


পরামর্শে আর এন টেগোর ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কার্ডিয়াক সায়েন্সেস হাসপাতালের মেডিসিন এবং ক্রিটিক্যাল কেয়ার বিভাগের প্রধান ডাঃ সৌরেন পাঁজা।
রোগীর নাম বলা যায় না। এটুকু গোপনীয়তা বজায় রাখতেই হবে। বরং গল্পটা বলি। পুজোর মাসে এবং তার পরবর্তী সময়ে একটা মজার ব্যাপার ঘটে। এই সময়টায় কেউ কেউ জমিয়ে পুজো কাটান। কেউ কেউ আবার বেড়াতেও যান। পুজো, ভ্রমণের পর্ব শেষ হলে নানা অসুখে আক্রান্তরা চিকিত্সকের কাছে আসেন চেকআপের জন্য। তেমনই একজন ডায়াবেটিসের রোগী এলেন চেম্বারে। তিনি দীর্ঘদিন ধরেই ব্লাড সুগারের সমস্যায় আক্রান্ত। প্রায় মাসছয়েক আগে চেম্বারে এসেছিলেন। প্রথমেই ফাস্টিং, পোস্ট প্রান্ডিয়াল ব্লাড সুগারের (পিপি) রিপোর্ট দেখালেন। সব ঠিক আছে। ফাস্টিং-পিপি-এর রিপোর্ট দেখার পরেও ওঁকে প্রশ্ন করা হল, এইচবিএ১সি পরীক্ষা করিয়েছেন? উনি বললেন হ্যাঁ, করিয়েছেন। রিপোর্ট ব্যাগ থেকে বের করতে উনি ভুলে গিয়েছিলেন! তিনি ব্যাগ থেকে এইচবিএ১সি-এর রিপোর্ট বের করার পরে তা ভালোভাবে দেখে তারপর তাঁকে ওষুধ দেওয়া গেল। এই গল্পে মজার কী আছে তা পরে বোঝা যাবে। আপাতত উপরিউক্ত ঘটনার কথা পড়ে প্রশ্ন আসতে বাধ্য, সুগারের চিকিত্সায় কোন টেস্টের গুরুত্ব সবচাইতে বেশি? ফাস্টিং, পিপি নাকি এইচবিএ১সি? না হলে কেন ফাস্টিং-পিপি-এর পরেও ডাক্তারবাবু এইচবিএ১সি টেস্টের কথা বললেন? এই প্রশ্নের উত্তর জানতে হলে পরীক্ষাগুলি সম্পর্কে জানতে হবে। তাহলেই গোটা বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে।
ফাস্টিং ব্লাড সুগার
কোনও ব্যক্তির ৮ ঘণ্টা খালি পেটে থাকার পর প্রতি ডেসিলিটার রক্তে সুগারের মাত্রা ৯৯ মিলিগ্রাম বা তার কম থাকলে তা স্বাভাবিক। তবে প্রতি ডেসিলিটার রক্তে সুগারের মাত্রা ১০০ মিলিগ্রাম থেকে ১২৫ মিলিগ্রামের মধ্যে থাকলে বুঝতে হবে তিনি প্রি-ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। ব্লাড সুগার ১২৫ মিলিগ্রামের বেশি হলে বুঝতে হবে তিনি ডায়াবেটিসে আক্রান্ত।
পোস্ট প্রান্ডিয়াল (পিপি) ব্লাড সুগার
খাবার খাওয়ার ২ ঘণ্টা পরে কোনও ব্যক্তির প্রতি ডেসিলিটার রক্তে সুগারের মাত্রা ১৪০ মিলিগ্রামের কম থাকলে তা স্বাভাবিক। ১৪০ মিলিগ্রাম থেকে ১৯৯ মিলিগ্রামের মধ্যে থাকলে তা প্রি-ডায়াবেটিস। আর ২০০ মিলিগ্রামের বেশি হলে বুঝতে হবে তিনি ডায়াবেটিসে আক্রান্ত!
কখন করানো হয় ফাস্টিং ও পিপি?
