


নিজস্ব প্রতিনিধি, পুরুলিয়া: ‘বনসৃজন’ প্রকল্পে যাঁরা গাছ লাগানোর কাজে নিযুক্ত ছিলেন, সেইসব শ্রমিকদের মজুরির টাকা তাঁদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে জমা পড়ার কথা ছিল। শ্রমিকদের অভিযোগ, তাঁদের টাকা দেওয়া হয়েছে নগদে। যে টাকা তাঁরা পেয়েছেন, তা প্রাপ্য মজুরির থেকে অনেক কম। কেন শ্রমিকদের নগদে টাকা দেওয়া হল? মজুরি যদি কম দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে বাকি টাকা কোথায় গেল? এখানেই রহস্য। উঠে আসছে অ্যাকাউন্ট ভাড়া করার তত্ত্ব! অভিযোগ, শ্রমিকদের মজুরির টাকা সেইসব ‘ভূতুড়ে’ অ্যাকাউন্টে পাঠিয়ে টাকা লুট করেছেন শাসক দলের একশ্রেণির নেতা, বনদপ্তরেরই কর্মী ও আধিকারিকদের একাংশ।
বনদপ্তরের অবশ্য দাবি, শ্রমিকদের মজুরির টাকা ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টেই পাঠানো হয়েছে। বনদপ্তরের এই বক্তব্য অবশ্য যুধিষ্ঠিরের ‘অশ্বত্থামা হত ইতি গজ’-র মতো সত্য! অভিযোগ, শ্রমিকদের মজুরির টাকা ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে দেওয়া হলেও যাঁরা বনসৃজন প্রকল্পে কাজ করেছেন, অর্থাৎ যৌথ বন পরিচালন কমিটির সদস্যদের অ্যাকাউন্টে দেওয়া হয়নি। বরং সেই টাকা ঢুকেছে ভাড়া করা অ্যাকাউন্টে। তারপর সেখান থেকে টাকা তুলে তা শ্রমিকদের নগদে দেওয়া হয়েছে। বাকি টাকা লুট হয়েছে বলে অভিযোগ। যেমন, হুড়া রেঞ্জের করণডির ১৫ হেক্টর জমিতে শালের চারা রোপণ করা হয়েছে। বনসৃজনের কাজ করেছেন ওই এলাকার যৌথ বন পরিচালন কমিটির সদস্যরা। সেক্ষেত্রে মজুরির টাকাও বন কমিটির সদস্যদের অ্যাকাউন্টে ঢোকার কথা। যদিও সদস্যদের অভিযোগ, তাঁদের কারও ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টেই টাকা দেওয়া হয়নি। টাকা দেওয়া হয়েছে নগদে। তাছাড়া কাউকেই ফরেস্টের নিয়ম অনুযায়ী দৈনিক ৩২০ টাকা করে মজুরি দেওয়া হয়নি। ২৫০-২৬০ টাকা করে মজুরি দেওয়া হয়েছে।
একইরকম ভাবে বন সম্প্রসারণ বিভাগের রঘুনাথপুরের খাটরা থেকে মৌতড়, ফুসরাবাদ থেকে আড়িতা, বরাবাজারের টোকোরিয়া মোড় থেকে খাড়িপাহাড়ী, কংসাবতী উত্তর বনবিভাগের তালবেড়িয়া, বামরড়া, পুরুলিয়া বনবিভাগের আড়ষা রেঞ্জের গৌরাদাগ, জয়পুর রেঞ্জের বালি, ডামরু, কোটশিলা রেঞ্জের খটমগা, চিতমু, বেলামু, কংসাবতী দক্ষিণ বনবিভাগের মানবাজার-২ রেঞ্জের জয়পুর, বান্দোয়ান রেঞ্জের বিভিন্ন এলাকাতেও শ্রমিকদের বঞ্চিত করা হয়েছে। তার মানে এমনটা নয় যে, পুরুলিয়ার বনদপ্তরের আধিকারিকরা সরকারের টাকা বাঁচিয়েছেন! প্রতি গাছ লাগানো ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য যা খরচ, খাতায় কলমে সেই খরচই দেখানো হয়েছে সরকারকে। শুধু টাকা যাঁদের পাওয়ার কথা, তাঁরাই ন্যায্য টাকা পাননি। এনিয়ে প্ল্যানটেশন জার্নাল ও মাস্টার রোলের তদন্ত চেয়ে রাজ্যের প্রধান মুখ্য বনপালের কাছে অভিযোগ দায়ের হয়েছে জেলা থেকে। পুরুলিয়ার ডিএফও অঞ্জন গুহ বলেন, ‘পুরুলিয়া বনবিভাগ নিয়ে নির্দিষ্ট কোনও অভিযোগ থাকলে খতিয়ে দেখা হবে।’ পুরুলিয়া জেলা পরিষদের বন ও ভূমি কর্মাধ্যক্ষ জয়মল ভট্টাচার্য বলেন, ‘গোটা বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হবে।’
তবে,শুধু এই বছরের নয়, বিগত বছরের বনসৃজন নিয়েও বনদপ্তরের ‘মনিটরিং বিভাগে’ বিস্তর অভিযোগ জমা পড়েছিল। অভিযোগ পেয়ে শুরু হয় তদন্ত। জানা যায়, সেই তদন্তের রিপোর্টে অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ মিলেছিল। বেশিরভাগ জায়গাতেই চারাগাছের উপস্থিতি সন্তোষজনক নয় বলে উঠে এসেছে তদন্তে। যদিও তারপর আর কিছু হয়নি! ‘জঙ্গলের রাজত্ব’ বলে একটা কথা শোনা যায় প্রায়শই। আক্ষরিক অর্থে পুরুলিয়া বনদপ্তরে জঙ্গলের রাজত্বই চলছে!