


নিজস্ব প্রতিনিধি, বারাসত: কিডনি পাচার চক্রে জড়িত অভিযোগে এবার অশোকনগর থানার পুলিস গ্রেপ্তার করল কলকাতার আলিপুর আদালতের আইনজীবী প্রদীপকুমার বরকে। বৃহস্পতিবার রাতভর তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করে তদন্তকারী দল। কথাবার্তায় একাধিক অসঙ্গতি থাকায় শুক্রবার সকালে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। এদিনই তাঁকে আদালতে তোলা হলে বিচারক চারদিনের পুলিস হেফাজতের নির্দেশ দিয়েছেন।
কয়েকমাস আগে একটি নির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্তে নেমে অশোকনগর থানা এই বড়সড় কিডনি পাচার চক্রের হদিশ পায়। সুদের কারবারি বিকাশ ঘোষ ওরফে শীতল সহ পাঁচজনকে একে একে গ্রেপ্তার করে পুলিস। তাদের জেরা করেই আলিপুর আদালতের আইনজীবী প্রদীপের নাম জানা যায়। তদন্ত ক্রমশ অন্য দিকে মোড় নিতে শুরু করে। পাচার চক্রে দক্ষিণ কলকাতার নামজাদা এক নার্সিংহোমের নেফ্রোলজিস্টের ভূমিকা খতিয়ে দেখতে শুরু করেন তদন্তকারীরা। তাঁদের আতস কাচের তলায় আছে একটি নেফ্রোলজি সেন্টারও। প্রদীপের বিরুদ্ধে কী অভিযোগ? তদন্তকারীরা জেনেছেন, কিডনি দানের ক্ষেত্রে সরকারি নিয়ম হল, প্রস্তাবিত কিডনিদাতাকে আদালত থেকে এ সংক্রান্ত এফিডেভিট করাতে হবে। পাচার চক্রটি এর জন্য আলিপুর আদালতের আইনজীবী প্রদীপের শরণাপন্ন হতো। তিনি নিজের মতো করে প্রয়োজনীয় নথিপত্র তৈরি করে সেসব জমা দিতেন। নিয়ম অনুযায়ী, কিডনি দেওয়ার জন্য দাতাকে স্থানীয় আদালত থেকে এফিডেভিট করাতে হয়। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, এই পাচার চক্রের ফাঁদে পড়ে যাঁরা কিডনি দিয়েছেন, তাঁদের প্রত্যেকের এফিডেভিট করানো হয়েছে আলিপুর থেকে। যদিও আলিপুর আদালত কোনও দাতারই স্থানীয় কোর্ট নয়। এতেই সন্দেহ বাড়ে পুলিসের। কেন সব হলফনামা আলিপুর আদালত থেকে করানো হচ্ছে, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই ধাপে ধাপে সামনে আসে ধৃত প্রদীপের ভূমিকা। তদন্তকারীরা জানতে পারেন, চক্রের অন্যতম মধ্যস্থতাকারী হিসাবে কাজ করতেন প্রদীপ। ৫০০ টাকা খরচে যেখানে এফিডেভিট করা যায়, সেখানে কখনও ১০ হাজার, কখনও ১৫ হাজার টাকায় ওই কাজ করতেন তিনি। অথচ, আদালতের নথিতে কিডনিদাতাই উল্লেখ করতেন, এর জন্য কোনওরকম আর্থিক লেনদেন হচ্ছে না। এছাড়া, কিডনি দানের কোনও আবেদন জেলা স্বাস্থ্যদপ্তর ‘রেকমেন্ড’ না করলেও এই আইনজীবীর হাতযশে তা ‘রেকমেন্ডেড’ হয়ে যেত। অভিযোগ, আইনজীবী-চিকিৎসক যৌথ উদ্যোগে সবটাই হয়ে যেত সহজে। দীর্ঘ প্রায় ১০ বছর ধরে এই কারবার চালাচ্ছিলেন তিনি। এছাড়াও প্রদীপের বিরুদ্ধে লক্ষ লক্ষ টাকার বেআইনি লেনদেনের প্রমাণ হাতে পেয়েছে পুলিস।
অশোকনগর এলাকার বাসিন্দা গুপি মজুমদার বলেন, ‘আইনজীবীরা কোথায় অসহায় মানুষকে আইনি সহায়তা দেবেন, তা না করে এরকম জঘন্য অপরাধ করে বেড়াচ্ছেন! ওঁর কঠোর সাজা হওয়া দরকার। আশা করি, পুলিস এই চক্রের মাথাকে ধরতে পারবে।’ বারাসত পুলিস জেলার সুপার প্রতীক্ষা ঝাড়খড়িয়া জানিয়েছেন, ধৃত ব্যক্তি পুলিসের নজর এড়াতেই বারাসতের কিডনিদাতাকে আলিপুরে নিয়ে গিয়ে এফিডেভিট করাতেন। তাঁর ফোনে আরও অনেক তথ্য পাওয়া গিয়েছে। ফোনটি ফরেন্সিকে পাঠানো হবে।