


ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন (এসআইআর)-এর নামে দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের ‘একতরফা স্বেচ্ছাচারী’ ভূমিকা নিয়ে বিরোধীদের লাগাতার অভিযোগ ও আক্রমণে চাপে রয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার তথা বিজেপি। এবার নরেন্দ্র মোদি-অমিত শাহদের একাধিক জোটসঙ্গীও এই ইস্যুতে প্রশ্ন তোলায় পরিস্থিতি আরও যে ঘোরালো হয়ে উঠেছে সন্দেহ নেই। দুই নির্বাচন কমিশনারকে কার্যত অন্ধকারে রেখে এসআইআর সংক্রান্ত যাবতীয় সিদ্ধান্ত জ্ঞানেশ কুমার একা নিয়েছেন বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এমনকি এই নিয়ে অন্য দুই কমিশনারের লিখিত আপত্তিতে কোনোরকম গুরুত্বই দেননি মুখ্য নির্বাচন কমিশনার বলে অভিযোগ ওঠায় জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফা ও গ্রেফতারেরও জোরালো দাবি উঠেছে দেশজুড়ে। বল গড়িয়েছে সুপ্রিম কোর্টেও। সংসদে তাঁর বিরুদ্ধে ‘ইমপিচমেন্ট’ আনার প্রস্তুতি নিচ্ছে বিরোধীরা। জেন জি-র সাড়া জাগানো সংগঠন ককরোচ জনতা পার্টি বড়োমাপের আন্দোলনের প্রস্তুতির কথা ঘোষণা করেছে। এই প্রেক্ষিতে নির্বাচন কমিশন এবং বিজেপি এই জ্ঞানেশ কুমারকে বাঁচাতে নানা সাফাই দেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে। কিন্তু এনডিএ-র একাধিক জোটসঙ্গী জ্ঞানেশ কুমারের ভূমিকা ও নির্বাচন কমিশনের ‘নিরপেক্ষতা’ নিয়ে প্রশ্ন তোলায় রীতিমতো ব্যাকফুটে মোদি-শাহরা। এলজেপি, টিডিপি, রাষ্ট্রীয় লোকমঞ্চ, রিপাবলিকান পার্টি অব ইন্ডিয়ার মতো শরিকদের সাফ বক্তব্য, কমিশনের মতো স্বাধীন সাংবিধানিক সংস্থার ভূমিকা, বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, মানুষের মধ্যে সন্দেহ যখন দানা বেঁধেছে, তখন মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের উচিত যথাযথ ব্যাখ্যা সহযোগে কমিশনের অবস্থান স্পষ্ট করা। একেবারেই সঠিক বক্তব্য। বলা বাহুল্য দেশের গণতন্ত্র রক্ষার স্বার্থে প্রকৃত সত্যটি সামনে আসুক।
পশ্চিমবঙ্গ, বিহার-সহ একাধিক রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপিকে সুবিধা পাইয়ে দিতে জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে ‘ভোট চুরি’র গুরুতর অভিযোগ নিয়ে দেশজুড়ে তোলপাড় শুরু হলেও মুখে কুলুপ এঁটেছেন প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী! বস্তুত কেন্দ্রের কোনো মন্ত্রীকেই এ পর্যন্ত মুখ খুলতে দেখা যায়নি। আর স্বয়ং মুখ্য নির্বাচন কমিশনার কার্যত ‘মিসিং’! খবরে প্রকাশ, সর্বভারতীয় এক ইংরাজি দৈনিকে কমিশনের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের খবর প্রকাশের পর থেকেই জ্ঞানেশ কুমারকে প্রকাশ্যে দেখা যাচ্ছে না! এমনকি গত বৃহস্পতিবার উত্তরপ্রদেশের মিরাটে স্কুল-কলেজ পড়ুয়াদের একটি সম্মেলনে যোগ দেওয়ার কথা ছিল মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের। শনিবার প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনি কেন্দ্র বারাণসীতে জেন জি-র সঙ্গে আলোচনা সভায় অংশ নেওয়ার কথা ছিল তাঁর। এই দুটি কর্মসূচিই কোনো ‘অদৃশ্য কারণে’ বাতিল করা হয়েছে! যদিও বলা হচ্ছে, পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ, গত দু’ বছরে নতুন ভোটারদের নাম তোলার রুটিন কাজ বন্ধ রেখেছে কমিশন। বেকারি, কর্মসংস্থানের দাবিতে সোচ্চার যুবসমাজ যাতে ভোটার হিসাবে নাম তুলতে না পারে, সেই কারণেই নাকি কমিশনের এই সিদ্ধান্ত। অভিযোগ তেমনই। এই পরিস্থিতিতে ইংরাজি দৈনিকের খবর সামনে আসায় তরুণদের মুখোমুখি হতে হয়তো চাননি জ্ঞানেশ কুমার। তাই তাঁর দুটি কর্মসূচিই বাতিল করা হয়েছে। কমিশন অবশ্য যথারীতি এই যুক্তি খারিজ করে দিয়েছে। মানুষের মনে কিন্তু প্রশ্ন জাগছে, তাহলে কি ডাল মে কুছ কালা হ্যায়!
