


আইসা কভি হুয়া হ্যায় কি গয়ে হো আপ অর ফার্স্ট বল আপনে ছক্কা মার দিয়া হো!’— রাজস্থান রয়্যালসের প্র্যাকটিসের ফাঁকে এক ১৪ বছরের কিশোর জিজ্ঞাসা করছিল ফজলহক ফারুকিকে। জবাবে আফগান ক্রিকেটারটি শুধুই হেসেছিলেন। কিশোর মনের কৌতূহল ভেবে তার উত্তর দেননি।
কাট টু: ১৯ এপ্রিল ২০২৫। রাজস্থান রয়্যালস বনাম গুজরাত টাইটান্স ম্যাচ। ক্যাপ্টেন সঞ্জু স্যামসন চোটের কারণে না খেলায় বছর চোদ্দোর সেই ক্রিকেটারের ভাগ্যে শিকে ছেঁড়ে। কেরিয়ারের প্রথম আইপিএল ম্যাচে প্রথম বল। সামনে যে বোলার, তিনি ভারতীয় জাতীয় দলের তারকা শার্দূল ঠাকুর। এমন পরিস্থিতিতে ১৪ বছর বয়সি ক্রিকেটারের হাঁটু কাঁপারই কথা। কিন্তু সেই খুদেটি যা করল তাতে চক্ষু চড়কগাছ ক্রিকেট বিশ্বের। শার্দূলের লেংথ বল এক্সট্রা কভারের উপর উড়িয়ে ছক্কা! সোয়াই মান সিং স্টেডিয়াম তখন যেন অতিমানবীয় ঘোরে আচ্ছন্ন। সমর্থকরা বোধহয় চিমটি কেটে দেখছিলেন, ‘তাঁদের সামনে যা ঘটল, সেটা সত্যি তো!’ থুড়ি একটা ছক্কা! তারপর সেই কিশোরের ব্যাট থেকে ঠিকরে বেরল ২০ বলে ৩৪ রানের অনবদ্য ইনিংস। — এতক্ষণ নিশ্চয়ই আঁচ করেই ফেলেছেন বিস্ময় বালকের পরিচয়। হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন সেই কিশোর আর কেউ নয়, ক্রিকেটের নতুন সেনসেশন বৈভব সূর্যবংশী।
১৯ এপ্রিলের পর ধূমায়িত চায়ের আড্ডায় শুধুই বৈভব চর্চা। শিশুসুলভ নিষ্পাপ মুখের ক্রিকেটার রীতিমতো চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে ক্রিকেট দুনিয়ায়। ‘১৪ বছর বয়সে আপনি কী করছিলেন?’— এই প্রশ্ন এখন সোশ্যাল মিডিয়ার ট্রেন্ডিং। আর তাতে গা ভাসিয়েছেন বিখ্যাত সব ধারাভাষ্যকাররাও। কিন্তু আবেগে গা ভাসায়নি বৈভব। মনে মনে হয়তো বলছিল, ‘পিকচার আভি বাকি হ্যায়!’ সত্যিই তাই। ১৯ এপ্রিলের ডেব্যু ইনিংস তো ট্রেলার ছিল। আসল ছবি সোয়াই মান সিং স্টেডিয়ামেই রিলিজ হল ২৯ এপ্রিল। আইপিএলের তৃতীয় ম্যাচেই হাঁকাল অবিস্মরণীয় সেঞ্চুরি। গুজরাত টাইটান্সের বিরুদ্ধে মাত্র ৩৫ বলে তিন অঙ্কের ঘরে পৌঁছয় ব্রায়ান লারার ভক্ত। যা আইপিএলের ইতিহাসে দ্বিতীয় এবং ভারতীয়দের মধ্যে দ্রুততম শতরানের নজির। শুধু তাই নয়, স্বীকৃতি পেল টি-২০ ইতিহাসেও— সর্বকনিষ্ঠ সেঞ্চুরিয়ান বৈভব (বয়স ১৪ বছর ৩২ দিন)। শেষ পর্যন্ত ৩৮ বলে তাঁর ১০১ রানের ইনিংস সাজানো ছিল ৭টি চার ও ১১টি ছক্কায়। ১৪ বছরের একটা নিষ্পাপ চেহারার ছেলে ব্যাট