


অভিষেক পাল, বহরমপুর: বেশ কয়েকদিন ধরেই বেসুরো ছিলেন। দলের অবস্থানের বাইরে গিয়ে আলটপকা মন্তব্যও করছিলেন ধারাবাহিকভাবে। শৃঙ্খলারক্ষা কমিটি বারবার সতর্ক করলেও থোড়াই কেয়ার মনোভাব ছিল তাঁর। সেই হুমায়ূন কবীর বৃহস্পতিবার বহরমপুরে দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সভায় গিয়ে জানতে পারলেন, তিনি সাসপেন্ড! কেননা ততক্ষণে তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ করার সিদ্ধান্ত সাংবাদিক বৈঠক করে জানিয়ে দিয়েছেন মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম। এর ঠিক পরেই ওই সভা থেকেও সাসপেন্ডের বিষয়টি ঘোষণা করেন স্বয়ং তৃণমূল সুপ্রিমো। সেই সঙ্গে ছিল চাঁচাছোলা ভাষায় আক্রমণও। হুমায়ূনের নাম না করে মমতার তোপ, ‘একটা ধান পচে গেলে সরিয়ে দিতে হয়। না হলে বাকি ধানগুলিও পচে যায়।’ এদিকে, মুর্শিদাবাদের বেলডাঙায় বাবরি মসজিদ তৈরির কথা ঘোষণা ঘিরে এবার মামলা দায়ের হল কলকাতা হাইকোর্টে। তাঁর এই মসজিদ ঘোষণাকে সংবিধান-বিরোধী বলে অভিযোগ তুলে জনস্বার্থ মামলা দায়ের হল। মামলাটি দায়ের করেন এক আইনজীবী। ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি সুজয় পালের ডিভিশন বেঞ্চে মামলাটি দায়ের হয়েছে। চলতি সপ্তাহেই শুনানির সম্ভাবনা।
হুমায়ূন কেন সাসপেন্ড, উপস্থিত দলীয় নেতা ও কর্মীদের সামনে তার ব্যাখ্যাও দেন মমতা। তিনি বলেন, ‘আমাদের দলের কারও কারও সঙ্গে বিজেপি ভিতরে ভিতরে যোগাযোগ রাখবে। কেউ কেউ টাকা খেয়ে ইলেকশনের আগে বিজেপির তাঁবেদারি করবে। এটা মেনে নেওয়া যাবে না। এরা দেশের শত্রু।’ এর আগে সাসপেন্ডের সিদ্ধান্ত জানাতে গিয়ে দলনেত্রীর সুরেই হুমায়ূনকে একহাত নিয়েছেন ফিরহাদ। তিনি বলেছেন, ‘কোনও সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে প্রশ্রয় দেবে না তৃণমূল। হুমায়ূন বিজেপির ষড়যন্ত্রে পা দিয়েছে। ১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের দায় বিজেপির। সেই দলের প্রার্থী হয়েছিলেন উনি। আবার দলে ফিরে বিভাজনের রাজনীতি করার চেষ্টা করছেন। বিজেপির হাত শক্ত করছেন। বাংলায় আগুন লাগানোর চেষ্টা হচ্ছে। এসব তৃণমূল বরদাস্ত করবে না। কঠোর হাতে মোকাবিলা করা হবে।’ এরপরই ফিরহাদের সংযোজন, ‘আমি একদম নিশ্চিত এটা বিজেপির ছক। কারণ, বাংলার ঘৃণার রাজনীতি কেউ করলে তাতে বিজেপিরই সুবিধা হবে।’ ভরতপুরের তৃণমূল বিধায়ক হুমায়ূন বহুদিন ধরেই বেপরোয়া মনোভাব নিয়ে চলছিলেন। বারবার দলবিরোধী কাজ ও মন্তব্য করে বিতর্কে জড়িয়েছেন। সর্বশেষ সংযোজন, বেলডাঙায় বাবরি মসজিদ তৈরি ও শিলান্যাস অনুষ্ঠান। সেটাই তাঁর কাল হল বলে রাজনৈতিক মহলের মত।
এদিন সকালেই তৃণমূল ভবনে সাংবাদিক বৈঠক করেন ফিরহাদ হাকিম। সেখানেই হুমায়ূনকে সাসপেন্ডের কথা ঘোষণা করেন তিনি। ঘটনাচক্রে সে সময় বহরমপুর স্টেডিয়ামে মমতার সভাস্থলেই ছিলেন হুমায়ূন। মঞ্চে ওঠার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। বিষয়টা শোনামাত্রই তেলেবেগুনে জ্বলে উঠে সভাস্থল ছাড়েন তিনি।
বেলডাঙায় ৬ ডিসেম্বর বাবরি মসজিদ তৈরির ঘোষণা করেছিলেন হুমায়ুন। তাতে ঘোরতর আপত্তি জানিয়েছিল দল। কিন্তু নাছোড় ছিলেন হুমায়ূন। দলকে বোঝানোর চেষ্টাও করেছিলেন, কোনও অবস্থাতেই মসজিদ প্রতিষ্ঠার দিন বদলাবেন না। সেই কারণে গত ক’দিন ধরে তাঁর সঙ্গে দূরত্ব বজায় রেখে চলছিল তৃণমূল নেতৃত্ব। শেষ পর্যন্ত ছেঁটে ফেলার সিদ্ধান্ত। এদিকে হুমায়ূন বলেন, ‘আগামিকাল শুক্রবার কিংবা সোমবার বিধায়ক পদ থেকে ইস্তফা দেব। আমাকে দল সাসপেন্ড করেছে। ৬ তারিখই বাবরি মসজিদের শিলান্যাস হবে। ২২ ডিসেম্বর নতুন দলের ঘোষণা করব আমি।’
হুমায়ূন-কাণ্ডের জেরে মুর্শিদাবাদে যাতে কোনও অশান্তির মেঘ ঘনাতে না পারে, তা নিয়েও সতর্ক তৃণমূল নেতৃত্ব। দলনেত্রীও বহরমপুরের সভা থেকে বারবার মনে করিয়ে দিয়েছেন, ‘মুর্শিদাবাদ অশান্তি চায় না। জেলায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ক্ষুণ্ণ করা যাবে না। এখানে সিরাজউদ্দৌল্লা ঘরে ঘরে পুজিত হন। মুর্শিদাবাদের মানুষ দাঙ্গার রাজনীতি মানবে না।’ একই সঙ্গে ঠারেঠোরে মমতা এটাও বুঝিয়ে দেন, হুমায়ূনকে সাসপেন্ড আগামী বিধানসভা ভোটে কোনও প্রভাব ফেলবে না।