• সাধারণত কোনও ব্যক্তি ডায়াবেটিস সংক্রান্ত উপসর্গ নিয়ে চিকিত্সকের কাছে হাজির হলে ডাক্তারবাবু তাঁকে এই পরীক্ষা করাতে বলেন। পরীক্ষার রিপোর্টে ওই ব্যক্তি প্রি-ডায়াবেটিস বা ডায়াবেটিস পর্যায়ে থাকলে, সাধারণত তাঁকে তিনমাস জীবনপ্রণালীর পরিবর্তন করতে বলা হয়। চেষ্টা করা হয় লাইফস্টাইল চেঞ্জের মাধ্যমে ব্লাড সুগার কন্ট্রোল করার।
• এছাড়া নতুন কোনও ওষুধ দেওয়ার পরে ওই ওষুধ সঠিকভাবে কাজ করছে কি না জানতেও ফাস্টিং-পিপি পরীক্ষা করাতে দিতে পারেন চিকিত্সক।
স্বাভাবিকভাবেই এক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠবে, ফাস্টিং-পিপি যদি এতকিছু জানাতে পারে, তাহলে শুরুর গল্পের ওই রোগীকে এইচবিএ১সি-এর রিপোর্ট আলাদা করে চাওয়া হল কেন? কারণ দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় চিকিত্সকরা জানেন, দুর্গাপুজোর সময়ে ও বেড়াতে গিয়ে ডায়াবেটিস রোগীর পক্ষে খাওয়াদাওয়ার উপর নিয়ন্ত্রণ রাখা সম্ভব হয় না। ব্লাড সুগার ওঠানামা করেই। তবে পুজো শেষ হলে বা ভ্রমণ শেষে বাড়ি ফেরার পরেই ডায়াবেটিস রোগী ফের কঠোরভাবে ডায়েট কন্ট্রোল করেন। তাই সেইসময় ফাস্টিং কিংবা পিপি পরীক্ষা করিয়ে তার রিপোর্ট নিয়ে চিকিত্সকের কাছে গেলে দেখা যায় রিপোর্ট প্রায় স্বাভাবিক! এই কারণেই রোগীর কাছে এইচবিএ১সি-এর রিপোর্ট দেখতে চাওয়া হয়।
শুরুর গল্পের ওই রোগীরও ফাস্টিং-পিপি প্রায় ঠিক থাকলেও এইচবিএ১সি ছিল ৯! অর্থাত্ ওই ব্যক্তির সুগার মোটেই নিয়ন্ত্রণে ছিল না! ফলে শুধু ফাস্টিং বা পিপি-এর রিপোর্ট দেখে ওষুধ দিলে রোগীর সঠিক চিকিত্সা করা হতো না।
এখানেই এইচবিএ১সি-এর গুরুত্ব। এই পরীক্ষার রিপোর্ট দেখে ওষুধ নির্বাচন করলে তাতে রোগীর একাধিক শারীরিক জটিলতার আশঙ্কা যেমন হ্রাস পায়, তেমনই কমে যায় হাইপোগ্লাইসেমিয়ার আশঙ্কাও।
এইচবিএ১সি নিয়ে বিস্তারিত
এইচবিএ১সি পরীক্ষা হল একটি রক্ত পরীক্ষা যা গত ৩ মাসে রোগীর শরীরে রক্তে গড় শর্করার মাত্রা পরিমাপ করে। এটি গ্লাইকেটেড হিমোগ্লোবিন বা গ্লাইকোসিলেটেড হিমোগ্লোবিন নামেও পরিচিত। কীভাবে গত তিন মাসে রক্তে সুগারের মাত্রা ওঠানামা করেছে, তাও জানা যায় এই পরীক্ষার মাধ্যমে।
কীভাবে জানা যায়
রক্তে যখন গ্লুকোজের পরিমাণ বেশি থাকে, তখন সেই গ্লুকোজ লোহিত রক্তকণিকায় থাকা হিমোগ্লোবিন নামক প্রোটিনের গায়ে লেগে যায়। লোহিত রক্তকণিকা প্রায় ১২০ দিন পর্যন্ত বাঁচে। এইচবিএ১সি পরীক্ষা মূলত সেই হিমোগ্লোবিনের শতাংশ পরিমাপ করে, যা চিনি বা গ্লুকোজের সঙ্গে লেগে আছে। ফলে রিপোর্টে ‘শতাংশ’ বেশি হওয়ার অর্থ হল গত কয়েক মাসে রক্তে গড় শর্করার মাত্রাও বেশি থাকা।
এইচবিএ১সি নিয়ন্ত্রণে থাকার অর্থ হল, শরীরের নানা অঙ্গে জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও কম থাকা।
এইচবিএ১সি পরীক্ষার রিপোর্ট
এইচবিএ১সি পরীক্ষার রিপোর্ট ৫.৭ শতাংশের নীচে থাকলে তা স্বাভাবিক। ৫.৭ থেকে ৬.৪ শতাংশ হলে প্রি-ডায়াবেটিস। ৬.৫ শতাংশ বা তার বেশি হলে তা ডায়াবেটিস। আমেরিকান ডায়াবেটিস অ্যাসোসিয়েশনের মত অনুসারে, একজন ডায়াবেটিসে আক্রান্তর উচিত এইচবিএ১সি-এর মান ৬.৫-এর নীচে রাখা। তবে খুবই বয়স্ক ব্যক্তির ক্ষেত্রে একটু ছাড় দেওয়া হয়।
শেষ কথা
কোন পরীক্ষা ভালো তা নিয়ে না ভেবে বরং জীবনযাত্রা পরিবর্তনের দিকে মন দিন। প্রতিদিন ৪০ মিনিট এক্সারসাইজ করুন। চিনি, গুড়, আলু, ময়দা, ভাত, রুটি খাওয়ার মাত্রা কমান। শাকসব্জি খান বেশি করে। পাতে রাখুন পর্যাপ্ত মাত্রায় প্রোটিনজাতীয় খাদ্য। ভালো থাকুন।
লিখেছেন সুপ্রিয় নায়েক