


স্বামী বিবেকানন্দ ধর্মকে দেশের প্রাণশক্তি এবং জাতির একমাত্র আগ্রহের বিষয় বলে অভিহিত করেছিলেন। বিশ্বধর্মে ভারতের অবদান সম্পর্কে তিনি ছিলেন উচ্ছ্বসিত। তাঁর মতে, ভারত হল ধর্মের দেশ। প্রতিটি জাতির জীবনে একটি মূল প্রবাহ থাকে। ভারতের ক্ষেত্রে তা হল ধর্ম। তাঁর পরামর্শ ছিল, ধর্মকে শক্তিশালী করে তোলা হলে তার দু-পাশে জলধারাও প্রবাহিত হবে যথানিয়মে। তাঁর উপলব্ধি ছিল এই: প্রতিটি জাতির কাজের নিজস্ব পদ্ধতি থাকে। কোনো জাতি রাজনীতির মাধ্যমে কাজ করে, কেউ সমাজ সংস্কারের মাধ্যমে, আবার অন্যকোনো পথে কেউ। ভারতবাসীর জন্য ধর্মই হল একমাত্র ক্ষেত্র যার মধ্য দিয়ে আমরা অগ্রসর হতে পারি। প্রতিটি জাতির একটি মূল উপজীব্য বিষয় থাকে—অন্য সবকিছুই গৌণ। ভারতের মূল উপজীব্য হল ধর্ম। বহু শতাব্দী যাবৎ ভারতের পরিবেশ ধর্মীয় আদর্শে পরিপূর্ণ হয়ে আছে। এই সম্পদ মিশে গিয়েছে আমাদের রক্তে এবং সত্তার সঙ্গে একাকার হয়ে প্রাণশক্তিতে পরিণত হয়েছে। হাজার হাজার বছর ধরে যে বিশাল নদী নিজের জন্য একটি প্রবাহপথ তৈরি করে নিয়েছে, সেই পথকে ভরাট না করে কিংবা তার প্রতিক্রিয়ায় সমপরিমাণ শক্তিকে জাগ্রত না করে—আপনি কি এমন ধর্মকে পরিত্যাগ করতে পারেন? ভারতে ধর্মই হল জাতীয় হৃদয়ের কেন্দ্রবিন্দু। রাজনীতি, ক্ষমতা এবং এমনকি বুদ্ধিবৃত্তিও এখানে গৌণ। ধর্মই এই পুণ্যভূমির ভিত্তি, মেরুদণ্ড ও প্রাণকেন্দ্র। স্বামী বিবেকান্দ এই সিদ্ধান্তেও উপনীত হয়েছিলেন যে, পৃথিবীতে একমাত্র ভারতবর্ষই ধর্মকে যথার্থভাবে বোঝে।
ভারতের বেশিরভাগ মানুষ সনাতন ধর্মাবলম্বী। স্বামী বিবেকানন্দ ছিলেন গর্বিত হিন্দু। বহুত্ববাদের সমর্থক হয়েও হিন্দুধর্মের মহত্ত্ব প্রচারে তাঁর কুণ্ঠা নয় বরং শ্লাঘা অনুভব ছিল। দেশের বর্তমান শাসক দল বিজেপির উত্থান হিন্দুধর্মকে আশ্রয় করে। হিন্দুধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব তুলে ধরতে তারা স্বামী বিবেকানন্দের ছবি এবং বাণীকে সামনে রাখে। তবে সেখানেই থেমে না থেকে তারা মন্দির রাজনীতিতেও হাত পাকিয়েছে গত কয়েকদশক যাবৎ। অযোধ্যার বিতর্কিত জমিতে প্রতিষ্ঠিত প্রাচীন বাবরি মসজিদ ধ্বংস করে সেই জায়গায় মোদি জমানায় নির্মিত হয়েছে রামলালার মন্দির। সারা দেশের মধ্যে একটি দর্শনীয় স্থানে পরিণত হয়েছে এই সুবিশাল সৌধ। এই রামমন্দির প্রতিষ্ঠার জন্য লাগাতার বিবাদ সংঘাতের পথে গিয়েছে বিজেপিসহ সমগ্র গেরুয়া শিবির। সুপ্রিম কোর্টের আদেশ পাথেয় করে প্রায় ১৯০০ কোটি টাকায় অযোধ্যায় নির্মিত