিনি বাংলাতেই বললেন,‘মোটেই না, সাহেব। আমি একদম ঠিক আছি। আসলে আপিসে যেতে দেরি হয়ে যাচ্ছে বলেই...।’
‘ইট’স জাস্ট বাট নাইন! ইউ ওন’ট বি টু লেট!’
মোটে ন’টা! রসময় তাড়াতাড়ি পাঞ্জাবির বুকপকেট থেকে ঘড়ি বের করে সময় দেখলেন। ন’টা দশ বাজে ঘড়িতে। অফিস দশটা থেকে। সত্যিই আজ সব গোলমাল করে ফেলছেন রসময়। থতমত খেয়ে তিনি বলে বসলেন, ‘তাই তো! বড্ড আগেভাগে বেরিয়ে পড়েছি দেখছি! আসলে...।’
কথাটা শেষ না করেই চুপ করে গেলেন রসময়বাবু। তার কারণ আর কিছুই নয়, আসলে কালা সাহেবটি এই মুহূর্তে ভুরু কুঁচকে স্থির দৃষ্টিতে তাঁর দিকেই তাকিয়ে আছেন।
রসময় ঢোক গিললেন। এই কালা সাহেবদের শহরের সব্বাই ভয় খেয়ে চলে। এই সকাল ন’টাতেও সাহেবের মুখ থেকে স্পষ্ট ব্র্যান্ডির গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। মাতাল-টাতাল নয় তো?
‘দেখুন মশাই,’ রসময়কে চমকে দিয়ে সাহেব হঠাৎ পরিপাটি বাংলা বলতে শুরু করলেন, ‘আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে, আপনি কোনও কারণে বড্ড অস্থির হয়ে আছেন। চোখ দুটো দেখেও আপনাকে ঠিক মানসিকভাবে সুস্থ বলে মনে হচ্ছে না। আমার মনে হয়, আপনার উচিত আরও কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেওয়া। এই অবস্থায় রাস্তা পার হতে গেলে আপনি নিশ্চিতভাবেই ঘোড়ার পায়ের তলায় পড়বেন।’
কথাটা যে আদৌ মিথ্যা নয়, তা রসময়ের চাইতে ভালো করে কেউই জানে না। সাহেব সেটা কী করে আন্দাজ করলেন, সেটা অবিশ্যি রসময় বুঝতে পারলেন না। ইনি হঠাৎ এমন দরদ-ভরা চোখে তাঁর দিকে তাকিয়ে আছেন কেন, সেটাও ঠিক বোধগম্য হচ্ছে না। কিন্তু মানুষটার মুখটা দেখলেই মনে হয়, এর মধ্যে কোনও ঘোর-প্যাঁচ নেই। বরং বাহারি চুল আর গোঁফদাড়ির আড়াল থেকে যে চোখ দুটো এই মুহূর্তে তাঁর দিকে উদ্বিগ্ন দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে, সেটা একজন ভালো মানুষের চিহ্ন বহন করছে।
রসময় একবার রাস্তার দিকে তাকালেন। উন্মত্ত জনস্রোত তীব্র বেগে বয়ে চলেছে। বিপজ্জনক ভঙ্গিতে ছুটে চলেছে ঘোড়ার গাড়ি। সত্যিই অন্যমনস্ক অবস্থায় এই সময় চিৎপুরের বড় রাস্তা দিয়ে হাঁটা আত্মহত্যার শামিল।
‘কাম উইথ মি।’ সংক্ষিপ্ত এবং সোজাসুজি আদেশ এল এবার। সাহেব লম্বা লম্বা পা ফেলে রওনা দিয়েছেন দোকানের লাগোয়া গলিটার দিকে।
এখানে যে একটা শরবতের দোকান রয়েছে, সেটা এত বছর যাতায়াত করলেও কখনও খেয়াল করেননি রসময়। এখানেই নিয়ে গিয়ে তাঁকে বসিয়ে দিলেন ভদ্রলোক। ইংরেজিতেই কিছু একটা আনার আদেশ দিলেন। তারপর তাঁর কৌতূহলী চোখ ফিরে এল রসময়ের মুখের উপরে।
‘আপনার কোনও মানসিক অস্থিরতা থাকলে আমাকে বলতে পারেন— মানে যদি খুব বেশি ব্যক্তিগত না হয়।’
এটা যে ইংরেজদের একটা ভদ্রতা দেখানোর পদ্ধতি, সে কথা অবশ্য রসময়ের জানা আছে। আজ এগারো বচ্ছর হয়ে গেল ‘কেভিন অ্যান্ড কেলমার’ কোম্পানির তহবিল সামলাচ্ছেন তিনি। কম সাহেব তো দেখলেন না। গায়ের রংটি রীতিমতো কৃষ্ণবর্ণ হলেও বোঝাই যাচ্ছে, সামনে বসে থাকা ভদ্রলোকটি অন্তর থেকে খাঁটি ইংরেজ।
খানিকক্ষণ তাঁর দরদি চোখের দিকে তাকিয়ে থেকে হঠাৎ রসময় বলে ফেললেন, ‘আসলে কাল একটা বই পড়েছি সাহেব। তারপর থেকেই বুঝলেন, মনটা আর বশে নেই।’
‘কোনও অসামান্য ইংরেজি বই নিশ্চয়ই? মিল্টন?’
