


ঘটনা ১: এম.টেক করতে গিয়ে আলাপ। প্রায় পাঁচ বছর ধরে একে অন্যকে চেনে আদিত্য ও তৃষা। শুধু চেনে বললে কম বলা হবে। পছন্দও করে, এমনকী, গত তিন বছর ধরেই একটা স্টেডি সম্পর্কে আছে দু’জনে। ওদের বাড়ি থেকেও বিষয়টা জানে। আদিত্যর চাকরি হয়েছে হায়দরাবাদে। তৃষা কলকাতায় পোস্টেড। আদিত্য কলকাতায় ট্রান্সফারের সুযোগ খুঁজছে। এখানে চলে এলেই চার হাত এক হবে। কিন্তু গত কয়েক মাস ধরে তৃষাকে যেন এড়িয়ে চলছে আদিত্য। হায়দরাবাদে পৌঁছে একটু থিতু হওয়ার পর থেকেই আদিত্যর এমন পরিবর্তন। এখন আর নিজে থেকে ফোন করে না তৃষাকে। ও ফোন করলে স্বাভাবিকভাবেই কথা বলে। তবে গলায় সেই উষ্ণতা যেন আর নেই! তৃষা সরাসরি প্রশ্নও করেছে, উত্তরের বদলে উল্টে জেরা করছে ধরে নিয়ে ঝগড়া করেছে আদিত্য। তারপর থেকে কথা আরও কমে গিয়েছে। যেখানে দিনে অন্তত আধ-এক ঘণ্টা কথা বলত ফোনে, সেখানে কথা বলা এসে দাঁড়িয়েছে দশ মিনিটে। কোনও কোনও দিন কথা হচ্ছেও না আদিত্যর নানা ব্যস্ততায়। মাস কয়েক আগেও একদিন তৃষা ফোন না করলে যে ছেলে রাগ করত, আজকাল সেই স্রেফ হোয়াটসঅ্যাপে নিয়মমাফিক খোঁজখবরকেই যথেষ্ট বলে মনে করছে।
ঘটনা ২: সদ্য প্রেমে পড়েছে অমলেন্দু। মেয়েটি ওর ছাত্রী। বিএসসি থার্ড ইয়ার। অমলেন্দু নিজে একটি ভালো সরকারি চাকরি করে। সঙ্গে সরকারি চাকরির পরীক্ষার কোচিং দেয়। মেয়েটিকে ওর বাবা একদিন অমলেন্দুর কোচিংয়ে ভর্তি করিয়ে দেন। মেয়েটির মাথা ভালো। ছাত্রীর পারফরম্যান্স থেকেই ভালো লাগা শুরু। তারপর মেয়েটিও অমলেন্দুর প্রতি দুর্বলতা খুব সাবধানী হয়ে দু’-একবার প্রকাশ করেছে। অমলেন্দুও তাতে সায় দিয়েছে। মোট কথা, তাদের সম্পর্ক এখনও পূর্বরাগ পর্যায়ে। সে বিষয়ে মেয়েটির বাবা বোধহয় কিছু আঁচ করেছেন। তার পর থেকেই সরকারি চাকুরে জামাই পেতে তিনি একটু বেশিই উৎসাহী হয়ে পড়েছেন। যখন তখন অমলেন্দুকে চায়ের আড্ডায় নেমন্তন্ন করে ফেলছেন, মেয়ের সঙ্গে দেখা করে কোনও বিষয় আলাদা করে বুঝিয়ে দিতে বলছেন। এমনকী, অমলেন্দুর যে তাঁর মেয়েকে ভালো লেগেছে এ কথা ফলাও করে কয়েকজনকে বলেও বসেছেন। নিজে একজন শিক্ষক, ব্যাচ ব্যাচ ছাত্রছাত্রী তার কাছে পড়তে আসে ও মেয়েটি তার একজন ছাত্রী— তাই বিষয়টা নিয়ে খুব সাবধানে ও ধীরে এগতে চেয়েছিল অমলেন্দু। কিন্তু এই ভদ্রলোক হুড়োহুড়ি করে তা হতে দিচ্ছেন না। রোজই নতুন অস্বস্তিতে পড়তে হচ্ছে অমলেন্দুকে। এখন মনে হয়, সম্পর্কটা না এগলেই ভালো হয়।
ঘটনা ৩: বিয়ের কথা শুরু হয়েছিল শুভ্র ও সায়নীর। ওরা প্রেমে পড়েছে কলেজে এসে। দু’বাড়িই খুশি মনে মেনে নিয়েছিল ওদের মেলামেশা। এখন দু’জনেই কলকাতা শহরে চাকরি করে। কিন্তু পাকা কথা হয়ে যাওয়ার পরে হঠাৎই শুভ্র লক্ষ করছিল সায়নীর ইনভলভমেন্ট কেমন যেন কমে যাচ্ছে। আজকাল সায়নীর যত কথা, যত আলোচনা সবই ওর বেস্টফ্রেন্ড ময়ূখের সঙ্গে। বরাবরই শুভ্রর মনে হয়েছে, ময়ূখের একটা সফট কর্নার আছে সায়নীর জন্য। যদিও সায়নীর তরফে তেমন কোনওদিনই ছিল না। কিন্তু সেই মেয়েও কেমন যেন পাল্টে যাচ্ছে। গত সোমবার অফিস থেকে ফিরে মায়ের কাছে খবরটা শুনে হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল শুভ্র। সায়নীর বাবা ফোন করে বিয়েটা ক্যানসেল করতে চেয়েছেন। বারবার ক্ষমা চেয়ে বলেছেন, মেয়ের মত নেই আর। সে অন্য একজনকে পছন্দ করেছে! তাঁদের এতে সমর্থন না থাকলেও শুভ্রর সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দু’জনের জীবন নষ্ট করতে চান না তাঁরা!
