


আবলুশ কালো রং। পাথরে খোদাই শরীর। এক কোপে মানুষের মাথা ধড় থেকে আলাদা করে দিত। বল্লম দিয়ে একা রুখে দিত বাঘ। সে দুর্দমনীয় মনোহর ডাকাতের চুল এখন সাদা। মুখে জ্বরব্যাধির ছাপ। দেহ শীর্ণ। বিছানায় শুয়ে দত্তক পুত্র হারাধনকে বললেন, ‘মেঝের ওইখানটা খোঁড় তো বাবা।’ মাটি খোঁড়া হল। বেরল তিন ঘড়া মোহর-গয়না-টাকা। হারাধন অজ্ঞান হয়ে প্রায় পড়ে যায়। মনোহর বললেন, ‘এ টাকায় গরীব-দুখি-কাঙালের সেবা কর। এখানে জলকষ্টে মরে মানুষ। দিঘি-পুকুর খুঁড়ে জলের ব্যবস্থা কর।’ মনোহর ডাকাত মারা গেলেন। গড়িয়াহাটের একটু দূরে, এখন যেখানে পূর্ণ দাস রোড, কয়েকশো বছর আগে সেখানে ছিল ঘন জঙ্গল। সেখানে কুটির ছিল মনোহরের।
কালীর উপাসক ছিলেন মনোহর বাগদি। যে মন্দিরে তিনি নরবলি দিতেন, তার স্মৃতি টিকে রয়েছে কালক্রমে। সেখানে এখনও রয়েছেন ডাকাত কালী। এখনও পুজো হয়। মন্দির তৈরি হয়েছে নতুন করে। ১৮৯১ সাল নাগাদ তা নির্মাণ করেছিলেন সাধক কামাখ্যাচরণ মুখোপাধ্যায়। কালীর মূর্তি কষ্টিপাথর বা স্পর্শপাথরে তৈরি। আকারে ক্ষুদ্র। সে কারণে তাঁর আদরের নাম ‘ছানা কালী’।
যোগেন্দ্রনাথ গুপ্ত ‘বাংলার ডাকাত’ নামক তাঁর বিখ্যাত বইটিতে লিখে গিয়েছেন, ‘মনোহর ডাকাত মরিল, কিন্তু তাহার নাম হইয়া রহিয়াছে অমর। হারাধন মনোহরের প্রত্যেকটি কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করিয়াছিল। আজও দক্ষিণ কলকাতার এই অঞ্চল ঘুরিয়া ফিরিয়া দেখিলে দেখিতে পাওয়া যায়, তাঁহার স্মৃতিরক্ষার জন্য হারধন যে সকল দীঘি ও পুকুর খনন করিয়াছিল, সেই সকলের অস্তিত্ব পাড়ার চারদিক ঘিরিয়া অসংস্কৃত অবস্থায় এখনও আছে।’
এখন যদিও নেই। বড় ফ্ল্যাটবাড়ি, দোকান, শোরুমের দৌলতে পূর্ণ দাস রোড অভিজাত শহরের আধুনিকতম রাস্তা। তবে শুধু ডাকাত কালী দেখতে মন্দিরে ঢুকলে সে সময়ের কলকাতার কথা টের পাওয়া যায়। ঠিকমতো ঘ্রাণ নিতে জানলে মনোহরের সময়কালের সে গন্ধ নাকেও আসে।
এতক্ষণে নিশ্চয় হারাধন কেন ‘দত্তক পুত্র’, সে কথাটি জানার ইচ্ছে জেগেছে। সে বিষয়টিও রোমহর্ষক। ডাকাতি করে ফিরছেন মনোহররা। মশালের আলোয় তৎকালীন পূর্ণ দাস রোডের জঙ্গল জোনাকির মতো ঝিকমিক করছে। ঠিক সেই সময় কালীঘাট থেকে তীর্থ করে ফিরছেন এক বৃদ্ধ। সঙ্গে একজন স্ত্রীলোক ও একটি শিশু। ঘন রাতে জঙ্গলে পথ হারিয়েছেন তাঁরা। চোখে পড়ল মশালের আলো। তা লক্ষ্য করে হাঁটতে লাগলেন। মাঝে সরু খাল। সে খালে জল খাচ্ছে বিশাল বড় বাঘ। বৃদ্ধের উপর ঝাঁপাল বাঘ। মহিলা ও শিশুটি খালে পড়ে ডুবে যাচ্ছে। তখনই তাঁদের দেখতে পেলেন মনোহর। উদ্ধার করলেন। মহিলা মারা গেলেন। বৃদ্ধ আগেই মৃত। বেঁচে গেল শিশুটি। কালক্রমে তাঁর সঙ্গে মায়ার বাঁধনে জড়ালেন মনোহর। মনোহরের এক পিসি ছিলেন। তিনিই ডাকাতের সংসারের কর্ত্রী। যোগেন্দ্রনাথ গুপ্ত লিখছেন, ‘পিসি বলিল, কার বাছা নিয়ে শেষটায় পড়বি বিপদে, গলা টিপে মেরে ফেলে দে বাদার জঙ্গলে। মনোহর গর্জিয়া উঠিল—তুই মাইয়া মানুষ হইয়া এমন কথা বলিস। ডাকাত বটি কিন্তু এ হাতে কোনদিন মাইয়া মানুষ আর ছোট ছোট ছাইল্যা মাইয়া মারি নাই। পিসি তুই কি পুতনা রাক্ষসী। অদ্ভুত হাসি হাসিল মনোহর। পিসি চুপ করিয়া রহিল।’ছেলেটি নিজের ছেলেই হয়ে গেল। নাম হল হারাধন। মনোহর ডাকাতি ছেড়ে দিলেন। চাষবাস করাতে লাগলেন। পুত্রকে ভবানীপুরে খ্রিস্টান পাদরির কাছে পড়ালেখা করালেন। সে মানুষের মতো মানুষ হল।
যে কাজ করা উচিত ছিল ইংরেজ সরকারের, তা করালেন মনোহর। ‘মনোহর ডাকাত মরিল, কিন্তু তাহার নাম হইয়া রহিয়াছে অমর।’