‘আজ্ঞে না সাহেব। বাংলা বই।’
সত্যিকারের বিস্ময়ে সাহেবের চোখ দুটো বড় বড় হয়ে গেল। প্রায় এক মিনিট চুপ করে তাঁর দিকে তাকিয়ে থেকে তিনি বললেন,‘আপনি বাংলা বই পড়েন?’
কথাটা শুনতে অপমানজনক। কিন্তু রসময় নিজেও জানেন, এত কম সংখ্যক বাঙালি বাংলা বই পড়ে যে, এমন কথা শুনলে যেকোনও মানুষের চোখ বড় বড় হয়ে যাওয়ারই কথা। একে তো বাংলা বই প্রায় পাওয়াই যায় না। বিদ্যেসাগর মশাইয়ের অনুবাদ করা ‘বেতাল পঞ্চবিংশতি’ ও অন্য বইগুলি বা সদ্য-প্রকাশিত ‘ভ্রান্তিবিলাস’— এগুলি বাদ দিলে মোটের উপর সেই কৃত্তিবাস, কাশীরাম, মুকুন্দরাম— এঁরাই সম্বল। তার উপর স্কুল থেকে পাশ করা ছেলেরা বাংলার আগে ইংরেজি বই পড়তে শেখে। আর সেই ভাষায় বইয়ের সংখ্যা অনন্ত বললেই হয়। কাজেই শিক্ষিত মানুষ কদাচিৎ বাংলা বই পড়ে।
সব চাইতে বড় কথা, রসময়ের এই মুহূর্তের উদ্ভ্রান্ত বেশবাস এবং মুখ-চোখ দেখলে তাঁকে আর যাই হোক, রসিক পাঠক বলে কল্পনা করা প্রায় অসম্ভব। সাহেবের বিস্মিত হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে। ‘‘নিশ্চয়ই বিদ্যাসাগর মহাশয়ের অনূদিত ‘শকুন্তলা’ বইটি পড়েছেন আপনি। নইলে ‘সীতার বনবাস।’ এগুলি পড়লে অবশ্য চোখের জল সামলানো মুশকিল হয়ে পড়ে। আপনার চোখের পাতা এখনও ভিজে রয়েছে। ভালো কথা, এখনও আপনার নামটি জিজ্ঞাসা করা হয়নি।”
‘আজ্ঞে আমার নাম রসময় দে। কাছেই রানি মুদির গলিতে আমার বাসা। কেভিন অ্যান্ড কেলমার কোম্পানিতে আমি কেরানির চাকরি করি।”
সাধারণত এর উত্তরে নিজের পরিচয় দেওয়াই শিষ্টাচার। এই ভদ্রলোক সে পথে হাঁটলেন না। কৌতূহলের সঙ্গে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কিন্তু তাহলে কোন বই পড়ছিলেন আপনি?’
“আজ্ঞে এই সদ্য একটি বই বেরিয়েছে। ‘মেঘনাদবধ’ কাব্য। সেইটে পড়েছি।’’
‘কী নাম বললেন বইটার?’
‘আজ্ঞে মেঘনাদবধ কাব্য।’ সাহেবের মুখটা যে মুহূর্তের মধ্যে একেবারে বদলে গিয়েছে, রসময় বলার উত্তেজনায় সেটা খেয়াল করলেন না, ‘সেইটে কাল বাড়ি ফেরার সময় কিনে এনেছিলুম। রাত্রে খেয়েদেয়ে পড়তে বসলুম। ভাবলুম কয়েক পাতা পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়ব। কী বলব— সারারাত জেগে পড়লুম মশাই! একেবারে ঠায় সারাটি রাত বসা! দু’চোখের পাতা এক করতে পারলুম না! তার সে কী ছন্দ! সে কী শব্দ! কার সাধ্যি বিশ্বাস করে— এ বাংলা কাব্য পড়ছি!’
‘বটে বটে! বিশ্বাস না করার কী আছে?’
