


পক্ষে
মিত্রাভ জানা
ছোটদের মধ্যে খেলাধুলোর প্রবণতা আজ যেন এক শুকিয়ে যাওয়া নদী। প্রতিযোগিতার ইঁদুর দৌড়ে শামিল হওয়া ছেলেমেয়েরা খেলার অভ্যাস হারিয়ে ফেলছে। যেটুকু সময় পাওয়া যায়, তা তারা স্মার্টফোনেই কাটিয়ে দেয়। ছোটদের কাছে খেলা বলতে এখন অনেকাংশেই ডিজিটাল দুনিয়ার গেম। এতে মাঠে গিয়ে কসরতের দরকার পড়ে না। ফলস্বরূপ, শারীরিক সুস্থতার পাশাপাশি হারিয়ে যাচ্ছে দলগত চেতনা ও সামাজিক বন্ধন। প্রতিযোগিতার দৌড়ে সফলতার চাহিদা আর অন্যদিকে সাড়ে ৬ ইঞ্চির স্ক্রিনে আঙুল নাচনে বারংবার খেলার অভ্যাস ধ্বংস করছে, ছোটরা বঞ্চিত হচ্ছে উপযুক্ত শারীরিক এবং মানসিক বিকাশ থেকে।
কলেজ ছাত্র
অর্ণব মাইতি
সত্যিই, যতদিন যাচ্ছে তত ছোটদের মধ্যে খেলাধুলোর প্রবণতা কমছে। আজকাল কম বয়সেই অতিরিক্ত পড়াশোনার চাপে ছোটরা মাঠে যাওয়ার প্রায় সময়ই পায় না। প্রায় সবসময়ই তারা স্কুলের হোমওয়ার্ক কিংবা একাধিক টিউশনে ব্যস্ত। তার উপর দোসর আঁকা, গান বা গিটার ক্লাস। এসব মিটিয়ে তারা যেটুকু অবসর পায় তাতে ডুবে যায় মোবাইল বা টিভিতে। আজকাল ছোটদের শান্ত রাখতে অভিভাবকরা কম বয়সেই তাদের হাতে তুলে দেন মোবাইল বা টিভির রিমোট যা পরে পরিণত হয় আসক্তিতে। এছাড়া অনেকসময় হাতে সময় থাকলেও অভিভাবকরা ছোটদের মাঠে পাঠাতে অনীহা বোধ করেন অসুস্থতা ও চোট আঘাতের ভয়ে। কিন্তু তারা এটা ভুলে যান খেলাধুলো সুস্থ শরীর ও চরিত্র গঠনের জন্য ঠিক কতটা উপকারী।
কলেজ ছাত্র
তনিমা গোস্বামী রায়চৌধুরী
শরীর গঠন ও মনের প্রসারতার জন্য খেলার কোনও বিকল্প নেই। কিন্তু বর্তমান প্রজন্ম পারিবারিক ও সামাজিক চাপের জাঁতাকলে পড়ে শৈশবের আনন্দ হারিয়ে ফেলছে। প্রতিদিন টিউশন সেরে তারা যখন বাড়ি ফেরে, তখন সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত। সোনালি বিকেলের অবসর-বিনোদনের অভাবটা ওরা পূরণ করছে মুঠোফোনের মাধ্যমে। একটা সুস্থ সমাজ গড়ে তোলার তাগিদেই ছোটদের খেলাধুলোয় আগ্রহী করে তুলতে হবে। রাষ্ট্রেরও ভূমিকা রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থার পাঠ্যসূচির বোঝা যুগোপযোগী করে শিশুকে সুস্থ দেহ-মনের অধিকারী করে গড়ে তোলার।
শিক্ষিকা
দেবাশ্রিতা দাস
প্রতিটি শিশুর মানসিক এবং শারীরিক বিকাশের ক্ষেত্রে খেলাধুলোর জরুরি। বর্তমানে অভিভাবকরা ছোটদের কাঁধে পাহাড়প্রমাণ বইয়ের বোঝা চাপিয়ে দিয়েই ক্ষান্ত হন না। পাশাপাশি নাচ, গান, আঁকা, আবৃত্তি বিষয়েও পারদর্শী করতে চান। ফলে নানা শিক্ষায়তনে তাদের ভর্তি করেন। এর ফলে ছোটদের বিকেলে খেলতে যাওয়ার সময়টুকুও আর থাকে না। এত কিছুর চাপে তাদের ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত শরীর অবসরযাপনের উপায় হিসাবে বেছে নেয় সহজলভ্য ভিডিও এবং মোবাইল গেমস। এর থেকে ক্রমশ মনমরা ও যান্ত্রিক হয়ে উঠছে তারা। সার্বিক বিকাশ ব্যাহত হচ্ছে তাদের।
শিক্ষার্থী
বিপক্ষে
দীপঙ্কর মান্না
খেলা মোটেও কমছে না। ছোটরা সুযোগ পেলেই খেলতে চায়। যতই বাড়িতে মা-বাবার বকুনি, স্কুলে শিক্ষক শিক্ষিকার শাসন থাকুক, তারা খেলবেই। অবশ্য এটা ঠিক এখনকার ছোটদের মধ্যে পড়াশোনার পাশাপাশি বেড়েছে নানা সৃজনশীলতার চাপ। তা সত্ত্বেও তারা অবসরে খেলার সাথী চায়। সময়ের সঙ্গে যেমন কমছে ছোটদের আউটডোর খেলা, তেমনই বেড়েছে বুদ্ধিদীপ্ত নানা ইনডোর খেলা। খেলাতেই পাওয়া যায় ছোটদের শারীরিক বিকাশ ও মানসিক শান্তি।
রিসেপশনিস্ট
পার্বতী মোদক
কথাটা কিছুটা সত্যি হলেও সম্পূর্ণ সঠিক নয়। আসলে ছোটদের মধ্যে খেলাধুলোর প্রতি আগ্রহটা কমানো হয়েছে। শিশুরা আজও খোলার মাঠ পেলে হইহই করে খেলতে নেমে পড়ে। প্রতিদিন স্কুলে টিফিন বা খেলার পিরিয়ডে খেলার জন্য বাচ্চাদের উদগ্রীব হয়ে থাকতে দেখি। কিন্তু এক্সট্রা কারিকুলার অ্যাক্টিভিটি, প্রতিযোগিতার চাপে বাচ্চাদের খেলার মাঠ থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছেন মা-বাবা। নাহলে আমার বিশ্বাস আজও বৃষ্টি নামলে
ওরা হইহই করে ফুটবল খেলবে,
কাদা মেখে কবাডি খেলবে।
শিক্ষিকা
রিয়া মুখোপাধ্যায়
একটা ধারণা তৈরি হয়েছে, এখনকার ছেলেমেয়েরা মাঠেঘাটে বেরিয়ে আর খেলে না। তাদের নাকি খেলাধুলোর প্রবণতাই নষ্ট হয়ে গিয়েছে। কিন্তু একটা কথা কি আমরা ভেবে দেখেছি, সব শিশুই যদি খেলাধুলোয় আগ্রহ হারিয়ে ফেলে তাহলে ক্রিকেট-ফুটবল কোচিং ক্যাম্পে ভিড় করে থাকে কারা? বরং কতিপয় বাবা-মা সন্তানের পড়াশোনার ক্ষতি হবে ভেবে ছেলেমেয়েদের প্রথাগত খেলাধুলায় সময় দিতে পারেন না। তাঁদের দিয়ে বিচার করা ঠিক নয়।
ছাত্রী
অন্তরা
সিংহ রায়
আজ যে ছোটরা মোবাইল ফোনে গেমস খেলতে ব্যস্ত, তাদের মোবাইলের সঙ্গে পরিচয় তো বাবা-মা কিংবা নিকট আত্মীয়রাই করান। তারপর ফোনের নেশা তৈরি হয়ে গেলে তাদেরই দোষারোপ করা হয়। বেশিরভাগ বাবা-মায়েরাই পড়ার সময় নষ্ট হবে বলে সন্তানদের খেলাধুলার সরঞ্জাম উপহার দেন না। কিন্তু ছেলেমেয়েরা স্কুলে টিফিন টাইমে বা পিকনিকে গেলে খেলাধুলো করে সময় কাটাতে চায়। তাই ওদের খেলাধুলোর প্রবণতা ভালোই রয়েছে। যেটুকু যা ঘাটতি তা আমাদের তরফে।
চাকরিজীবী