হাতে যে এতটা ভয়ঙ্কর হতে পারে, তার আন্দাজ ছিল না তামাম ক্রিকেট বিশ্বের। মহম্মদ সিরাজ, ইশান্ত শর্মা, প্রসিদ্ধ কৃষ্ণা, রশিদ খানের মতো বিশ্বের তাবড় তাবড় বোলারদের সেদিন স্কুল স্তরে নামিয়ে এনেছিল সে। যা দেখে তার আইডল ব্রায়ান লারাও সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে লেখেন, ‘বৈভব তোমার এই ইনিংসে আমি মুগ্ধ।’ যতই লারার ভক্ত হোক, বৈভব দেখতে যতই শিশুসুলভ হোক, তার কর্মকাণ্ড ‘ইউনিভার্সল বস’ ক্রিস গেইলের মতো। তাই ক্রিকেট দুনিয়া তার নতুন নাম দিয়েছে ‘বেবি বস’। শেষ পর্যন্ত ২০২৫-’২৬ আইপিএলে ৭ ইনিংসে বৈভবের মোট সংগ্রহ ২৫২। তাতে শামিল একটি শতরান ও দু’টি অর্ধশতরান।
আইপিএলে বৈভবের সেঞ্চুরি সোশ্যাল মিডিয়ায় ট্রেন্ডিং ছিল। গোটা বিশ্বে ক্রীড়াপ্রেমীরা গুগল করতে থাকেন, ‘হু ইজ বৈভব সূর্যবংশী?’ তাঁর জীবনের গল্প নিয়ে কত যে প্রিন্ট খরচ হচ্ছে, তারও ইয়ত্তা নেই। বৈভবের জীবনকাহিনি জানতে টাইম মেশিনে ২০১১ সালে ফেরা যাক। হ্যাঁ, আইপিএল যুগেই বিহারের সমস্তিপুর জেলার তাজপুর গ্রামে জন্ম এই বিস্ময় বালকের। তাঁর বাবা সঞ্জীব সূর্যবংশী পেশায় কৃষক। তিনি নিজেও একসময় ক্লাব ক্রিকেট খেলেছিলেন। তাই ছেলের প্রতিভা তাঁর চোখে পড়তে সময় লাগেনি। প্লাস্টিক বলে চার বছরের বৈভবের ব্যাটিং দেখে তিনি প্রতিভার আঁচ পান। সেদিনই ঠিক করে ফেলেন, ছেলেকে ক্রিকেটার তৈরি করবেন। তারপর শুরুর দিকে নিজেই তালিম দিতে থাকেন। ছেলে একটু বড় হলে তাকে কোচিংয়ে ভর্তি করার সিদ্ধান্ত নেন। ৭ বছর বয়সি বৈভবকে সমস্তিপুরে প্যাটেল ময়দানে কোচিংয়ে ভর্তি করেন। সেখানকার কোচ ব্রজেশ ঝায়ের কথায়, ‘বৈভব ছোট থেকেই আগ্রাসী ব্যাটিং করত। আর ওর সবচেয়ে বড় গুণ হল, ও ভুল কম করে।’ বছর দুই পর বৈভবকে পাটনার কোচিংয়ে ভর্তি করার সিদ্ধান্ত নেন বাবা সঞ্জীব। তারজন্য প্রতিদিন ৯০ কিলোমিটার ট্রাভেল করে ৯ বছরের ছেলেকে পাটনায় নিয়ে যেতেন তিনি। আইপিএলে সেঞ্চুরি হাঁকানোর পর বৈভব বলছিল, ‘আমার সাফল্যের পিছনে সবচেয়ে বড় অবদান মা-বাবার। আমার ক্রিকেটের জন্য বাবা কাজ পর্যন্ত ছেড়ে দিয়েছেন। প্রতিদিন আমার সঙ্গে পাটনায় ট্রাভেল করতেন। আর মা ভোর তিনটেয় উঠে আমাদের জন্য খাবার তৈরি করে দিতেন।’ পাটনায় প্রাক্তন রনজি ক্রিকেটার তথা কোচ মণীশ ওঝার তত্ত্বাবধানে আরও ধারালো হয়ে উঠতে থাকে বৈভব। মাত্র ১২ বছর বয়সেই বিনু মানকড় ট্রফিতে সুযোগ পায় এই বিস্ময় বালক। সেই টুর্নামেন্টে চারশোর বেশি রান করে। সেই সুবাদে ভারতের অনূর্ধ্ব-১৯ দলেও সুযোগ পায় বৈভব। সেখানে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ম্যাচে ৫৩ রান করে প্রাক্তন ভারতীয় ক্রিকেটার ওয়াসিম জাফরের নজরে পড়ে। জাফর বাংলাদেশের কোচ ছিলেন। বৈভবের ব্যাটিংয়ে মুগ্ধ হয়ে যান প্রাক্তন তারকা। জাফর বলছিলেন, ‘খুদে বৈভবের ব্যাটিং দেখে আমি অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। তারপর ওর সঙ্গে গিয়ে কথা বলি। এখনও ওর সঙ্গে হামেশাই কথা হয় আমার। ও আমার থেকে পরামর্শ নিতে থাকে। তবে সব কথা মানে না। আইপিএলে অভিষেকের আগে আমাকে ম্যাসেজ করেছিল। আমি বলেছিলাম, প্রথম ম্যাচে কয়েকটা বল দেখে খেলবে। আর ও প্রথম বলেই ছক্কা হাঁকাল।’ মাত্র ১২ বছর ২৮৪ দিন বয়সে বিহারের হয়ে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেক হয় বৈভবের। সেখানেও নজর কাড়ে এই কিশোর। অবশেষে নজরে পড়ে যায় বিভিন্ন আইপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজির। আর মেগা নিলামে তাকে ১ কোটি ১০ লক্ষ টাকায় দলে নেয় রাজস্থান রয়্যালস। বাকিটা তো ইতিহাস।
আইপিএলে বৈভবের উত্থানের কাহিনি রূপকথাকেও হার মানাবে। তবে এই কিশোরকে নিয়ে আশঙ্কিত অনেক ক্রিকেট বিশেষজ্ঞ। কারণ ভারতীয় ক্রিকেটে একদিকে যেমন শচীন তেন্ডুলকরের সাফল্যের উদাহরণ রয়েছে, তেমনই উল্টোদিকে বিনোদ কাম্বলি, পৃথ্বী শয়ের মতো প্রতিভা অকালে ঝরে গিয়েছেন। তাই বৈভবকে ঠিকমতো গাইডেন্স দেওয়াটা আশু কর্তব্য। ১৪ বছরের কিশোর অবশ্য আবেগে গা ভাসানোর পাত্র নয়। সম্প্রতি এক সাক্ষাত্কারে সে বলছিল, ‘এতদিন যা পরিশ্রম করেছিলাম তা আইপিএলের জন্য। আমার প্রধান লক্ষ্য ভারতীয় দলের জার্সি গায়ে চাপানো। তারজন্য দিন-রাত এক করে পরিশ্রম করে যাব।’ বৈভব বড়দেরও খুব সম্মান করে। সম্প্রতি চেন্নাই সুপার কিংসের বিরুদ্ধে ম্যাচের পর তাকে মহেন্দ্র সিং ধোনির পা ছুঁয়ে প্রণাম করতে দেখা গিয়েছে। সেই ভিডিও নেটিজেনদের মন জয় করে নিয়েছে। বৈভব ভারতের অনূর্ধ্ব-১৯ দলের হয়ে চলতি মাসে ইংল্যান্ড সফরে যাবে। সেখানে ভালো পারফরম্যান্স করতে পারলে সিনিয়র দলে জায়গা পাওয়ার বিষয়টি আরও একধাপ এগবে। কনিষ্ঠতম ক্রিকেটার হিসেবে ভারতের জাতীয় দলের জার্সি চাপানোর রেকর্ড শচীন তেন্ডুলকরের (১৬ বছর ২৩৮ দিন) ঝুলিতে। সেই রেকর্ডকে কি বৈভব ভেঙে দিতে পারবে? উত্তর লুকিয়ে সময়ের গর্ভে।