উপরের তিনটি ঘটনার প্রতিটি বাস্তব ঘটনা। নাম পরিবর্তিত কেবল। জীবনে প্রেম এলে তা যেমন অনন্য এক অনুভূতি তৈরি করে, তেমনই কিন্তু অনেক পারিপার্শ্বিক চাপ নিয়েও সে আসে। একটি সম্পর্কে শুধু প্রবেশ করলেই হয় না। চাপের মুখে তাকে বাঁচিয়ে রাখতেও শিখতে হয়। বিপদে-আপদে পাশে থাকা, বন্ধুত্ব, সহায় হওয়া এগুলোরও প্রথমে আসে বিশ্বাস। যা না থাকলে কোনও প্রেমই পূর্ণতা পায় না। তবে এই বিশ্বাসের অঙ্কেই তুমুল গণ্ডগোল করে ফেলেন অনেকে। কেউ স্বভাবে, কেউ বা সাময়িক সিদ্ধান্তে। বিশ্বাস-আস্থা ও আত্মবিশ্বাসের ফাঁক গলে সেখানে ঢুকে পড়েন তৃতীয় কেউ। কিন্তু ঠিক কী কারণে মন অন্য পথে হাঁটা দেয়? এর উত্তর আজও অজানা। সম্পর্কের রংবদলের নির্দিষ্ট কারণ বলে আলাদা করে কিছু হয়ও না। তবু মনোবিদ্যার অলিগলি ধরে হাঁটলে কিছু চর্চিত কারণ উঠে আসে।
তৃতীয় বলে তৃতীয় কিছু নেই
চমকের ডালি সাজিয়ে মন নামক মালি আমাদের ভিতরেই জীবনের আনন্দকানন তৈরি করে নিয়ত। এই যে প্রচ্ছদের বিষয়, সম্পর্কে তৃতীয় ব্যক্তি— এই ‘তৃতীয়’ শব্দটি নিয়েও অনেক কিছু ভাবার রয়েছে। কে তৃতীয় ব্যক্তি? কার চোখে তৃতীয় ব্যক্তি তিনি? প্রেমের সম্পর্কে তৃতীয় ব্যক্তি আলোচনা করতে বসলে প্রথমেই এই শব্দে এসে চোখ আটকায়। তাই সূচনাপর্বেই বলে রাখা ভালো, কোনও সম্পর্কে ‘অবৈধ’ বা ‘তৃতীয়’ বলে কিছু হয় না, বোঝাতে চাইছেন বিশেষজ্ঞরা। তৃতীয় কথাটি খুবই আপেক্ষিক। যিনি একটি সম্পর্কে থেকে অন্য কারও প্রতি আকৃষ্ট হয়েছেন, তাঁর চোখে নতুন জন মোটেই ‘তৃতীয়’ কেউ নয়। বরং সবটুকু গুরুত্ব পাওয়ার মতো একজন। তাঁদের দু’জনের নিজস্ব পরিসরে তাঁরা শুধুই একে অন্যের জন্য। তৃতীয় হয়ে ওঠার কথা তখনই আসে, যখন সমাজ ও প্রথমজনের প্রেক্ষিতে বিষয়টি ভাবা হয়। আমাদের সমাজের কিছু রীতি নিয়ম আছে, কিছু অনুশীলন আছে, তার বাইরে বেরলে সেটিকে সিস্টেমের বাইরে যাওয়া বলে। আমজনতার একটি অংশ এই সিস্টেমের বাইরে যাওয়াকে সমর্থন করতে পারে না। তাতে প্রেম আটকায় না বটে, তবে সামাজিক হেনস্তার চাপ থাকে। তারপরেও মানুষ শুধু প্রেমের টানেই কত কী না করে! ঝুঁকিও নেয়। মনের গতিবিধি আসলে বড় সরল। ঠিক ততটাই জটিল। মহাভারতের যুধিষ্ঠির ঠিক যেমনটি বলেছিলেন— এই বিশ্বে সবচেয়ে দ্রুত গতিশীল মানুষের মন!
