


শুভ্রনীল রায়, চিফ অফিসার, বাণিজ্যিক জাহাজ সংস্থা (৪০ বার হরমুজ যাতায়াতের অভিজ্ঞতা):
২০০৩ সালে নাবিক জীবনের শুরু। ’১১ সালে সেকেন্ড অফিসার হিসেবে কাতার শিপিং কোম্পানির জাহাজে অ্যামোনিয়া, এলপিজি নিয়ে যাওয়া-আসা আরম্ভ করি। সেই থেকে হরমুজ দিয়ে যাতায়াত। ’১৮ সাল পর্যন্ত অন্তত ৩৫-৪০ বার এই পথ দিয়ে গিয়েছি।
স্ট্রেট অব হরমুজ বা হরমুজ প্রণালী প্রস্থে বড়োজোর ৩০-৩৫ কিমি। কিন্তু জাহাজ যাওয়ার মতো ‘নেভিগেবল ওয়াটার’ মাত্র ৬ কিমি। তার মধ্যে ২ কিমি আবার ইনবাউন্ড ট্রাফিক। মানে হরমুজগামী জাহাজের ভিতরে ঢোকার পথ। ২ কিমি আউটবাউন্ড, মানে বেরনোর জন্য। মাঝে আরও ২ কিমি ট্রাফিক সেপারেশন জোন। কাতারের দুটি বন্দর থেকে নিতাম লিকুইফায়েড পেট্রোলিয়াম গ্যাস— এলপিজি। প্রোপেন আর বিউটেন। দুটো কিন্তু একসঙ্গে মিশিয়ে নিয়ে যেতাম না আমরা। আলাদা কন্টেনারে থাকত। তারপর হরমুজ হয়ে ভারতের পশ্চিমে গুজরাত বা মার্মাগাওয়ে ‘আনলোড’ বা ‘ডিসচার্জ’। সেখান থেকে চলে যেতাম পূর্ব উপকূলে। কোচি-ভাইজাগ হয়ে জাহাজ যখন একেবারে হালকা, তখন হলদিয়ায়। যাতায়াতে সময় লাগে ১০-১২ দিন। তার মধ্যে তিনদিন তো ভারতের পশ্চিম থেকে পূর্ব উপকূলে যেতেই কেটে যায়। যেটুকু খবর পাচ্ছি, কাতারের গ্যাস উৎপাদনই এখন বন্ধ। পৃথিবীর মোট এলপিজি উৎপাদনের ৩০ শতাংশই ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। যা ক্ষতি হয়েছে, আগের অবস্থায় ফিরতে অন্তত ২ বছর তো লাগবেই।
হরমুজের দু’প্রান্তে রয়েছে তিনটি দেশ। একদিকে ইরান। অন্যদিকে সংযুক্ত আরব আমিরশাহি আর ওমান। বর্তমানে রাশিয়া, চীন, ভারত, পাকিস্তান, ইরাকের জাহাজকে হরমুজে থেকে বেরতে দিচ্ছে ইরান। শর্ত, দেশের জাতীয় পতাকা থাকতে হবে জাহাজে। বন্ধুবান্ধবদের অন্তত ২-৩টি জাহাজ লোডেড অবস্থায় হরমুজে আটকে। শুনছি, আগামী সপ্তাহে ইরান ওদের ছাড়ার সিগন্যাল দেবে। সবাই পড়িমড়ি করে বেরতে চাইছে। কিন্তু, নতুন করে কে ঢুকবে আগুনে?
একটি ১৮০ মিটারের জাহাজ ৩৫ হাজার মেট্রিক টন গ্যাস বহন করে। আরও বড় ২২৬ মিটারের
জাহাজ বহন করে ৬০-৭০ হাজার মেট্রিক টন গ্যাস। তা নিতে পারস্য উপসাগর ধরে হরমুজ দিয়ে যেতে হবেই। আর ওই ৬-৭ কিমি যাতায়াতের জায়গা যদি কেউ দখল করে রাখে, খেলা শেষ! হরমুজে বয়া ফেলা আছে। নীচে নোঙর। তা দেখে দেখে জাহাজ যায়। কে বলতে পারে নোঙরে নীচে সেন্সর দেওয়া মাইন পাতা নেই?
এই চেনা পথ ছাড়াও আরও একটি পথ আছে। আরও পশ্চিমে। জিবুতি আর ইয়েমেনের মাঝখানে আরও সরু একটি প্রণালী আছে। ‘বাব এল মান্দেব’। হরমুজ এড়িয়ে এই পথ দিয়ে লোহিত সাগর, সুয়েজ খাল ধরে ভূমধ্যসাগরে যাওয়া সম্ভব। কিন্তু সেখানে আবার অস্ত্রশস্ত্র, মিসাইল নিয়ে রেডি ইরান মদতপুষ্ট হুথি বিদ্রোহীরা। কোন মালিক তার ৩০-৩৫ কোটি টাকার জাহাজ পাঠাবে মিসাইল খেতে? আমাদের ভাষায় এই পুরো সমুদ্রপথটাই ‘হাই রিস্ক জোন’।
তাহলে? আরও নীচে মাদাগাসকার হয়ে আফ্রিকা ঘুরে যেতে হবে! তাতে সময় লাগবে দ্বিগুণেরও বেশি। একদিন জাহাজ চালাতে ১২-১৪ হাজার ডলার খরচ পড়ে। ফলে পরিবহণ ব্যয় কোথায় গিয়ে ঠেকবে বুঝছেন? শুনছি, ওই তল্লাটের সবচেয়ে প্রভাবশালী শিপিং কোম্পানি বি-ডব্লিউ তার জাহাজগুলি আমেরিকার দিকে পাঠাচ্ছে গ্যাস আনতে। সবমিলিয়ে পরিস্থিতি ঘোরালো। যুদ্ধ এখনই থামবে? মোটেই মনে হচ্ছে না।অনুলিখন: বিশ্বজিৎ দাস