


হিমাংশু সিংহ: দুয়ারে উপনির্বাচন। নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরে আজ বিকেলেই প্রচার শেষ। ভোট মঙ্গলবার, ফল শুক্রবার। বিজেপি আমলের প্রথম নির্বাচন। ফলে কে জয়ী হবে, তার চেয়েও বড়ো প্রশ্ন ভোট কতটা অবাধ হবে। মানুষ দাদাগিরি বর্জিত শান্তিপূর্ণ ভোটদান দেখতে চায়। জানতে চায় গত পাঁচ মাসের গুলিয়ে যাওয়া রাজনীতির আবহে দু’নম্বর স্থানে কে? রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল বামেরা, কংগ্রেস, না মমতা ও গণতান্ত্রিক তৃণমূলের দুই শিবিরের কেউ! মাত্র পাঁচমাস ক্ষমতায় থেকে ৪১ শতাংশ ভোট পাওয়া প্রধান বিরোধী তৃণমূল কংগ্রেসকে ভেঙে প্রতীক-শূন্য করে দেওয়াই যদি সাফল্য হয় তাহলে বলতেই হবে বিজেপির কূটচালে মেওয়া ফলেছে। খুব বেশি সবুরও করতে হয়নি তারজন্য। শিল্প, চাকরি, সুশাসনের স্বপ্ন ফেরির মধ্যেই মাত্র দেড়শো দিনে বিরোধী হাওয়া! যে দাঁড়াচ্ছে তাঁকে পুরানো মামলায় জেল খেটে আসতে হচ্ছে কিংবা মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নিরাপদে থাকতে হচ্ছে!
বিজেপির ইস্তাহারে কিংবা সংকল্পপত্রে কিন্তু এমনটা লেখা ছিল না কোথাও। বজ্র নির্ঘোষ ঘোষণাও কেউ করেনি ভোট প্রচারে। তবু ঐতিহাসিক বদলের পর দুর্নীতিপরায়ণের শাস্তি, অত্যাচারীর মুখোশ খুলে দেওয়া কিংবা চাকরি হারানোদের সুবিচার দেওয়ার আগে প্রায় আলোর গতিবেগে শাসক যুদ্ধকালীন তৎপরতায় যে কাজটা অত্যন্ত সুচারুরূপে সম্পন্ন করেছে তা হচ্ছে, ৮০ আসনে জেতা প্রধান বিরোধী দলকে ভেঙে খান খান করে দেওয়ার মাস্টার ব্লুপ্রিন্ট কার্যকর করা। সেইসঙ্গে বিজেপির তৃণমূলীকরণ। সামান্য কয়েক মাসেই প্রধান বিরোধী তৃণমূল শুধু ভাঙেনি, কার্যত চৌচির। অফিসিয়ালি তিনভাগ। সংসদীয় দল থেকে পরিষদীয় শিবির সব তছনছ। প্রতীক হারিয়ে সবাই না ঘরকা না ঘাটকা। সেই তিনভাগের একভাগ থেকেই বিধানসভার বিরোধী দলনেতাও বেছে নিয়েছে শাসকই। বিরোধ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে কোনটা আসল তার নিষ্পত্তি করতে আদালতের শরণাপন্ন হতে হয়েছে দু’পক্ষকে। এই টানাপোড়েনেই পাঁচমাস আগে ৪১ শতাংশ ভোট পাওয়া ঘাসফুল প্রতীকটাই নিশ্চিহ্ন? কেউ পেয়েছে ‘খাম’, কেউ ‘ফুটবলার’। এগারোর বদলের অস্ত্র জোড়াফুল আপাতত উপনির্বাচনে, পুরভোটে অদৃশ্য। তৃণমূলের অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে সেই অমীমাংসিত প্রশ্নের মতোই বিরোধী দলনেতা কে থাকবেন তারও চূড়ান্ত নিষ্পত্তি ঝুলেই রয়েছে। উপলব্ধি একটাই, এআই যুদ্ধের যুগে মুখ্যমন্ত্রীর নেতৃত্বে শুধু মন্ত্রিসভা গড়েই জয়ী দল ক্ষান্ত থাকে না, পছন্দের বগলস আঁটা বিরোধী বেছে নেওয়াও তার অবশ্য কর্তব্যের মধ্যে পড়ে ক্ষমতায় টিকে থাকতে গেলে!
