


সুদীপ্ত রায়চৌধুরী, শান্তিপুর: শান্তিপুর বললেই প্রথমে কী মাথায় আসে? তাঁতের শাড়ি! স্টেশনের বাইরে পা রাখলেই (কখনো কখনো স্টেশনে ট্রেন থেকে নামতেই) ছেঁকে ধরেন স্থানীয়রা। কোন শিল্পীর তাঁতের শাড়ির কদর কেমন, কোন রাজনীতিবিদ কার থেকে শাড়ি নিয়ে যান কলকাতায়... এমন নানান তথ্য আওড়াতে থাকেন। তাঁদের এড়িয়ে টোটোতে চাপলেও প্রথম প্রশ্ন শুনতে হয়, ‘শাড়ি কিনবেন?’ অবশ্য শুধু তাঁত শিল্প নয়, নদীয়ার এই বর্ধিষ্ণু জনপদের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বৈষ্ণব সংস্কৃতির সুদীর্ঘ ইতিহাস। আর সেই কারণেই নব্যবৈষ্ণব আন্দোলনের প্রধান ব্যক্তিত্ব বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামীর নাম শুনলে এখনও স্থানীয়রা কপালে হাত ছোঁয়ান। টোটোয় উঠে তাঁর বাড়ির কথা বলতেই ঘাড় নাড়লেন টোটোচালক। বাকি তিন যাত্রীও উৎসুক চোখে তাকিয়ে। স্টেশন ছাড়িয়ে একটু এগতেই যানজটে মিনিট পাঁচেক আটকে রইল টোটো। এক সহযাত্রী বললেন, ‘এই যানজট এখানে একটা বড়ো সমস্যা।’ আর কিছু? প্রশ্ন শুনে দু’মিনিট ভাবলেন স্থানীয় বাসিন্দা মিতালি সরকার। বললেন, ‘বাকি সবকিছু ঠিক আছে। রাস্তাঘাট ভালো। বৃষ্টিতে জল জমার সমস্যা নেই। পানীয় জল সহ বাকি সব পরিষেবা ঠিকমতো পাই।’ অপর যাত্রী, সুবিমল দত্ত জানালেন, শান্তিপুরের তাঁত শিল্প হারিয়ে যেতে বসেছে। ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পকে বাঁচিয়ে তোলার জন্য একটা মাস্টার প্ল্যান দরকার। আর গঙ্গা ভাঙনের স্থায়ী সমাধানও! কথাবার্তা বলতে বলতেই টোটো পৌঁছাল বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামীর বাড়ির সামনে। সুড়কি লাল রঙা বাড়ি। পুরানো দিনের মোটা দেওয়াল। ছাদে কালো কড়িবরগা। সামনে খোলা মাঠের পরেই নাটমন্দির। সদর দরজার ডানপাশে ঝুলছে তৃণমূল প্রার্থী ব্রজকিশোর গোস্বামীর পেল্লায় ব্যানার। একটু পরেই সশরীরে হাজির হলেন তিনি। পরনে সাদা জামা ও দক্ষিণ ভারতীয় স্টাইলে ধুতি। খানিক বাদেই সূত্রাগড় চড়কতলা থেকে ষড়ভূজ বাজার হয়ে চালু প্রচার পর্ব। ভোট প্রচারের ক্ষেত্রে অভিনব কৌশল নিয়েছেন তৃণমূল প্রার্থী। র্যালি বা পথসভার ছবি পোস্ট করলেও সোশ্যাল মিডিয়ায় সচেতনভাবে এড়িয়ে যাচ্ছেন পাড়া বৈঠক পর্বটি। জানালেন, বিরোধী শিবিরের প্রার্থীরা যাতে তাঁর রণকৌশল আঁচ না করতে পারেন, সেই জন্যই এই স্ট্র্যাটেজি। স্বাস্থ্য পরিষেবা, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও গঙ্গা ভাঙন রোধ—এই তিন বিষয়কেই প্রচারের প্রধান হাতিয়ার করেছেন ব্রজকিশোর। সরাসরি বললেন, ‘শান্তিপুরের তাঁত শিল্পের গৌরব আজ অনেকটাই ম্লান। এর অন্যতম কারণ নতুন তাঁতি উঠে না আসা। তাঁত শিল্প শান্তিপুরের গর্ব, এই শিল্পকে আমাদের বাঁচাতেই হবে। জোর দেওয়া হবে বিকল্প কর্মসংস্থানেও।’