হয়েছে শ্রীরাম জন্মভূমি তীর্থক্ষেত্র। ভক্তদের দানের অর্থে নির্মিত মন্দিরটির উদ্বোধন হয় ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে। তারপর থেকে হাজার হাজার পুণ্যার্থী ওই মন্দির ও বিগ্রহ দর্শন করেছেন এবং দু-হাতে নিবেদন করেছেন নানাবিধ প্রণামি। ভারতবাসী ভগবানকে শুধু পুজো ও ভক্তি করে না, ভয়ও করে। তাদের ভয় এটাই যে—ভগবানের পুজোয় যেন কোনোরকম ত্রুটি না-হয়, অনাচার তো নয়ই, তাহলে পাপ হবে, ভুগতে হবে পাপের ফল।
কিন্তু রামমন্দিরকে ঘিরে সামনে এল উলটো ছবি। চোরের হাত পড়েছে অযোধ্যার রামমন্দিরে! সেখানে দেদার চুরি হয়েছে প্রণামির টাকা। লক্ষ লক্ষ টাকা চুরির এই ঘটনার তদন্ত শুরু হয়েছে এসআইটি গঠন করে। তদন্ত এখনো বিশ বাঁও জলে। তারই মধ্যে হইচই বেধে গিয়েছে অন্যত্র ধর্মস্থানে চুরির ঘটনা নিয়ে। এবার কেন্দ্র বদ্রীনাথ। উত্তরাখণ্ডের প্রাচীন বদ্রীনাথ মন্দিরেও প্রণামি চুরি হয়েছে অযোধ্যার কায়দায়। এমনই বিস্ফোরক অভিযোগ নিয়ে তোলপাড় পাশাপাশি দুই রাজ্য। আগামী ফেব্রুয়ারি-মার্চে এই দুই ডবল ইঞ্জিন রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন। অর্থাৎ ভোটের ঢাকে কাঠি পড়ার মাত্র মাসকয়েক আগের এই কেলেঙ্কারি নিয়ে স্বভাবতই তোলপাড় জাতীয় রাজনীতি। দ্বিতীয় অভিযোগ এতটাই গুরুতর যে, সেখানেও তদন্ত কমিটি গঠন করতে হয়েছে। বদ্রীনাথ-কেদারনাথ টেম্পল কমিটির ক্ষুব্ধ চেয়ারম্যান হেমন্ত দ্বিবেদীর দাবি, কোনো দোষী ছাড় পাবে না। প্রভাবশালী বিজেপি নেতা দ্বিবেদীর সাফ কথা, চারধামের প্রণামির টাকা যখন গোনা হয়, তখন সাধারণ ভক্তরাও উপস্থিত থাকতে পারেন। এতখানি স্বচ্ছ নীতির মধ্যেও অর্থ নয়ছয়ের অভিযোগটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। চারধামের প্রণামি নিয়েই তদন্ত হবে। কিন্তু এইটুকুই যথেষ্ট নয়। আসল দোষীদের দ্রুত ধরে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা না-হলে ধর্মস্থানে পাপাচার বন্ধ হবে না। একজনও দোষী রেহাই পেয়ে গেলে উৎসাহিত বোধ করবে দুর্বৃত্তরাই। বিজেপি যেসব ধর্মস্থানের নামে ভোট চায়, ভোটে জেতে, সরকার তৈরি করে যথেচ্ছ ক্ষমতা ভোগ করে, সেখানেই এই পাপাচার একদম মানা যায় না। এই ঘটনায় এটাই প্রমাণিত হয় যে, বিজেপির কাছে ক্ষমতার রাজনীতিই মুখ্য, স্বামী বিবেকানন্দ কী বলে গিয়েছেন, ভেবেছেন কিংবা রাষ্ট্রীয় ধর্মভাব প্রভৃতি উপলক্ষ্য মাত্র। তাদের নেতৃত্বের এই ক্লীবতায় ভারতের ধর্মভাব এবং হিন্দুত্বের যে ক্ষতি হচ্ছে তা অপূরণীয়।