বস্তুত ২০২৫ সালে এসআইআর শুরুর পর থেকেই কমিশনের কাজের বিরুদ্ধে পাহাড় প্রমাণ অভিযোগ জমতে শুরু করে। কমিশনের দেওয়া তথ্যেই জানা যাচ্ছে, ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধনের ফলে দেশে এ পর্যন্ত ১৩ কোটি ভোটারের নাম বাদ পড়েছে। সংখ্যাটা ২০২৪-এর মোট ভোটারের প্রায় ১২ শতাংশ। এই বিপুল সংখ্যক নাম বাদ পড়া তালিকার ভিত্তিতেই একের পর এক রাজ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে চলেছে। বলাই বাহুল্য, এই নিয়ে প্রায় সব বিরোধী দল সরব হলেও তারা কিন্তু প্রতিটি ভোটে অংশ নিচ্ছে। এই নিয়েই বিরোধী দলগুলির উদ্দেশে নৈতিকতার প্রশ্ন তুলেছে ককরোচ জনতা পার্টি। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার ‘ভোট চুরি’ করে বিজেপিকে জেতাতে সাহায্য করছেন বলে অভিযোগ তুলেছে বিরোধীরা। তাহলে এর প্রতিবাদে কেন বিরোধীরা ভোট বয়কট করছে না—সেই নৈতিকতার প্রশ্নটাই তুলে দিয়েছে ককরোচ নেতৃবৃন্দ। তাদের বক্তব্য, নির্বাচনের নামে প্রহসন হচ্ছে জেনেও সেই নির্বাচনে অংশ নিলে সেই ‘প্রহসনের নির্বাচন’কে বৈধতা দেওয়া হয়। তাদের এই বক্তব্যটি একেবারেই ফেলে দেওয়ার মতো নয়। সন্দেহ নেই, ভোটারদের একটি অংশও ককরোচদের এই মতের সমর্থক। কিন্তু নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী দেশের কোনো দলই এই পথে হাঁটতে নারাজ। যদিও এতে বিজেপিরই সুবিধা হবে বলে মনে করে অনেকে। অথচ দেখা গিয়েছে, মোদি জমানায় নাগরিকদের ভোটদানের অধিকার খর্ব হচ্ছে! এখন পরিস্থিতি যে দিকে গড়াচ্ছে তাতে দেখা যাচ্ছে রাস্তায় নেমে, আইনসভায়, আদালতের দ্বারস্থ হয়ে লড়াই চালিয়ে ‘প্রতারণা-প্রহসনের’ (অভিযোগ) জবাব দিতে চায় বিরোধীরা। কিন্তু নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা, স্বচ্ছতা বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাটা কখনোই কাম্য নয়। কিন্তু এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে জ্ঞানেশ কুমার ও বিজেপির ‘আঁতাত’ নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে তা যথেষ্ট অস্বস্তিতে ফেলেছে কেন্দ্রের শাসকদলকে। কীভাবে তারা এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করে সেটাই দেখার।