


সংবাদদাতা, বোলপুর : বিধানসভা নির্বাচনের আবহে বীরভূমের নানুরে এবার প্রধান ইস্যু অজয় নদের বন্যা ও ভাঙন। তবে এই বিপর্যয় এখনকার নয়, প্রায় প্রতি বর্ষাতেই যেন অজয় নদের জল ক্ষুধার্ত দানবের মতো গ্রাস করে গ্রামের পর গ্রাম। বর্ষা এলেই ঘরছাড়া হন বহু মানুষ, ভেসে যায় সংসার, থমকে যায় স্বাভাবিক জীবন। সেই চেনা দুঃস্বপ্নই বারবার ফিরে আসে, আর তার ক্ষত নিয়েই ভোটের আবহে সরব হচ্ছেন এলাকাবাসী।
উল্লেখ্য, কয়েক বছর আগে দুর্গাপুজোর প্রাক্কালে একইভাবে প্লাবিত হয়েছিল নানুরের বিস্তীর্ণ এলাকা। যেন উৎসবের আলো নিভিয়ে দিয়েছিল অজয়ের কালো জল। নানুরের সুন্দরপুর গ্রাম সেই দুঃসহ স্মৃতির এক জীবন্ত উদাহরণ। বর্ষার সময় গ্রামটি প্রায় প্রতি বছরই জলমগ্ন হয়ে পড়ে। অজয়ের স্রোত যেন এক অদৃশ্য হাতের মতো টেনে নিয়ে যায় মানুষের বহু কষ্টে গড়া ঘরবাড়ি, বাসনপত্র, এমনকি জরুরি নথিপত্রও। অনেক সময় গ্রামবাসীদের আশ্রয় নিতে হয় বাঁধের উপর। খোলা আকাশই তখন তাঁদের একমাত্র ছাদ। ওইসব এলাকায় আজও সেই আতঙ্ক রয়ে গিয়েছে। আকাশে কালো মেঘ জমলেই বুক কেঁপে ওঠে মানুষের।
শুধু সুন্দরপুর নয়, বাসাপাড়া, বামুনিয়া, থুপসারা, বেজরা, রামকৃষ্ণপুর, কুড়গ্রাম নানুরের বিস্তীর্ণ এলাকা বর্ষা এলেই একই ছবির সাক্ষী হয়। চারিদিকে জল, মাঝেমধ্যে ভেসে থাকা ভাঙা ঘরের চিহ্ন। যেন ডুবে যাওয়া জনপদের নীরব সাক্ষ্য। কোথায় যাবেন, কীভাবে থাকবেন তা নিয়ে প্রতি বছরই অনিশ্চয়তায় ভোগেন মানুষজন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের তরফে ত্রাণ মিললেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। বামুনিয়া গ্রামের বাসিন্দা সাবিত্রী দাস বলেন, “প্রতি বছরই একই অবস্থা হয়। অনেক কষ্ট করে ঘর বানাই, আবার জলে ভেসে যায়।” সুন্দরপুরের বাসিন্দা শেখ ইয়াসিন বলেন, “বর্ষা এলেই আমাদের গ্রামটা যেন জলের নিচে হারিয়ে যায়। আমরা চাই স্থায়ী সমাধান, যাতে বারবার এই কষ্ট সহ্য করতে না হয়।” এই পরিস্থিতিতে প্রায় প্রতিবছরই বিভিন্নভাবে সহায়তা করেন নানুর ব্লক তৃণমূল কংগ্রেস।
এমন পুনরাবৃত্ত বন্যা পরিস্থিতির মধ্যেই অজয় নদের বাঁধ সংস্কার এখন নির্বাচনের অন্যতম বড় ইস্যু হয়ে উঠেছে। বছরের পর বছর ধরে একই সমস্যার পুনরাবৃত্তি, যেন এক না শেষ হওয়া দুঃস্বপ্ন, ক্ষুব্ধ করে তুলেছে এলাকাবাসীকে। নানুর বিধানসভার তৃণমূল প্রার্থী বিধানচন্দ্র মাঝি তাঁর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে থুপসরা এলাকায় অজয়ের উপর শক্তপোক্ত বাঁধ নির্মাণের কথা উল্লেখ করেছেন। অন্যদিকে বিজেপি প্রার্থী খোকন দাসের অভিযোগ, “গত ১৫ বছর ধরে মানুষ এই সমস্যায় ভুগছে। প্রতি বর্ষায় বাঁধ ভেঙে এলাকা প্লাবিত হয়। এবার আমরা জিতলে স্থায়ী সমাধান করব।”
যদিও বিদায়ী বিধায়ক তথা তৃণমূল প্রার্থী বিধানচন্দ্র মাঝির দাবি, “আমাদের সরকার ইতিমধ্যেই পাঁচ কোটি টাকা ব্যয় করে বিভিন্ন জায়গায় বাঁধ সংস্কারের কাজ করেছে। কিন্তু পুরো এলাকা জুড়ে কাজ করতে আরও অর্থের প্রয়োজন। তার জন্য আমরা আবেদনও করেছি। এবার জিতে পুরো এলাকাজুড়ে সেই কাজ সম্পূর্ণ করব।” তিনি আরও জানান, কঙ্কালীতলা অঞ্চলের নিচু এলাকায় জল জমার সমস্যাও সমাধানের জন্য উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বর্ষা এলেই যে আতঙ্ক গ্রাস করে, সেই আতঙ্কই এখন ভোটের ইস্যু। প্রতিশ্রুতির বন্যা কতটা বাস্তবের বাঁধ গড়তে পারে, সেটাই এখন দেখার। প্রতীকী চিত্র