বিরোধীদের যদি ছলে বলে পোষ মানানো যায় তাহলে প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার অভিশাপকেও ঘুম পাড়িয়ে দেওয়া যায়। বামেরা দীর্ঘসময় একাজ করেছেন। একটা সময় মমতারও কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল না এ রাজ্যে। এখন বিজেপি আমলেও একই পুনরাবৃত্তি। কিন্তু তবু এতকিছু করেও পালাবদলকে রুখে দেওয়া যায় না। গণতন্ত্র যতদিন জীবিত শাসকের ছলাকলা ব্যর্থ করে পরিবর্তন স্বাভাবিক ও স্বতঃস্ফূর্ত ঘটনা! সাতাত্তর, এগারো, ছাব্বিশ...সেই চলমান বদলের ইতিহাসেরই স্মারক বহন করে চলেছে।
জ্ঞান হওয়ার পর থেকেই দেখে আসছি জরুরি অবস্থার কংগ্রেসি বাড়াবাড়ির কলঙ্ক ঘুচিয়ে এ রাজ্যে প্রায় সবাই বাম। জেলা থেকে শহর সর্বত্র। তারপর এগারো থেকে সবাই তৃণমূল। সাদা নীলের সর্বগ্রাসী ছায়া। এবার আবার পবিত্র গেরুয়া রঙে রাঙিয়ে ডবল ইঞ্জিন উত্তরণ। তবে বিরোধী স্থান কখনো এভাবে শাসকের সঙ্গে এত অল্প সময়ে মিশে যায়নি। সিপিএম বছরের পর বছর জিতে বিরোধী কংগ্রেসকে দুরমুশ করেছে, তবু অস্তিত্ব সংকটে পড়েও দল ভাঙেনি। ছুটকোছাটকা দু-একজন এদিক-ওদিক করলেও সামগ্রিকভাবে বিরোধীরা ভেঙে যায়নি। তৃণমূলও অনেক দোষে দোষী হলেও সিপিএমকে ভাঙাতে পারেনি। নেতা হাতবদল হয়েছে বিজেপি কংগ্রেসের সঙ্গে। কিন্তু আজ এই দোদুল্যমান বঙ্গ রাজনীতিতে কেউ নির্দিষ্ট করে বলতে পারবে না প্রকৃত বিরোধী কে? মমতা তৃণমূল হীনবল, সেই দলে বিধায়ক এমপি নেতার ভিড় আজ কম হলেও গণতান্ত্রিক তৃণমূলের তুলনায় মানুষ বেশি আছে। তৃণমূল ভেঙে যাঁরা বগলস পরা বিরোধী সেই ঋতব্রত শিবির বিধায়কদের নিরাপদ আশ্রয় হলেও মানুষের আস্থার জায়গা নয়। এই পটভূমিতে বাম ও কংগ্রেসের ভোট বাড়ে কি না সেদিকেই সবার চোখ।
নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরে ভোটের সরকার ভাঙা গড়ার খেলায় এই ভোটের তেমন কোনো তাৎপর্য থাকতে পারে না। গড়পড়তা উপনির্বাচনে যেমন সবকিছুই শাসকের দিকে ঝুঁকে থাকে এক্ষেত্রেও তাই। তবে গত পাঁচমাসে যে স্বপ্ন নিয়ে বাংলার মানুষ মমতা জমানার অবসান ঘটিয়েছিল তা কিন্তু ধাক্কা খেয়েছে। তোলাবাজি, কিছু নেতার বিচ্যুতি, শাসক দলের নাম ভাঁড়িয়ে গুন্ডামি—বাকি নেই কিছুই। সঙ্গে ফাউ বিজেপির তৃণমূলীকরণ! কলেজের মুখ না দেখেও কলেজ পরিচালনা কমিটির প্রধান! এটা শিক্ষার উলঙ্গ রাজনীতিকরণ নয়? এই অল্প সময়ে যাদবপুর কিংবা সত্যজিৎ রায় আন্তর্জাতিক ফিল্ম ইনস্টিটিউটে যা হয়েছে তা খুব শুভ ইঙ্গিতবাহী বলে কি মনে করেন শমীকবাবুরা?
নন্দীগ্রামের গত এপ্রিলের ফলাফলের দিকে একবার চোখ দেওয়া যাক। শুভেন্দুবাবু পেয়েছিলেন ১ লক্ষ ২৫ হাজার ৯৬৯টি ভোট। আর তৃণমূলের প্রার্থী একদা শুভেন্দুবাবুর ঘনিষ্ঠ পবিত্র কর পেয়েছিলেন ১ লক্ষ ১৭ হাজার ৭৩৭ ভোট। ব্যবধান ৯৬৬৫ ভোটের। শুভেন্দুবাবুর ভোট প্রাপ্তি ৫০.৩৭ শতাংশ আর তৃণমূলের পবিত্র কর পান ৪৬.