


সুপ্রিয় নায়েক, কলকাতা: আধুনিক যুগে দু’টি স্বাস্থ্যসমস্যা চিকিত্সকদের দুঃস্বপ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রথমটি হল, পুরুষ বন্ধ্যত্ব, দ্বিতীয়টি জিমে শরীরচর্চার সময় আকস্মিক হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে প্রাণহানি! আর এই দুই জটিলতার সমাধানে এগিয়ে এসেছেন এক বাঙালি শিক্ষক-চিকিৎসক ডাঃ সুজয় মুখার্জি। ডাঃ মুখার্জি পশ্চিমবঙ্গ স্বাস্থ্য শিক্ষা দপ্তরের অধীনে ফিজিওলজি বিষয়ের সহকারী অধ্যাপক এবং বর্তমানে এইমস পাটনার ফিজিওলজি বিভাগে উচ্চ শিক্ষারত।
প্রথম সমস্যা
ডাঃ সুজয় মুখার্জি জানাচ্ছেন, সারা দেশেই দম্পতিদের মধ্যে বন্ধ্যত্ব বা সন্তানহীনতার সমস্যা ক্রমশ বেড়েই চলেছে। এক্ষেত্রে ৫০ শতাংশ ক্ষেত্রেই কারণ হয় পুরুষ বন্ধ্যত্ব। সাধারণভাবে পুরুষ বন্ধ্যত্ব আছে কি না তা নির্ণয়ে ভরসা করা হয় পরীক্ষাগারে চিরাচরিত বা কনভেনশনাল সিমেন অ্যানালিসিসের উপর। কনভেনশনাল সিমেন অ্যানালিসিস-এ মূলত সিমেন-এ স্পার্মের সংখ্যা, সচলতা এবং গঠনের পরীক্ষাই করা হয়। এক্ষেত্রে একটা অদ্ভুত বিষয় লক্ষ করা গেছে। কনভেনশনাল সিমেন অ্যানালিসিসে রিপোর্ট স্বাভাবিক এলেও ১৫ থেকে ৩০ শতাংশ পুরুষের ক্ষেত্রে বন্ধ্যত্ব প্রকাশ পেতে পারে আর তার কোনও ব্যাখ্যা মেলে না! পাশাপাশি দেখা যাচ্ছে এই পুরুষদের স্পার্ম ডিএনএ ফ্র্যাগমেনটেশন ইনডেক্স (ডিএফআই)-এর সূচকও রয়েছে উচ্চ অবস্থানে। এর জেরে ব্যর্থ হতে পারে আইভিএফ, আইইউআই বা কৃত্রিম উপায়ে সন্তানধারণের প্রক্রিয়া। বারংবার মিসক্যারেজের ঘটনাও লক্ষ্য করা যায়। অর্থাত্ ওই নির্দিষ্ট শতাংশের আওতায় থাকা পুরুষদের স্পার্মের ডিএনএ-এর সমস্যার কারণেই দেখা যাচ্ছে বন্ধ্যত্ব। ইনফার্টিলিটি বিশেষজ্ঞরা তাই জানাচ্ছেন, পুরুষ বন্ধ্যত্ব জানতে সেরা পরীক্ষা হল ডিএনএ ফ্র্যাগমেন্টেশন ইনডেক্স (ডিএফআই)।
এখন মুশকিল একটাই। এভাবে সন্তানহীনতার চিকিত্সা করাতে আসা ওই ১৫-৩০ শতাংশ পুরুষকেই পরীক্ষাগারের স্পার্মের ওই ব্যয়বহুল ডিএনএ পরীক্ষা করাতে দেওয়া সম্ভব নয়। টেস্টের বিপুল খরচ তো রয়েইছে, পাশাপাশি উন্নত মানের ল্যাবরেটরির অপ্রতুলতাও এক্ষেত্রে একটা বড় কারণ। অর্থাত্ গ্রামেগঞ্জে বা প্রত্যন্ত এলাকায় এই পরীক্ষার উপযুক্ত ল্যাবরেটরির অভাব রয়েছে। এখানেই বড় ভূমিকা নিতে চলেছে মুখার্জিস স্পার্ম ডিএনএ ইন্টিগ্রিটি ইনডেক্স (এমএসডিআইআই)।
এই ব্যবস্থার মাধ্যমে ব্যয়বহুল পরীক্ষাগার পরিকাঠামো, দামি ও উচ্চ মানের মাইক্রোস্কোপ, নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সংযোগ ছাড়াই অফলাইনেই স্ক্রিনিং করা যাচ্ছে মেল ফার্টিলিটি। ডাঃ সুজয় মুখার্জি জানাচ্ছেন, শুধু তিনি একা নন, এমএসডিআইআই-এর সাফল্যে যোগদান রয়েছে এইমস পাটনার আরও এক গবেষক ডঃ যোগেশ কুমার এবং উদ্ভাবক তরুণিমা মুখার্জির। ডাঃ সুজয় মুখার্জি জানিয়েছেন, যে কোনও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে, মোবাইল চিকিত্সা ভ্যানে, টেলিমেডিসিন ব্যবস্থায় বা গাইনিকোলজিস্টের চেম্বারে এই ছোট্ট স্ক্রিনিং ডিভাইস এবং বিশেষ ধরনের সফটওয়্যারের মাধ্যমে পুরুষ বন্ধ্যত্বের ধারণা করা সম্ভব (এই ব্যবস্থাকে এস্টিমেটেড ডিএনএ ফ্র্যাগমেন্টেশন ইনডেক্স বলা হয়)। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট চিকিত্সক ওই ব্যক্তিকে কিছু প্রশ্ন করতে পারেন যেমন তাঁর বিএমআই, ঘুমের ইতিহাস, রোগের ইতিহাস। পাশাপাশি পরিবেশগত নানা প্রভাব এবং কনভেনশনাল সিমেন অ্যানালিসিস-এর প্যারামিটারগুলি একত্রিত করে এমএসডিআইআই-এর সাহায্যে তৈরি হয় স্পার্মের ডিএনএ ফ্রাগমেনটেশন ইনডেক্স! ফলে সন্তানহীন ওই দম্পতির পরবর্তী পদক্ষেপ কী হতে পারে তা নিয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়। সময় নষ্ট হয় না।
পাশাপাশি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ইতিমধ্যেই চলে এসেছে তাঁর দ্বিতীয় আবিষ্কারটিও। ডাঃ মুখার্জি জানাচ্ছেন, আধুনিক সময়ে যেখানে সুগার, উচ্চ রক্তচাপ, কোলেস্টেরলের মতো মেটাবলিক সমস্যা মানুষ ভুগছেন সেখানে শরীরচর্চার অভ্যেস ওষুধের মতোই উপকারী প্রমাণিত হতে পারে! তবে তিনি সতর্ক করছেন, মেডিসিনের ডোজ যেমন ভিন্ন ব্যক্তির ক্ষেত্রে ভিন্ন হয়, তেমনই আলাদা ব্যক্তির শারীরিক অবস্থা অনুসারে ঠিক করতে হয় তার এক্সারসাইজের মাত্রা। ডাঃ মুখার্জি জানাচ্ছেন, জিম শুরু করার আগে অবশ্যই নেওয়া উচিত চিকিত্সকের পরামর্শ। তবে বহু মানুষ চিকিত্সকের পরামর্শ ছাড়াই ভর্তি হন জিমে। অথচ কারও শারীরিক কোনও সমস্যা হচ্ছে কি না তা নজরদারির কোনও আলাদা ব্যবস্থা নেই। এর ফলেই ঘটে কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট এবং সাডেন কার্ডিয়াক ডেথ-এর মতো দুর্ঘটনা। উপকারের চাইতে অপকার হয় বেশি। এক্ষেত্রে মুশকিল আসান হিসেবে দেখা দিচ্ছে জিমগার্ড- এসসিডি ক্লিনিকাল ডিসিশন সাপোর্ট সিস্টেম।
জিম শুরু করার আগে এই বিশেষ যন্ত্রটির সাহায্যে চার ধাপে, ১৭ মিনিট ধরে পরীক্ষার মাধ্যমে একজন ব্যক্তিকে পরীক্ষা করা হয়। ধাপগুলি যথাক্রমে বিশ্রামরত অবস্থায় শারীরিক অবস্থা, হালকা ব্যায়ামের পর শারীরিক অবস্থা, ব্যায়ামের পরপরই তাৎক্ষণিকভাবে শরীর কীভাবে তার শরীরের অবস্থা পুনরুদ্ধার করছে এবং পরবর্তী পুনরুদ্ধার পর্ব।
শরীরচর্চায় ইচ্ছুক ব্যক্তির হৃদ্যন্ত্র ও স্নায়ুতন্ত্র কীভাবে সামলাচ্ছে শরীরচর্চার চাপ, তা দেখে ব্যবহারকারীর স্বাস্থ্য ঝুঁকির একটি ধারণা দেয় যন্ত্রটি। এরপর ওই যন্ত্রই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ওই ব্যক্তির জন্য তৈরি করে এক্সারসাইজ প্রেসক্রিপশন। যে এক্সারসাইজ প্রেসক্রিপশন দেখে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবেন সপ্তাহে কতদিন, কতক্ষণ, কত মাত্রায়, কীভাবে করতে হবে এক্সারসাইজ। ডাঃ মুখার্জি বলছেন, যে কোনো জিম বা অ্যাথলিট ট্রেনিং সেন্টার, কার্ডিয়াক রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার অথবা লাইফস্টাইল মেডিসিন ক্লিনিকে এই যন্ত্র থাকলে সহজেই শরীরচর্চা জনিত কোনও স্বাস্থ্যঝুঁকি আছে কি না তা সহজেই কম সময়ের মধ্যেই বোঝা সম্ভব। এমনকী কোনও অসুখ থেকে সুস্থ হওয়ার জন্য পুনর্বাসনের লক্ষ্যে জিমে যে ধরনের শরীরচর্চা করা হয়, সেই শরীরচর্চাও ঠিক কীভাবে করা দরকার সেই সম্বন্ধেও ধারণা দিতে পারে যন্ত্রটি।
তিনি আরও জানিয়েছেন, দুটি উদ্ভাবনের মূল লক্ষ্যই হল সাধারণ মানুষের উপর থেকে জটিল ও ব্যয়বহুল রোগনির্ণায়ক পরীক্ষার বোঝা কমানো। পাশাপাশি প্রাথমিক স্তরেই কোনও অসুখ থাকলে তা চিহ্নিত করা। কারণ স্বাস্থ্য সবার অধিকার। তিনি জানিয়েছেন ইতিমধ্যেই দুটি উদ্ভাবনেরই পেটেন্টের আবেদন সফলভাবে নিবন্ধিত হয়েছে।
ছবি: প্রতীকী
চিকিত্সকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হলে: [email protected].