


সুদীপ্ত কুণ্ডু, হাওড়া: শালিমার রেলব্রিজ থেকে নেমে ডানদিকে কলেজ রোড ধরে শিবপুর আইআইইএসটির দিকে এগলেই হাওড়া দক্ষিণের বিধায়কের অফিস। প্রতিদিন সকালে সেখানে ভিড় দেখা যায়। কেউ এসেছেন নিকাশির সমস্যা নিয়ে। কেউ অনুযোগ করছেন, এক সপ্তাহ বাড়ির সামনের ভ্যাট পরিষ্কার হয়নি। কিন্তু বিধায়কের অফিসে এসব সমস্যায় ছুটে আসা কেন? আসলে হাওড়া পুরসভার দীর্ঘদিন কোনো নির্বাচিত পুরবোর্ড নেই। তাই গত পাঁচ বছর ধরে নিজের বিধানসভা এলাকার ১০টি ওয়ার্ডের সমস্যা পুর-পরিষেবা সংক্রান্ত সমস্যা সমাধানের দায়িত্বও কার্যত নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন বিধায়ক নন্দিতা চৌধুরী।
অফিসঘরের দেওয়ালে তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছবি। উলটো দিকের দেওয়ালে বিধায়কের বাবা, প্রয়াত সাংসদ অম্বিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতিকৃতি। নন্দিতার কথায়, ‘দিদি আর বাবার আদর্শকে পাথেয় করে মানুষের সেবা করে চলেছি। পুর পরিষেবা নিয়ে এলাকায় অনেক সমস্যা আছে। তাই প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি করে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ তৈরি করেছি, যাতে সমস্যাগুলো দ্রুত নজরে আসে এবং মেটাতে পারি।’ ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ব্রজমোহন মজুমদারের জায়গায় নন্দিতাকে প্রার্থী করেছিল তৃণমূল। প্রায় ৫১ হাজার ভোটের ব্যবধানে বিজেপির রন্তিদেব সেনগুপ্তকে পরাজিত করেন তিনি। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে দক্ষিণ হাওড়া কেন্দ্র থেকে তৃণমূল প্রায় ৩০ হাজার ভোটে এগিয়ে ছিল। তবে আত্মতুষ্টির কোনো জায়গা রাখছেন না এবারও এই কেন্দ্রে তৃণমূলের প্রার্থী নন্দিতাদেবী। বাবার ‘ইমেজ’কে সঙ্গী করেই ৩১৭টি বুথে লাগাতার জনসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। পাশাপাশি, তিনি বাবার নামে একটি ক্যানসার ফাউন্ডেশন চালাচ্ছেন দীর্ঘদিন ধরে। প্রচারের ফাঁকে নিজের অফিসে বসে মানুষের সমস্যা মেটাচ্ছেন। তাঁর কথায়, ‘দিদির স্বাস্থ্যসাথী আর লক্ষ্মীর ভাণ্ডার বহু পরিবারের মুখে হাসি ফুটিয়েছে। আমিও চেষ্টা করি মানুষের কাছে থাকতে। সবার জন্য একটাই ফোন নম্বর ব্যবহার করি। কারণ মানুষই আমার পরিবার।’
বিধায়কের এই জনসংযোগ ভোটে কতটা প্রভাব ফেলবে? বাকসাড়া এলাকায় রেলগেটের যানজটে জর্জরিত ব্যবসায়ী দেবু নস্কর বলছিলেন, ‘আন্ডারপাসের দাবি নিয়ে আমরা বহু আন্দোলন করেছি। কেন্দ্রের সহযোগিতার জন্য বিজেপির কাউকে পাশে পাইনি। নন্দিতাদি বরাবর আমাদের দাবির পাশে থেকেছেন।’ গত বছর আগস্টে লোয়ার ফরশোর রোডের বস্তি এলাকায় বৃষ্টিতে স্বর্ণময়ী খালের গার্ডওয়াল ভেঙে পড়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল বহু বাড়ি। সেখানকার বাসিন্দা রমেশ পাশোয়ান বলেন, ‘আমাদের ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করেছিলেন বিধায়ক। তখন বিজেপি কোথায় ছিল?’ শালিমার ওয়ার্কস ফ্যাক্টরি সংলগ্ন বস্তির বাসিন্দারাও বিপদে-আপদে বিধায়ককে পাশে পাওয়ার কথা জানালেন। আন্দুল রোডের যানজটও বড়ো সমস্যা। এনিয়ে প্রচারে নিত্যদিন তৃণমূলকে কাঠগড়ায় তুলছেন বিজেপি প্রার্থী শ্যামল হাতি। তবে স্থানীয়দের একাংশের বক্তব্য, ‘এই সমস্যা সমাধানে বিজেপি প্রার্থীর মুখে কোনো স্পষ্ট পরিকল্পনা শোনা যাচ্ছে না।’
হাওড়া দক্ষিণ বিধানসভা কেন্দ্রের অধীনে রয়েছে দুইল্যা, জোড়হাট, পাঁচপাড়া ও থানামাকুয়া পঞ্চায়েত। তৃণমূলের দাবি, নিকাশি সমস্যার সমাধানে গঙ্গার ধার বরাবর লকগেট বসানো হয়েছে। বহু বাসিন্দা উপকৃত। পাঁচপাড়ায় তৈরি হয়েছে জেটি, শীঘ্রই চালু হবে ফেরি পরিষেবা। এর ফলে কাপড় ব্যবসায়ীরা সরাসরি মেটিয়াবুরুজে যেতে পারবেন। পাশাপাশি, রাস্তা সংস্কার ও স্ট্রিট লাইটের কাজও এগিয়েছে। সব মিলিয়ে বিদায়ী বিধায়কের রিপোর্ট কার্ডেই আত্মবিশ্বাস পাচ্ছে তৃণমূল। অন্যদিকে, এসআইআরে প্রায় ৬১ হাজার মানুষের নাম বাদ পড়া নিয়ে ‘নিশ্চুপ’ বিজেপি কার্যত ব্যাকফুটে। উনশানি দক্ষিণপাড়ার জাতীয় পতাকা তৈরির কারিগর রাজু হালদারের মতো বহু বাসিন্দা, যাঁরা প্রজন্ম ধরে সেখানে বসবাস করছেন, বৈধ ভোটার হওয়া সত্ত্বেও এবার ভোট দিতে পারবেন না তাঁরা। এনিয়ে ক্ষোভ রয়েছে এলাকায়। তাই তাঁদের বক্তব্য, ‘নিজেদের অধিকার রক্ষার জন্য আমরা তৃণমূলকেই চাই।’