এবারের নির্বাচনে শান্তিপুরে লড়াই বেশ জটিল। তৃণমূল, কংগ্রেস, বিজেপি, বামেদের পাশাপাশি রয়েছে নির্দল প্রার্থীও। ভোট প্রচারে নিত্যনতুন চমকপ্রদ কৌশলে নজর কাড়ছেন বিজেপি প্রার্থী স্বপন দাস। প্রাক্তন শিক্ষক হিসাবে এলাকায় তাঁর ভালো পরিচিতি রয়েছে। সেই জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগাতে কখনো ভোরবেলা মাঠে দৌড়চ্ছেন শরীরচর্চা করতে, কখনো বা স্থানীয়দের সঙ্গে চা খেতে খেতে আলাপচারিতায় মাতছেন। নববর্ষের প্রথম দিন ভাগীরথীর ঘাটে পুণ্যার্থীদের তেল-শ্যাম্পু বিলি করতেও দেখা গিয়েছে তাঁকে! সেই স্বপনবাবু জানালেন, বর্তমান সরকারের আমলে তাঁত শিল্পের অবস্থা ভালো নয়। পরিকল্পনার মাধ্যমে তার উন্নয়ন করতে হবে। যদিও বিজেপি সাংসদ তাঁত শিল্পকে বাঁচাতে কী ভূমিকা নিয়েছেন? সেই প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। শান্তিপুরের ঐতিহ্যবাহী তাঁত শিল্পকে বাঁচিয়ে তোলা ও সার্বিক উন্নয়নের বার্তা নিয়ে প্রচারে নেমেছেন কংগ্রেস প্রার্থী অলোক চট্টোপাধ্যায়। আবার সকাল থেকে রাত পর্যন্ত শহরে-গ্রামাঞ্চলে ঘুরে মানুষের দরবারে নিজের বক্তব্য তুলে ধরছেন বাম প্রার্থী সৌমেন মাহাত। তাঁর বক্তব্য, নদী ভাঙন এলাকার খুব বড় সমস্যা। বস্তা দিয়ে অস্থায়ীভাবে ভাঙন রোধ হয়েছে। তা স্থায়ীভাবে করতে হবে। বাম বা কংগ্রেস প্রার্থীরা ঘাম ঝরালেও বাতাসে ভাসছে অন্য অঙ্ক। শান্তিপুর শহরের পাশাপাশি গয়েশপুর বা হরিপুর পঞ্চায়েত এলাকায় কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে নির্দল প্রার্থী অরিন্দম ভট্টাচার্যের কথা। ২০১৬ সালে কংগ্রেসের টিকিটে লড়ে ১৯,৪৮৮ ভোটে পরাজিত করেছিলেন ২৫ বছর বিধায়ক পদে থাকা (আগে কংগ্রেস) তৃণমূলের অজয় দেকে। যদিও গত বিধানসভায় কংগ্রেস ছেড়ে বিজেপিতে গিয়ে জগদ্দল আসন থেকে আর জিততে পারেননি অরিন্দম। এবারে ‘জয় শান্তিপুর’ স্লোগান তুলে পালতোলা নৌকা প্রতীকে লড়ছেন। ভোটে তিনি বড়ো ফ্যাক্টর হতে চলেছেন বলেই মত স্থানীয় রাজনৈতিক মহলের। হরিপুরের বাসিন্দা সোমনাথ দত্ত বা গয়েশপুরের তথাগত নস্কররা জানালেন, বিধায়ক থাকাকালীন শান্তিপুরে ভয়াবহ নৌকাডুবির সময় তৎকালীন বিধায়কের ভূমিকা আজও মনে আছে। এবারে পুরানো ভোটারদের অনেকেই অরিন্দমবাবুকে ভোট দেবেন।
এসআইআর কাঁটায় শান্তিপুর আসনে ৩১ হাজারের বেশি ভোটারের নাম বাদ পড়েছে। তা নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে আম জনতার মধ্যে। কার ভোটবাক্সে এই ক্ষোভের প্রভাব পড়বে, আর কারা ফায়দা তুলবে, তার উপরও অনেকটা নির্ভর করবে জেতা-হারার অঙ্ক।