


সমৃদ্ধ দত্ত, নয়াদিল্লি: অর্থনীতি নাকি ঘুরে দাঁড়াচ্ছে! প্রত্যক্ষ বিদেশি লগ্নি বৃদ্ধির হার এখন নাকি অনেক ইতিবাচক! রপ্তানিও আগের তুলনায় বাড়ছে। এই প্রতিটি দাবি লাগাতার করে চলেছে অর্থমন্ত্রক ও বাণিজ্যমন্ত্রক। কিন্তু অর্থমন্ত্রকেরই মাসিক ইকনমিক রিভিউ রিপোর্ট কী বলছে? এক বছর আগে ২০২৪ সালের জুন মাসে বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ছিল ৬৬ হাজার ৮০০ কোটি ডলার। আর সেটাই ২০২৫ সালের জুন মাসে বেড়ে হয়েছে ৭৩ হাজার ৩০০ কোটি ডলার। অর্থাৎ, মাত্র এক বছরে প্রায় ৭ হাজার কোটি ডলার বেশি! যা ছিল জিডিপির তুলনায় সাড়ে ১৮ শতাংশ, সেটাই এখন ১৯ শতাংশেরও বেশি। কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রকের মাসিক আর্থিক রিপোর্টে সাফাই দেওয়া হয়েছে, এই বৃদ্ধির অন্যতম কারণ, ডলারের বিনিময় মূল্য বৃদ্ধি। টাকার নিরন্তর পতনের কারণে এই সময়সীমায় বিদেশি ঋণের পরিমাণ ভারতীয় অর্থমূল্যে অতিরিক্ত ৫০০ কোটি ডলার বেড়ে গিয়েছে।
যদিও এমন নয় যে, নিছক গত এক বছরের মধ্যেই বৈদেশিক ঋণ বেড়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। আর্থিক রিপোর্টের জুন মাসের এই পরিসংখ্যানে যে বিস্তারিত তালিকা দেখা যাচ্ছে, সেখানেই স্পষ্ট—এক বছর দু’বছর নয়। ২০১৭ সাল থেকে বস্তুত লাগাতার বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ঊর্ধ্বমুখী। ২০১৭ সালে ছিল ৪০ হাজার কোটি ডলার। ২০১৮ সালে সেটা হয় ৫০ হাজার কোটি ডলার। এভাবেই বেড়ে চলেছে বিদেশি ঋণ। বহু চেষ্টা করেও রিজার্ভ ব্যাঙ্ক ডলারের বিনিময়ে টাকার পতন রোধ করতে পারেনি। তাই মোট বৈদেশিক ঋণের ৫৪ শতাংশই এখন ডলার। মাত্র ৩.২ শতাংশ ইউরো। সরকারি, বেসরকারি সংস্থা, বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান—প্রতিটি সেক্টরে বৈদেশিক ঋণ বেড়ে চলেছে। ভারতে জিডিপির তুলনায় মোট ঋণের আনুপাতিক হার ৮০ শতাংশ। দীর্ঘদিন ধরেই সরকার বারংবার দাবি করে চলেছে যে, এই হার ২০৩১ সালের মধ্যে হবে ৫০ শতাংশ। কিন্তু সেজন্য যে আর্থিক সংস্কার প্রয়োজন, তার একটিও কেন্দ্র নিতে পারেনি। রিজার্ভ ব্যাঙ্কও বারবার নানাবিধ দাওয়াইয়ের কথা ঘোষণা করেছে। তাদের লাগাতার দাবি, ডলারের সঙ্গে টাকার বিনিময় মূল্যের ফারাক এবার কমবে। কিন্তু ২০২১ সাল থেকে এই ফারাক কমার দূরঅস্ত, রকেটের গতিতে বেড়েছে।
একদিকে যেমন বিদেশি ঋণ বেড়েছে, তেমনই আবার ভারতের ব্যাঙ্কিং সেক্টরে ডিপোজিট ও ঋণ দুই-ই উদ্বেগজনকভাবে কমছে। আর্থিক রিপোর্টে স্বীকার করা হয়েছে যে, ব্যাঙ্কিং সেক্টরে ক্রেডিট গ্রোথ এবং ডিপোজিট গ্রোথের মধ্যে সাম্য নেই। জুন মাসের হিসেবে লক্ষ্য করা যাচ্ছে, ঋণ প্রদান কিংবা আমানত জমা করা, দুই ক্ষেত্রেই বৃদ্ধির হার কমেছে। এক বছর আগে ঋণদানের বৃদ্ধিহার ছিল ১৪ শতাংশ। চলতি বছর জুন মাসে সেটি হয়েছে ১০ শতাংশ। ডিপোজিটের হারও সামান্য কমে গিয়েছে। সাধারণ মানুষের ব্যাঙ্কে টাকা রাখা কিংবা ব্যাঙ্ক থেকে ঋণ নেওয়া, দুটোই কমেছে। অর্থনীতি কতটা সচল রয়েছে, তার অন্যতম মাপকাঠিই হল ব্যাঙ্কিং সেক্টরের ঋণ ও ডিপোজিট হারের অনুপাত। যা বর্তমানে উদ্বেগজনক।