৫৫ শতাংশ। পাঁচমাস আগে অত কাঠখড় পুড়িয়ে এসআইআর চাপিয়ে ভোট করে এই যদি পরিস্থিতি হয়ে থাকে তাহলে কোন জাদুকটিতে পাঁচমাসের মধ্যে সেই দল নির্বাচনি ময়দান থেকেই উবে গেল মাননীয় শুভেন্দুবাবুর ছেড়ে যাওয়া আসনে। ৬ অক্টোবর যে ভোট হতে চলেছে সেখানে তথাকথিত প্রধান বিরোধী তৃণমূল প্রার্থী আচমকা শুভেন্দুবাবুর সঙ্গে দেখা করে প্রার্থী পদ প্রত্যাহার করে নিতেই রহস্য জমে ওঠে। অগত্যা কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধানই বিজেপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। কিন্তু মমতা সমর্থন জানাতেই ১৯ বছরের পুরানো মামলায় জেলে যেতে হয় তাঁকে। ১২ দিন জেলে কাটিয়ে সেই মিলন প্রধানই বিরোধীদের মধ্যে প্রচারে এগিয়ে। অথচ গত এপ্রিল মাসের ঐতিহাসিক ভোটেও নন্দীগ্রামে কংগ্রেস প্রার্থী মাত্র ০.৩ শতাংশ (৭৮৪) ভোট পেয়েছিলেন। কংগ্রেস প্রার্থীর জামানত পর্যন্ত জব্দ হয়েছিল। এবার ওই কেন্দ্রে নিহত চন্দ্রনাথ রথের মা হাসিরানির জয় নিশ্চিত হলেও প্রধান বিরোধী কে হবে, বামেরাই বা কতটা এগবে, সেই প্রশ্নে রাজ্য-রাজনীতি সরগরম। কিন্তু মিলন প্রধানের গ্রেপ্তারি নিয়ে প্রশ্ন থাকবেই।
নন্দীগ্রামের চেয়েও রেজিনগরের রাজনীতি আরও করুণ পরিণতির অপেক্ষায়। ওই কেন্দ্রে মাত্র গত এপ্রিলে হুমায়ুন কবির প্রায় ৫৯ হাজার ভোটে জয়ী হন। জয়ী প্রার্থী পেয়েছিলেন ১ লক্ষ ২৩ হাজার ৫৩৬ ভোট। বিজেপি প্রার্থী বাপন ঘোষ পান ৬৪ হাজার ৬৬০ ভোট। তৃণমূলের আতাউর রহমান পান ৪১ হাজার ৭১৮ ভোট পেয়ে তৃতীয় হন। আর কংগ্রেসের জিল্লু শেখ পান ৪ হাজারের মতো ভোট। প্রশ্ন একটাই, কোন জাদুকাঠির ছোয়ায় মাত্র পাঁচমাসে এই সমীকরণ এবং জনসমর্থনের বিন্যাস আমূল বদলে যেতে পারে? সেই বদলে যাওয়া সমীকরণের জোরেই রেজিনগরে বিজেপির শাখারভ সরকার এবার জয়ের স্বপ্ন দেখছেন। মুখ্যমন্ত্রী নিজে ভোট ভাগাভাগি না করার বার্তা দিয়েছেন। কিন্তু প্রশ্ন একটাই, দু’নম্বরে কে থাকবে? হুমায়ুনের ছেলে, সিপিএম, কংগ্রেস না মমতা তৃণমূলের ফুটবলার প্রার্থী রবিউল ইসলাম। রেজিনগর বিজেপি যদি দখল করে তবে মোট আসন সংখ্যাই শুধু বাড়বে না রাজ্যের সংখ্যালঘুরা যে শুভেন্দুবাবুর উপর আস্থা রাখছেন তাও প্রমাণিত হবে। আসন সংখ্যা একটা সংখ্যা মাত্র। তার চেয়েও অনেক বড়ো প্রশ্ন, এই উপনির্বাচন থেকে কে রাজ্যের প্রধান বিরোধী হিসাবে উঠে আসছে? সেটাই বুঝে নিতে চায় জনগণ। বিজেপি ঋতব্রতকে যেভাবে বিরোধী দলনেতা হিসাবে খাড়া করে বিরোধী রাজনীতির গতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছে তা সংসদীয় রাজনীতিতে নিঃসন্দেহে বিপজ্জনক ঝোঁক। এই ঝোঁকই ক্রমাগত গণতন্ত্রের পরিসরকে সংকুচিত করে দলতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে। পরিণামে আলোচনা বিতর্ক ছাড়াই বহু গুরুত্বপূর্ণ বিল পাশ হয়ে আইনে পরিণত হয়। প্রতিবাদ পথ হারায়।
এটা ঠিক শুভেন্দুবাবু অত্যন্ত দ্রুত গতিতে ছুটছেন। জেলার পর জেলায় গিয়ে প্রতিদিন নানা ঘোষণা করছেন। কিন্তু সরকার চালানো একার কাজ নয়। আমলা ও পোড়খাওয়া একগুচ্ছ মন্ত্রীর সমন্বয়ে তবেই সাফল্য আসে। সেই সমন্বয়ের অভাব হলে এবং দল ও সরকার বিপরীত মুখে ছুটলে বিরোধীদের বগলস পরিয়েও সুবিধা হওয়া কঠিন। গণতন্ত্রে শেষ কথা সর্বদা জনগণই বলে। বিরোধীরা ব্যর্থ হলে, শাসকের তাঁবে চলে গেলে আরশোলাদের দৌরাত্ম্য বাড়ে! ভবিষ্যতে স্বীকৃত বিরোধীদের উপড়ে ফেলার আগে শুভেন্দুবাবুদের একথাটা সর্বদা মনে রাখতে হবে। ভুলগুলো কিন্তু আবারও আগের জমানার স্মৃতিই ফিরিয়ে আনছে সজোরে।