দুই চিকিৎসক বোঝালেন, সম্পর্কে বা প্রেমে তৃতীয় কারও প্রবেশ নিয়ে আলোচনায় তাই সামাজিক মানদণ্ড আমরা নির্দেশ করে দেব না। মন ও বাসনা একান্তই মানুষের ব্যক্তিগত বিষয়। আমরা কেবল সমাজব্যবস্থার টেলিস্কোপে চোখ রেখে ‘তৃতীয়’ ব্যক্তি কেন আসেন, এলে কীভাবে সামাল দেবেন, এসব পরামর্শই দেব একেবারে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। যে দৃষ্টিতে সামাজিক না হলেই তাকে ‘অসামাজিক’, সমাজের বেঁধে দেওয়া ‘বৈধতা’-র গণ্ডি পেরলেই তাকে ‘অবৈধ’ বলে দেগে দেওয়া নেই। বরং প্রেমের সম্পর্কে কোন দিকগুলো নিয়ে একটু সচেতন হলে সম্পর্কটি টিকিয়ে রাখা যাবে, সুন্দর রাখা যাবে আজীবন এবং অন্য কারও কাছে যাওয়ার মন তৈরি হবে না, তা নিয়েই রইল সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক পরামর্শ।
মন না হরমোন
মনকে যতই নিজ নিকেতনে চলতে বলা হোক, মন কিছু এমন কাজ করবেই, যাতে পথ যাবে ঘেঁটে। কিছুই পূর্বপরিকল্পনা মতো হবে না। তবে সেখানেও অভ্যাস বড় বালাই! আজ যা আনন্দের, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে উত্তেজনা প্রশমিত হতে হতে একদিন তা অভ্যাসে পরিণত হয়। তখন নতুন কিছু দেখলে মরে যাওয়া উত্তেজনা ফের চলকে ওঠে। এর নেপথ্যে মনের চেয়েও বেশি হাত হরমোনের। একটি বিখ্যাত গানের লাইন, ‘ভালোবাসা মানে পিটুইটারির খেলা।’ মনের অনুগামীরা এই লাইনের বিরোধিতা করলেও কথাটা একেবারে ফেলে দেওয়ার নয়। বিশেষ করে আধুনিক এই যান্ত্রিক সময়ে মনের কথা শোনার সময় না থাকলেও হরমোনের কথা এখনও না শুনে নিস্তার নেই। নতুন করে কোনও উত্তেজনার সম্মুখীন হলে বা স্টেডি সম্পর্কে যে মানসিক চাহিদা পূরণ হয় না, তা অন্য কারও মধ্যে দেখলে অনেক সময় পুরনো উত্তেজনা ফিরে আসে, শরীর তখন গুড হরমোন অক্সিটোসিন, সেরোটোনিন ও ডোপামিন ক্ষরণ করে। এই অক্সিটোসিনের আর এক নাম ‘লাভ হরমোন’। এটি মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাসে তৈরি হয়ে পিটুইটারি গ্রন্থির পিছনের অংশে জমা হয়ে থাকে। পরিস্থিতি ও প্রয়োজন বুঝে সেখান থেকে ক্ষরিত হয়। কারও প্রতি মানসিক ও শারীরিকভাবে আকৃষ্ট হলে মস্তিষ্ক ডোপামিন আর সেরোটোনিনের পাশাপাশি অক্সিটোসিনকেও নিঃসৃত করে দেয়। ফলে প্রেমানুভূতি আসে। এবার যে মানুষ এই প্রেমানুভূতিকে নিয়ন্ত্রণে এনে ভেসে যাবেন না, তিনি ওই প্রেমকে ‘ভালো লাগা’-তে আটকে রাখতে পারবেন। নিয়ন্ত্রণ কার থাকবে, কার থাকবে না, তা নির্ভর করে চরিত্রের বিশেষ কিছু