সাহেবের ভয় ভুলে মেরে দিয়ে টেবিল চাপড়ে রসময় বললেন,“আরে মশাই, এর আগে পড়িচি ঈশ্বর গুপ্তের তোপসে মাছ আর পাঁঠা। ‘এমন পাঁটার নাম যে রেখেছে বোকা। নিজে সেই বোকা নয় ঝাড়বংশ বোকা।।’ সেখান থেকে সটান একেবারে— ভাবুন দেখি— ‘এ কনক-পুরে ধনুর্ধর আছে যত, সাজ শীঘ্র করি চতুরঙ্গে! রণরঙ্গে ভুলিব এ জ্বালা— এ বিষম জ্বালা যদি পারি রে ভুলিতে!’ বুঝতে পারছেন ব্যাপারটা? একেবারে এক লাফ দিয়ে যেন মগডালে উঠে গেলুম!”
কাঁধে ঝাড়ন দেওয়া একটা লোক যে দুই গ্লাস শরবত রেখে দিয়ে গেল, সেটা এঁরা কেউই খেয়াল করলেন না। সাহেব কাঁপা গলায় বললেন, ‘আর যেখানে মেঘনাদের মৃত্যু হল? তারপর ধরুন— শেষটা কেমন লাগল?’
‘‘আপনি নিজেই তো বললেন, এখনও চোখ ভিজে আছে। ওই যখন কবি লিখছেন—‘লঙ্কার পঙ্কজ-রবি গেলা অস্তাচলে। নির্ব্বাণ পাবক যথা, কিংবা ত্বিষাম্পতি শান্তরশ্মি, মহাবল রহিলা ভূতলে।’ আমি একেবারে ঝরঝর করে কেঁদে ফেললুম।” বলতে বলতে রসময়ের গলাও কাঁপতে লাগল, যেন তিনি এখনই আবার কেঁদে ফেলবেন।
‘আপনি কি এক রাতে পুরো কাব্যটা মুখস্থ করে ফেলেছেন নাকি?’
সত্যি সত্যি পাঞ্জাবির পকেট থেকে রুমাল বের করে চোখ মুছলেন রসময়। তারপর সামান্য ধরা গলায় বললেন, ‘আপনারা তো এসব পড়েন না সাহেব। আমার কথায়... এক সামান্য কেরানির কথায় একবার এই কাব্যটি পড়ে দেখুন। আপনারও যদি মুখস্থ না হয়ে যায়, তবে আপনি আমার নাম ফিরে রাখবেন।’
‘আর ওই শেষটা?’
“আহা! ‘সপ্ত দিবানিশি লঙ্কা কাঁদিলা বিষাদে।’ সাধে কি আর এই সাত-সকালে এমন অবস্থায় রাস্তায় বেরিয়ে পড়েছি সাহেব! এমন কাব্য বাংলা ভাষায় এর আগে কখনও লেখা হয়নি, এ আমি হলফ করে বলতে পারি! আর বোধ করি হবেও না।”
সাহেবের মুখ ইতিমধ্যে টকটকে লাল হয়ে গিয়েছিল। প্রাণপণে নিজেকে সংযত করে নিয়ে তিনি বললেন, ‘তা কি আর বলা যায়? সেই কবি যদি পারেন... কিন্তু আপনার বোধহয় আপিসে দেরি হয়ে যাবে এরপর। আমারও আদালতে যেতে হবে।’
‘সাহেব বুঝি আদালতে ব্যারিস্টারি করেন?’
‘না, আমিও চাকরিই করি। এই কাছেই আমার বাড়ি। ছ’ নম্বর চিৎপুর রোড। বেরিয়েছিলাম চুরুট কিনতে। এবার বাড়ি ফিরে স্নান-খাওয়া করে যেতে হবে কোর্টে। আপনি সাবধানে যান। অমন অন্যমনস্ক হয়ে হাঁটাচলা ভালো কথা নয়।’
রসময় উঠে পড়ে আরও একবার মুখটা মুছে নিলেন অকারণেই। সাহেবের দিকে তাকিয়ে একটু ফিকে হেসে ধীর পায়ে তিনি হাঁটা লাগালেন তাঁর অফিসের দিকে। এরপর সত্যিই দেরি হয়ে যাবে।
বড় রাস্তায় উঠে এসে একটা চুরুট ধরালেন সাহেবি পোশাক পরা মোটাসোটা ভদ্রলোক। তারপর ঢুকে পড়লেন কাছেই একটা পুরনো এজমালি বাড়িতে।
হেনরিয়েটাকে এই ঘটনাটা কতটা রং চড়িয়ে বলবেন, ছ্যাৎলা-ধরা সিঁড়ি বেয়ে সেটাই ভাবতে ভাবতে উঠতে লাগলেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত।