


সংবাদদাতা, কাঁথি: পুরীর মন্দিরে অহিন্দুদের প্রবেশে বাধা আছে। কিন্তু কাঁথির রামনগরের মৈতনা পঞ্চায়েতের ডেমুরিয়ার রথে জাতি, ধর্ম নির্বিশেষে সবাই অংশ নিতে পারেন। তিনশো বছরের পুরনো ডেমুরিয়ার রথ ঘিরে দশ দিনের উৎসবে হিন্দু, মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ মাতোয়ারা হন। রথের মেলা কমিটিতেও বেশ কয়েকজন মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ রয়েছেন।
ডেমুরিয়ার এই রথের মেলা ব্লক প্রশাসনের অধীনে ও পঞ্চায়েতের তত্ত্বাবধানে হয়। প্রবীণ মানুষজনের মতে, ডেমুরিয়ার রথযাত্রা নিয়ে ইতিহাস ও কল্পকাহিনি রয়েছে। তৎকালীন সময়ে ডেমুরিয়ায় মগিনীনারায়ণ চৌধুরী নামে এক ব্রাহ্মণ ছিলেন। মগিনীনারায়ণ প্রতিবছর এলাকার ধর্মপ্রাণ মানুষদের নিয়ে পুরীতে তীর্থ করতে যেতেন। একবার তীর্থে যাওয়ার পথে বালেশ্বরে অসুস্থ হয়ে পড়েন মগিনীনারায়ণ। তখন জগন্নাথদেবের স্বপ্নাদেশ ছিল, তোদের আর পুরী আসতে হবে না। ডেমুরিয়ায় একটি ঝিল রয়েছে। সেখানে খুঁজলে একটি কাষ্ঠখণ্ড পাবি। ওই কাঠ থেকে আমার, বলরাম ও সুভদ্রার মূর্তি তৈরি করে তুই পুজো কর। এরপর সত্যিই ওই স্থানে গিয়ে কাঠ পান মগিনীনারায়ণ। মাটির মন্দির তৈরি করে শুরু হয় আরাধনা। স্বর্ণালঙ্কার ও ধনসম্পদ যথেষ্টই ছিল মন্দিরে। যার লোভে বর্গীরা মন্দিরে হানা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। বর্গীহানার আশঙ্কায় জগন্নাথদেব, বলরাম ও সুভদ্রাকে নিয়ে এলাকারই বাসিন্দা করুণাকরণ পাহাড়ির বাড়িতে হাজির হন মগিনীনারায়ণ। সঙ্গে নিয়ে আসেন স্বর্ণালঙ্কার, বাসনপত্র-সবকিছুই। ফলে বর্গীদের মন্দির লুটের পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়ে যায়। এরপর ত্রিমূর্তির আরাধনার ভার নেন পাহাড়ি পরিবার। সেই পাহাড়িরাই পরবর্তীকালে চৌধুরী পদবি নেন এবং তাঁরাই মন্দিরের বর্তমান সেবায়েত। মগিনীনারায়ণেরই বংশধর ভোগ রান্না করেন। এদিকে তৎকালীন সময়ে মন্দির ধ্বংস হয়ে গেলেও পরবর্তীকালে এগরার বাসুদেবপুরের জমিদার লক্ষ্ণীকান্ত রায়ের দান করা জায়গায় মাটির মন্দির গড়ে ওঠে। কালের প্রভাবে সেই মন্দিরও ধ্বংস হয়। এক দশকেরও বেশি সময় আগে গ্রামবাসীদের উদ্যোগে পাকা বড় মন্দির তৈরি হয়েছে। ট্রাস্টি কমিটি মন্দির পরিচালনা করে।
পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের সব নিয়ম-অনুশাসন মেনেই ডেমুরিয়ার রথযাত্রা হয়। এবার মেলা কমিটির সভাপতি হয়েছেন বিডিও অখিল মণ্ডল, সম্পাদক জেলা পরিষদের খাদ্য কর্মাধ্যক্ষ তমালতরু দাসমহাপাত্র, সহ-সম্পাদক স্থানীয় পঞ্চায়েত সদস্য ওয়াসিম রহমান। মন্দিরের ট্রাস্টি কমিটির সম্পাদক অলোক চৌধুরী। এই মেলায় দোকান বসানো থেকে শুরু করে নানা কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা, সবই হিন্দু-মুসলিম কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বহু বছর ধরে করে আসছে।