ফ্যাক্টরের উপর। যা পারিবারিক প্রভাবে গড়ে ওঠে শৈশব থেকেই। ব্যক্তির মানসিক জোর, আদর্শ, ভাবনা, মায়াবোধ (করুণা নয়), দায়িত্ব-কর্তব্যজ্ঞান ও প্রথমজনের প্রতি অনিঃশেষ ভালোবাসার উপর। দেখা গিয়েছে, যেসব ব্যক্তি চারিত্রিকভাবে দৃঢ় নয় বা সহজ-সরল সম্পর্ক ভেঙে যাওয়াকে আদর্শবিরোধী বলে মনে করেন না, তাদের ক্ষেত্রে সম্পর্ক ভেঙে অন্য সম্পর্কে যাওয়ার প্রবণতা বেশি। নানা সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, প্রবল চাহিদা, উচ্চাকাঙ্ক্ষা, ভবিষ্যৎচিন্তা কম করে মুহূর্তকে উপভোগ করার প্রবণতা এসব যাঁদের মধ্যে বেশি তাঁরাই সম্পর্ক নিয়ে একটু কম সচেতন থাকেন। এঁদের অনেকের কাছেই, সাময়িক ভালো লাগা থেকে একটু বাড়াবাড়ি করে ফেলাও অন্যায় নয়, যদি স্টেডি সম্পর্কটিতে তার ছাপ না পড়ে। কেউ কেউ আবার আর একটু দুঃসাহসী। নতুন ভালো লাগার জেরে পুরনো কিছু ভেঙে গেলেও তাঁদের সমস্যা হয় না।
চাহিদা বদলায়: টিনএজে বা কলেজে ঢুকে প্রেম হয়েছে, এদিকে বয়স যত বেড়েছে, দুটো মানুষের আদর্শ, রুচি বদলেছে, জীবনদর্শনই আলাদা হয়ে গিয়েছে, তখন দেখা যায় জোর করে সম্পর্কটিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে তারা। দু’জনের নতুন তৈরি হওয়া চিন্তাভাবনা, বোধ এসব আর না মিললে সেখানে একটা ফাঁক তৈরি হয়। সেই ফাঁক দিয়েই ঢুকে পড়েন তৃতীয় কেউ। শুধু মানসিক চাহিদাই নয়, জৈবিক ক্ষেত্রেও চাহিদা বদলায় মানুষের। সেখানেও তৃতীয় ব্যক্তির প্রবেশ আরও ত্বরাণ্বিত হয়। অনেকের ক্ষেত্রে অবশ্য ঘন ঘন সঙ্গী বদল একটি মানসিক সমস্যা। তাঁদের অবশ্যই প্রেমজ কোনও সম্পর্কে প্রবেশের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
অতীতের টান: প্রথম প্রেম কোনও কারণে ভেঙেছে। তবে সেই প্রেমিক বা প্রেমিকাকে আজও ভুলতে পারেননি। জীবন এগিয়েছে সময়ের তোড়ে। নিজেও হয়তো বাঁধা পড়েছেন নতুন সম্পর্কে। কিন্তু পুরনো সম্পর্কের জন্য মনে এখনও মায়া পড়ে আছে। সেক্ষেত্রে পুরনো জনের সঙ্গে যোগাযোগে থাকলে সেই মায়ার পরত বাড়তে থাকে। সেক্ষেত্রে পুরনো সম্পর্কের ব্যক্তিও হয়ে উঠতে পারেন তৃতীয়জন! তবে অনেকে সিদ্ধান্ত না নিতে পারার দ্বন্দ্বে ভোগেন। সেক্ষেত্রে মায়া নয়, তৃতীয়জনকে ডেকে আনে সিদ্ধান্ত নিতে পারার অক্ষমতা।
ভরসায় গোলমাল ও সন্দেহ: যে সঙ্গীর সঙ্গে থাকবেন বলে মনস্থ করেছেন, তাঁর প্রতি আস্থা ও ভরসা কম থাকলে সঙ্গী বদলের ঝোঁক বাড়ে। এটিও সম্পর্কে তৃতীয়জনকে ডেকে আনার অন্যতম কারণ। সম্মান ও বিশ্বাসকে পাথেয় করে সম্পর্ক এগলে সমস্যা অনেক কম হয়।
