


রাহুল চক্রবর্তী, কলকাতা: কোথাও গণপিটুনি, কোথাও আবার একাকী ডেকে নিয়ে গিয়ে মারধর। রেললাইন থেকে দেহ উদ্ধার। জোরজুলুম করে টাকা ছিনতাইয়ের অভিযোগও রয়েছে। তখন বাধা দিলে অত্যাচার করে মেরে ফেলার অভিযোগও উঠেছে। দেশের নানা জায়গায় এরকম নানা ঘটনায় এখনও পর্যন্ত বাংলার ১২ জন পরিযায়ী শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। প্রায় ৯০ শতাংশ ঘটনাই বিজেপি শাসিত রাজ্যের। পরিযায়ী শ্রমিকদের উপর অত্যাচারের অভিযোগ সব থেকে বেশি এসেছে বিজেপি শাসিত ওড়িশা
থেকে। এই অত্যাচারের সঙ্গেই জড়িয়ে রয়েছে ‘বাংলাদেশি’ ইস্যু। বাংলায় কথা বললে ‘বাংলাদেশি’ বলে লাগিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে বারবার। এমনকি ‘পুশ ব্যাক’ করে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। সোনালি বিবির ঘটনাই তার
প্রমাণ। কাজের সূত্রে অন্য রাজ্যে গিয়ে কেন অত্যাচারের শিকার হতে হবে, এই প্রশ্নই ভোটমুখী বাংলায় এখন অন্যতম ইস্যু।
রাজ্য পরিযায়ী শ্রমিক উন্নয়ন পর্ষদের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলার যে ১২ জন পরিযায়ী শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে, তার সর্বশেষ ঘটনাটি গত সপ্তাহে মহারাষ্ট্রের পুনের। মৃত্যু হয়েছে পুরুলিয়ার পরিযায়ী শ্রমিক সুখেন মাহাতর। মৃতের পরিবার এবং রাজ্যের শাসক দলের পক্ষ থেকে দোষীদের কঠোর শাস্তি দাবি করা হয়েছে। সুখেনের বাড়িতে গিয়ে তাঁর পরিবারের পাশে সর্বোতভাবে থাকা এবং আইনি সাহায্যের আশ্বাস দিয়ে এসেছেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।
মৃত ১২ জন পরিযায়ী শ্রমিকের মধ্যে চার জন মারা গিয়েছেন মহারাষ্ট্রে। ওড়িশা, উত্তরপ্রদেশ, অসম, রাজস্থান, হরিয়ানা, তামিলনাড়ু, ঝাড়খণ্ডে বিভিন্ন সময় অত্যাচাকে মৃত্যু হয়েছে বাকিদের। গত বছরের ডিসেম্বর মাসে ওড়িশার সম্বলপুরে মুর্শিদাবাদের সূতি এলাকার বাসিন্দা জুয়েল রানাকে ‘বাংলাদেশি’ সন্দেহে গণপিটুনি দেওয়া হয়। তাতেই তাঁর মৃত্যু হয় বলে অভিযোগ।
তথ্য বলছে, সাম্প্রতিক সময়ে ১১৪৭টি গ্রুপের কাছ থেকে অত্যাচারিত হওয়ার অভিযোগ এসেছে রাজ্য পরিযায়ী শ্রমিক উন্নয়ন পর্ষদে। পরিযায়ী শ্রমিকরা ভিন রাজ্যে সাধারণত পাঁচ-সাতজনের গ্রুপ করে থাকেন। তাঁদের উপর নানা কায়দায় অত্যাচারের অভিযোগ জমা পড়েছে পর্ষদের কাছে। দিল্লি, গুজরাত, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড়, উত্তরপ্রদেশ, বিহার, ওড়িশা, অসম, রাজস্থান, কর্ণাটক, ঝাড়খণ্ড থেকে অভিযোগ এসেছে। তবে যত অভিযোগ এসেছে, তার ৩৮ শতাংশই ওড়িশার ঘটনা বলে দাবি পর্ষদের। রাজ্য পরিযায়ী শ্রমিক উন্নয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সামিরুল ইসলাম বলেন, ‘জয় বাংলা বললে কেন সেই পরিযায়ী শ্রমিকের উপর অত্যাচার হবে? কেন তাঁদের মেরে ফেলা হবে?’ পশ্চিমবঙ্গের পরিযায়ী শ্রমিকদের ভিন রাজ্যে হেনস্তার ঘটনায় প্রথম থেকেই সরব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আগেই তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছিলেন, ‘অন্যান্য রাজ্যের প্রায় দেড় কোটি মানুষ বাংলায় বসবাস করছেন এবং রুটিরুজি জোগাড় করছেন। এখানে তাঁদের কেউ হেনস্তা করার সাহস দেখায় না। কিন্তু বাংলার প্রায় ২২ লক্ষ পরিযায়ী শ্রমিক অন্য রাজ্যে কাজ করছেন। তাঁদের অন্য রাজ্যে কেন হেনস্তা হতে হবে?’