


বিশ্বজিৎ দাস, কলকাতা: দুর্ঘটনায় সুকুর আলির ডান উরু ভেঙেছিল বছর দশেক আগে। কলকাতা মেডিকেল কলেজে অপারেশনের পর জুড়েও গিয়েছিল সেই ফিমার বোন। রডের মতো দেখতে নেইল আর স্ক্রু লাগিয়ে তখন অপারেশন করেছিলেন চিকিৎসকরা। সুকুর সুস্থ হয়ে মুম্বইয়ে গিয়ে ফের জরির কাজ শুরু করেছিলেন। মাস তিনেক আগে ফের পায়ে ব্যথা শুরু হলে ডাক্তার দেখিয়ে ওষুধ খেতে শুরু করেন তিনি। এভাবে ঠেকনা দিয়ে চলেছে কয়েকদিন। একদিন দেখেন, ডান পা আর নাড়াতেই পারছেন না। ফলে ফের মেডিকেল। এবার এক্স-রেতে ধরা পড়ল সাংঘাতিক কাণ্ড! ডান পায়ের কোমর থেকে হাঁটু পর্যন্ত রড লাগানো হয়েছিল, সেটি ভেঙে গিয়ে চার টুকরো! সেকারণেই পায়ে জোরই পাচ্ছেন না সুকুর।
এরপর যা হল, তা অবাক করে দেওয়ার মতোই ঘটনা। চার টুকরো হয়ে যাওয়া সেই রড তো বের করতে হবে। না হলে নতুন রড ঢোকাবে কী করে! পুরানো রডটি হাড়ের ভিতরে পাইপের মত অংশে গেঁথে রয়েছে যে! এটি বের করতে হলে দরকার ‘ব্রোকেন নেইল টিপ রিমুভার’ নামের একটি যন্ত্র। হাসপাতালে এমন কেস বছরে একটি আসে কি না, সন্দেহ। ফলে ওই যন্ত্র সচরাচর সব হাসপাতালে থাকে না। মাত্র একজন রোগীর ওই যন্ত্র সরকারিভাবে আনাতে হলে মাস কাবার হয়ে যাবে। দাম প্রায় ৫০ হাজার টাকা। তবে ভাড়ায় পাওয়া যায়, তাও খরচ অন্তত ১৮ হাজার টাকা। তাতেও চিঠি-চাপাটি করে যন্ত্র হাতে পেতে যা সময় লাগবে, তাতে রোগীর অবস্থা আরও খারাপের দিকে যেতে পারে।
এই সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে মেডিকেল কলেজের অর্থোপেডিক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডাঃ সৈকত সাউ এক অভিনব কাণ্ড করে বসলেন! হাওড়ার জগৎবল্লভপুরের বাদেবালিয়ায় তাঁর গ্রামের বাড়িতে ‘অনিলদাদু’ বলে এক দক্ষ মেকানিক রয়েছেন। তাঁকে যন্ত্রটির বিবরণ দিয়ে বানিয়ে দিতে অনুরোধ করলেন। নতুন চ্যালেঞ্জিং কাজ পেয়ে ‘অনিলদাদু’ও (অনিল বেরা) বেজায় খুশি। ১০ মিনিটেই বানিয়ে দিলেন হ্যান্ডমেড যন্ত্র। হাসপাতালে অপারেশনের আগে ওই যন্ত্র অটোক্লেভ মেশিনে ঢুকিয়ে জীবাণুমুক্ত করে নেন তিনি। গত মঙ্গলবার সেই হ্যান্ডমেড ব্রোকেন নেইল টিপ রিমুভার দিয়ে সাফল্যের সঙ্গেই বের করে আনা হল ভাঙা রডের টুকরোগুলি। এতদিন হাড়ের সঙ্গে রডের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় মেটালোসিন নামের এক ধরনের যৌগ তৈরি হয়েছিল সুকুর আলির ডান পায়ে। সেগুলিও বের করে আনা হয়েছে। তারপর নতুন দামি নেইল এবং স্ক্রু দিয়ে ফের ফিক্স করা হয়েছে উরুর হাড়কে। প্রায় ৩ ঘণ্টা ধরে চলেছে এই অপারেশন।
ডাঃ সৈকত সাউ বলেন, যেমন দরকার ছিল, ঝটপট তেমনই যন্ত্র বানিয়ে দিয়েছেন ওই বৃদ্ধ মেকানিক। প্রথাগত শিক্ষা ছাড়াও বাংলায় কত মানুষ কত অসাধারণ ও নিপুণভাবে কাজ করতে পারেন, এ হল তারই উদাহরণ। সুকুর আলির ভাই নাজিমুল বলেন, মেডিকেলে এই অপারেশনে কোনো খরচই হয়নি। দাদাকে কবে বাড়ি নিয়ে যাব, সেই অপেক্ষায় আছি।
সেই যন্ত্র হাতে অনিল বেরা।