সম্পর্ককে ‘টেকেন ফর গ্রান্টেড’ ভেবে নেওয়া: সম্পর্ক সময়ের হাত ধরে এগিয়ে চলে। সম্পর্কের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা জরুরি। সারাদিন কর্মব্যস্ততার পর কিছুটা সময় ফোনের বদলে কেউ যদি রোজই ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েন চটজলদি, তাহলে অন্যের মনে জমতেই পারে অভিমানের মেঘ। সময় দেওয়া যে কোনও সম্পর্কে খুব জরুরি। কিন্তু অনেকেই সম্পর্ককে ‘গ্রান্টেড’ ধরে নেন। ভাবখানা এমন, যা-ই করি, মানুষটি আমাকে ছেড়ে কোথাও যাবেন না বা যাওয়ার জায়গাই বা কোথায়! এতে যে ফাঁক তৈরি হয়, তাতে তৃতীয় ব্যক্তির ঢুকে পড়া খুব অস্বাভাবিক নয়। এই মেলামেশা বা ‘নিছক বন্ধুত্ব’ থেকে প্রেমের পথে বাঁক নিতেই পারে।
অতিরিক্ত প্রত্যাশা: যে কোনও সম্পর্কের ক্ষেত্রেই এই বিষয়টি খুব বড় হয়ে দাঁড়ায়। সম্পর্কে প্রত্যাশা থাকবেই। কিন্তু এমন প্রত্যাশা যেন থাকে, যা পূরণ করা সম্ভব। যদি মনে হয়, সঙ্গী আকাশের চাঁদ নয়, ছাদের ডুমলাইটটুকু দিতে পারবেন, তাহলে সেটুকুই চান! এতে সম্পর্ক মজবুত হয়। নিজের প্রত্যাশা অতিরিক্ত থাকলে তাকেও নিয়ন্ত্রণ করতে শিখতে হবে। নচেত এই প্রত্যাশার চাপে সম্পর্ক নষ্ট হতে বাধ্য। একটা সময় সঙ্গী আপনার প্রত্যাশা পূরণের চেষ্টাও করবেন, কিন্তু সম্পর্ক একটু পুরনো হলে সেই ইচ্ছেতে ভাটা আসবে। তার তখন মনে হবে এই প্রত্যাশার চাপ তার কছে বাড়তি বোঝা। সেই মনোকষ্ট থেকেও তৃতীয় কেউ আসতেই পারেন প্রেমে।
সমালোচনা: একজনকে পছন্দ করলেন, প্রেমও জন্ম নিল। এবার এল আপনার মনের মতো তাঁকে গড়ে নেওয়ার পাঠ। এখানেই যাবতীয় গণ্ডগোল। মতে না মিললেই, পান থেকে চুন খসলেই ঝগড়া, তাঁকে বদলে ফেলার চেষ্টা, নিজের মতে চালানোর প্রয়াস, এমন হলে তৃতীয় ব্যক্তির প্রতি আকৃষ্ট হতে পারে সঙ্গী।
এ তো গেল কেবল এক প্রেম থেকে অন্য প্রেমে সরে যাওয়ার কথা। কিন্তু কোনও নতুন প্রেমে না পড়েও পুরনো প্রেমে হানা দিতে পারে অন্যের ছায়া। যেমন তিনি হতে পারেন প্রেমিক বা প্রেমিকার বাবা-মা, কোনও আত্মীয়, পরিচিত মানুষ বা বন্ধুও। এসব ক্ষেত্রে কী করবেন?
তিন সন্ন্যাসী, নষ্ট গাজন
• সম্পর্কের সমস্যা নিজেরা মেটান। অনেকেই আছেন, যাঁরা ব্যক্তিগত সমস্যা বা অশান্তি হলেই বাড়ির লোকজন, বন্ধু, প্রতিবেশী, হিতাকাঙ্ক্ষীদের সাহায্য চান। ছুতোয়নাতায় সব সমস্যায় বাইরের লোকজনকে টেনে আনলে সমস্যা বাড়বে। দূরত্বও বাড়বে। বরং এখানে তৃতীয় ব্যক্তি হিসেবে সেইসব মানুষদের নাক গলানো, পরামর্শ, উপদেশ আপনার সঙ্গীর পছন্দ নাও হতে পারে। শুধু তা-ই নয়, দিনের পর দিন এমন হলে দেখা যায় একটা সময় সেই মানুষগুলিই আপনাদের সম্পর্ককে নিয়ন্ত্রণ করছে। কাজেই নিজেদের এমন কোনও সমস্যা যদি থাকে যা একান্তই নিজেরা মেটাতে পারছেন না, তখনই একমাত্র কারও সাহায্য নিন। চেষ্টা করুন পুরোটাই নিজেরা মিটিয়ে নিতে। যদি দেখেন, কথায় কথায় অন্যের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন হচ্ছে, তাহলে বুঝতে হবে সম্পর্কে এখনও অনেক ম্যাচিওরিটি প্রয়োজন, সুতরাং এই সম্পর্কে সাবধান ও সচেতন হয়ে এগন।
• অনেকে মনে করেন বা ভাবতে ভালোবাসেন সঙ্গী ‘ইমম্যাচিওর’। সম্পর্কে যিনি অধিকাংশ সময়ে ডমিনেট করেন বা করতে ভালোবাসেন, তাঁর মনেই এই ভাবনা বেশি আসে। সম্পর্কে একজনকে ইমম্যাচিওর ধরে নিয়ে তাঁকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাওয়া বা তাঁকে নিয়ে ঘনিষ্ঠমহলে নানা আলোচনা— এসবও অনেক সময় জটিলতা তৈরি করে। সঙ্গীর প্রতি আপনার আস্থাহীনতা ও তাঁকে ইমম্যাচিওর ভাবার হাত ধরেই তৃতীয় ব্যক্তি আসে। প্রেমের যাবতীয় তথ্য যাঁদের সঙ্গে ভাগ করেন, তাঁরাই এই সুযোগ নিয়ে যেচে নাক গলাতে পারেন নানা বিষয়ে। তিনি সহকর্মী হতে পারেন, ছেলেবেলার বন্ধু হতে পারেন বা ভাই-বোন আত্মীয়ও হতে পারেন। এমন হলে আপনার সঙ্গী তৃতীয় ব্যক্তির অনুপ্রবেশ মেনে নাও নিতে পারেন। অনেক সময় দেখা যায়, সঙ্গী মেনেও নেন কিন্তু সম্পর্কটা তলে তলে ফোঁপড়া হয়ে টানহীন অভ্যাসে পরিণত হয়।
• ছেলেমেয়ে সম্পর্কে জড়ালে কিছু অভিভাবক সব সমস্যার আঁচ থেকে তাদের দূরে রাখতে প্রথম থেকেই সম্পর্কের রাশ নিজেদের হাতে রাখতে চান। কেউ কেউ আবার প্রথম থেকেই নিজেদের নিয়মে ছেলেমেয়ের সম্পর্ককে চালনা করতে চান। সব বিষয়ে বাবা-মায়ের ঢুকে পড়া বড় রকমের সমস্যা তৈরি করে। সেক্ষেত্রে ‘তৃতীয়’ মুখ হয়ে ওঠেন খোদ অভিভাবকরা।
দুইয়ে দুইয়ে এক
সম্পর্কে কী কী সমস্যা আসতে পারে ও তৃতীয় ব্যক্তি কেন আসে এসব নিয়ে কিছুটা ধারণা কমবেশি সকলেরই আছে। তার পরেও কিছু প্রচলিত সমস্যা তুলে ধরা হল। এবার সেই সমস্যার রেশ ধরে সমাধানের পথে হাঁটব আমরা। ধরা যাক, সম্পর্কে তৃতীয় ব্যক্তি এসেছেন। সেই ‘কাঁটা’ সরিয়ে চলার পথ মসৃণ করবেন কীভাবে? দু’জনে মিলে এক হয়ে যাওয়ার যে স্বপ্ন একসঙ্গে দেখেছিলেন, তাকে ফের উজ্জীবিত করবেন কীভাবে? রইল তার টিপস!
কথা হোক: আবিশ্বে এমন কোনও সমস্যা নেই, যা নিয়ে কথা বলার পরিসর থাকবে না। দীর্ঘদিন ধরে সহ্য করে হঠাৎ কথা বলতে চাইলে পরিস্থিতি ততদিনে জটিল হয়ে যেতে পারে। তৃতীয় কারও অনুপ্রবেশ ঘটেছে বলে মনে হলে বা সেদিকে সঙ্গীর ঝোঁক তৈরি হচ্ছে বলে মনে হলে তাঁর সঙ্গে সরাসরি কথা বলুন। আবার কথায় কথায় সন্দেহ করে ঘন ঘন এসব নিয়ে কথা বলতে যাবেন না। তাতে সন্দেহের আঁচে সম্পর্ক নষ্ট হবে।
প্রয়োজনে প্রথমবার ক্ষমা করুন: প্রেমজ সম্পর্কে থেকে অন্য কাউকে ভালোলোগা বা তার প্রতি মানসিক ও শারীরিক আকর্ষণ বোধ করা কোনও নতুন ঘটনা নয়। মানুষ বস্তুত ‘অ্যানিম্যাল’। তার বোধ ও বুদ্ধি, মেধা ও মনন তাকে অন্যদের চেয়ে পরিশীলিত করে ঠিকই কিন্তু কিছু আদিম বৈশিষ্ট্য সে আজও বহন করে। তাই সঙ্গীর একবারের কোনও ভুলকে প্রয়োজন বুঝলে ও তাঁকে অনুতপ্ত দেখলে ক্ষমা করে দিন। ক্ষমা করতে না পারলে বাকি জীবনটা সুস্থভাবে বাঁচা কঠিন হয়ে যাবে। অতীত ভুলে বর্তমানকে সুন্দর করে তোলায় জোর দিন।
নিজেকে চিনুন: নিজে কী চান? এটাই আমরা অধিকাংশ মানুষ জানি না। নিজেকে বোঝার চেষ্টা করুন। যদি নিজেই অন্য ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্কে যান, তাহলে নিজেকে স্পষ্ট করে জিজ্ঞেস করুন, আপনি কী চান? শুধুই অপরাধবোধে ভুগে, লোকে কী ভাববে ভেবে আগের সম্পর্কে ফিরতে চান, নাকি সত্যিই মন থেকেই বাঁধা রয়েছেন আগেরজনের কাছে। সঙ্গী অন্য কারও প্রতি আকৃষ্ট হলেও একই নিয়মে নিজেকে প্রশ্ন করুন। সব জেনেও তাঁকে আজীবনের জন্য গ্রহণ করতে পারবেন? তখনই সিদ্ধান্ত নিতে না পারলে সময় চেয়ে নিন।
হেল্পলাইন: জীবনে এমন পরিস্থিতি এলে অনেক সময় বিশ্বাসযোগ্য কারও সাহায্য প্রয়োজন হয়। এমন কেউ যিনি ব্যক্তিগতভাবে আপনার শুভার্থী কিন্তু সব বিষয়ে মাথা গলানোর মতো মানুষ নন, তাঁকে নিশ্চিন্তে সবটা জানান। পরামর্শ নিন।
বেরিয়ে আসুন: কোনওভাবেই বিষয়টির কোনও নিষ্পত্তি হচ্ছে না বুঝলে বা সঙ্গীর সঙ্গে কথা বলেও কোনও রফাসূত্র না পেলে জোর করে সম্পর্ককে টেনে নিয়ে যাবেন না। যদি মনে হয়, আপনার প্রতি সঙ্গীর সম্মান নেই, মায়া ও প্রেম তলানিতে তাহলে এবার সম্পর্কটি তার ‘এক্সপায়ারি ডেট’ ছুঁয়েছে। যত দ্রুত তা মেনে নিয়ে বেরিয়ে আসতে পারবেন, ততই মঙ্গল।
ব্যস্ততা আসুক: সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসার পর অনেকেই নিজেকে সামলে রাখতে পারেন না। ভুল করেও এই সময় নতুন সম্পর্কে জড়াবেন না। আগের সম্পর্কের রেশ ও আগের সঙ্গীর প্রতি ক্ষোভ অভিমান এ সময় খুব টাটকা থাকে। তাই তাঁকে দেখিয়ে দিতে বা তাঁর ছেড়ে যাওয়া আমার উপর কিছুই প্রভাব ফেলল না, এই প্রমাণ দিতে গিয়ে নিজের জীবনের বড় ভুল না করাই শ্রেয়। এই সময় নিজে একটু ধৈর্য ধরুন। সব প্রেমের শেষই একটি নতুন প্রেমকে আসার জায়গা করে দেয়। তাই ভেঙে না পড়ে নিজেকে ব্যস্ত রাখুন নানা কাজে। পেশাগত ব্যস্ততা, শখ, সৃজনশীল কাজ, পড়াশোনা এসব নিয়ে ব্যস্ত হয়ে যান। কষ্ট হওয়া খুব স্বাভাবিক। তাই জোর করে সেই কষ্ট ভুলতে যাবেন না। সময়ের উপর ছেড়ে দিন সব। মনের ও সময়ের নিয়মে তাতে পলি পড়বে। তারপর নতুন সম্পর্ক নিয়ে ভাবুন। এই সময় আপনার প্রতি গোপন ভালবাসা যাঁর ছিল তিনিও বন্ধু হয়ে মানসিক যত্নের ভার নিতে পারেন। তাতে সমস্যা নেই কিন্তু মানসিকভাবে আহত অবস্থায় কাউকেই প্রাণপণ আঁকড়ে ধরবেন না। বরং আপাতত বন্ধুত্ব রাখুন। মনের ক্ষত কমলে ঠান্ডা মাথায় ভেবে সিদ্ধান্ত নিন।
কাউন্সেলিং: নিজে নিজে সব ভাঙন সামলে ফেলতে হবে এমন কোনও কথা নেই। দীর্ঘ প্রেমের সম্পর্ক তৃতীয় কারও উপস্থিতিতে ভেঙে গেলে কষ্ট হয়। সেটাই মনুষ্যত্বের লক্ষণ। ঠকে যাওয়ার কষ্টটুকু আজীবন চিনচিনে ব্যথা হয়েও থেকে যেতে পারে, এটাই বাস্তব। তাই কষ্ট কেন কমছে না ভেবে ব্যস্ত হবেন না। যদি কেঁদে হালকা লাগে, তাহলে সাময়িক কিছুটা কাঁদুন। কিন্তু তারপর ফের নিজের ব্যস্ততায় ফিরুন। মোট কথা, মনকে এটুকু বোঝান যে আপনার মন ও জীবনের দায় একা আপনার। সেটাকে ভাঙলে আপনিই সেটা আবার জুড়ে নিতে পারবেন। নিজের মা বাবা, বন্ধু, পরিজন, ভাইবোন সর্বোপরি নিজেকে ভালোবাসুন। জীবনকে দাম দিন। এসব জেনেও যদি নিজেকে না সামলাতে পারেন, মন আত্মহত্যাপ্রবণ বা মাদক ও অ্যালকোহল কেন্দ্রিক হয়ে যায়, তাহলে দ্রুত মনোবিদের সাহায্য নিন। এতে কোনও কুণ্ঠা নেই। শরীরের মতোই মনের অসুখেও শুশ্রূষা প্রয়োজন।
আপনিই যখন ‘তৃতীয়’!
জীবনের কোন বাঁকে নিজের অবস্থান কোথায় বদলাবে, অনেকেই তার রাশ ধরে রাখতে পারেন না। আমাদের পাঠকের মধ্যে কেউ কেউ হয়তো নিজেরাই নিজেদের অজান্তে বা জ্ঞাতসারে অন্য এক সম্পর্কের মাঝে তৃতীয় ব্যক্তি হয়ে পড়ছেন। সেক্ষেত্রে কিছু বিষয় মাথায় রাখা জরুরি।
• যে কোনও সম্পর্কে তৃতীয় ব্যক্তি হয়ে ঢুকে পড়লে তাতে নানা জটিলতা থাকে। আত্মসম্মানে ঘা পড়তে পারে, গ্লানিবোধ আসতে পারে। সঙ্গীর প্রায়োরিটির দিক থেকেও খামতি আসতে পারে। সময়ে সময়ে নিজেকে বঞ্চিত মনে হতে পারে। অবশ্যই সম্পর্ক পরিণতি না পাওয়ার হলে নিরাপত্তাহীনতাও থাকবে। এতকিছু জটিলতা নিজের জীবনে ডেকে এনে তৃতীয় ব্যক্তি হয়ে সম্পর্কে থাকবেন কি না সে সিদ্ধান্ত আপনার।
• মা-বাবা বা আত্মীয় পরিজন হয়ে কারও সম্পর্কে অনর্গল অনুপ্রবেশ করলে সাবধান! যাদের এখন নিয়ন্ত্রণ করতে সফল হচ্ছেন, একটা সময় তারা আঙুল তুলবে আপনার দিকেই। নিজেদের সব ভুল বোঝার জন্যও দায়ী করতে পারে। কাজেই অন্যের জীবন নিয়ন্ত্রণ করার স্বভাব থাকলে আজই সতর্ক হোন।
• আপনি তৃতীয় ব্যক্তি হয়ে প্ররোচনা দিয়ে একটি সম্পর্ক ভেঙে নিজস্ব পরিসর হয়তো সাজাতে চাইছেন। অথবা আপনার প্ররোচনা ছাড়াই কেউ তাঁর দীর্ঘ সম্পর্ক ছেড়ে আপনাকে নিয়ে জুটি বাঁধতে চাইছেন। দুই ক্ষেত্রেই সম্পর্ক নিয়ে পুনরায় ভাবুন।
• সঙ্গী যদি অন্য কারওকে পছন্দ করে আপনাকেই ‘তৃতীয়’ ব্যক্তি হিসেবে ট্রিট করেন তাহলে প্রথম থেকেই কথা বলুন সঙ্গীর সঙ্গে। সম্মান ও গুরুত্ব হারাচ্ছেন বুঝলে সরে আসবেন কি না ভেবে দেখুন। জোর করে সম্পর্ক এগিয়ে নিয়ে যাওয়া গেলেও ভালোবাসা কিন্তু থাকে না! তাই সরে এসেও আইনি পদক্ষেপ করতে পারেন।