


নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা ও কোচবিহার: মাত্র দু’পাতার চিঠি। সঙ্গে পাঁচ পাতাজোড়া শর্ত! কলকাতা হাইকোর্টের চূড়ান্ত রায়ের ঠিক একমাস পর, মোট ৪৪ দফা কঠিন শর্ত চাপিয়ে অবশেষে বাংলায় ১০০ দিনের কাজে (মনরেগা) সায় দিল মোদি সরকার। আর সেই চিঠি পেতেই মঙ্গলবার কোচবিহারের জনসভা থেকে ফের গর্জে উঠলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কেন্দ্রের চাপানো শর্তগুলি তিনি একটি কাগজে লিখে এনেছিলেন। সভামঞ্চেই সেই কাগজ ছিঁড়ে প্রতিবাদ জানান ক্ষুব্ধ নেত্রী। স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন, ‘এই কাগজটা ভ্যালু লেস। এই শর্ত মানি না! ১০০ দিনের কাজ বাংলাই করবে।’
প্রায় সাড়ে তিন বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গে বন্ধ ১০০ দিনের কাজ। প্রাপ্য টাকাও আটকে কেন্দ্রের দরবারে। তা নিয়ে রাজনৈতিক টানাপোড়েন কম হয়নি। চলতি বছর ১৮ জুন রাজ্যে প্রকল্প চালুর নির্দেশ দিয়েছিল হাইকোর্ট। ১ আগস্ট থেকে কাজ শুরুর নির্দেশও দেওয়া হয়। সেই রায়কে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টে যায় কেন্দ্র। কিন্তু, সেই মামলা খারিজ করে দেয় সর্বোচ্চ আদালত। গত ৭ নভেম্বর আবারও অবিলম্বে ১০০ দিনের কাজ চালুর নির্দেশ দেয় হাইকোর্ট। তার প্রেক্ষিতেই গত ৬ ডিসেম্বর রাজ্যকে চিঠি দিয়ে শর্তসাপেক্ষে এব্যাপারে সায় দিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। কী নেই সেই শর্ত তালিকায়—কর্মীদের ১০০ শতাংশ ই-কেওয়াইসি বাধ্যতামূলক, না হলে মাস্টার রোল ইস্যু হবে না। একমাসের মধ্যে সব জব কার্ডের তথ্য পুনরায় যাচাই। ২০ লক্ষ টাকার উপরে কোনও কাজ অনুমোদিত হবে না। একটি গ্রাম পঞ্চায়েতে এককালীন দশটির বেশি কাজ নয়। জেলা স্তরের প্রোজেক্ট কমিটিও এই নিয়মের বাইরে গিয়ে কাজ অনুমোদন করতে পারবে না। অন্যান্য রাজ্যের তুলনায় পশ্চিমবঙ্গে এক একটি গ্রাম পঞ্চায়েতের এলাকা অনেক বড়। ফলে এককালীন ১০টি কাজ সারা বছরের জন্য কিছুই নয়। এতে ব্যাপকভাবে ধাক্কা খাবে গ্রামীণ এলাকার পরিকাঠামো উন্নয়ন।
এছাড়া গোটা বছরের নয়, ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে অনুমোদন দেওয়া হবে লেবার বাজেটে। সারা দেশের মধ্যে শুধু পশ্চিমবঙ্গের জন্যই যা প্রযোজ্য। পরবর্তী অনুমোদন দেওয়া নির্ভর করবে আগের তিন মাসে কাজের গুণমান এবং কেন্দ্রের দেওয়া শর্ত পালনের উপর। ফলে গ্রাম পঞ্চায়েত উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং ১০০ দিনের কাজ আগে থেকে করে রাখতে পারবে না রাজ্য। ক্ষতিগ্রস্ত হবেন জব কার্ড হোল্ডাররা। এছাড়া যে কোনও অনিয়মে ৬০ দিনের মধ্যে উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে হবে। এমনকি, প্রয়োজনে নয়া শর্ত আরোপ এবং ফের কাজ আটকে দেওয়া যেতে পারে বলেও পরিষ্কার বলা হয়েছে কেন্দ্রের চিঠিতে। পাশাপাশি উচ্চ আদালতের নির্দেশ মেনে চলবে যাবতীয় তদন্ত। এতেই প্রবল ক্ষুব্ধ মমতা। রাজ্যের উন্নয়ন প্রসঙ্গে সাফ বলেছেন, ‘চ্যালেঞ্জ করে বলতে পারি, এই ১৪ বছরে যা ডেভেলপমেন্ট করেছি, সারা পৃথিবীতে কোথাও হয়নি। মানুষের চাহিদা মেনে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে গোটা বাংলায় কাজ চলছে।’ এরপরেই কেন্দ্রের যাবতীয় শর্ত তুড়ি মেরে উড়িয়ে তিনি বলেন, ‘তাই আমি এটাকে অসম্মান মনে করি। কর্মশ্রীতে ৭০ দিন কাজ দিয়েছি। আরও ৭৫-৮০ দিন কাজ পাবেন শ্রমিকরা। ১০০ দিনের কাজ বাংলাই করবে। তোমাদের করতে হবে না। তোমাদের ভিক্ষে চাই না, আমরা নিজের পায়ে দাঁড়াতে জানি।’
বাংলায় ১০০ দিনের কাজের বকেয়া যে মেটানো হয়নি, তাও এদিন লোকসভায় মেনে নিয়েছে মোদি সরকার। তৃণমূল সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এব্যাপারে লিখিত প্রশ্ন করেছিলেন। উত্তরে গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রকের রাষ্ট্রমন্ত্রী কমলেশ পাসোয়ান জানিয়েছেন, গোটা দেশে এবছর ৬৯ হাজার ৯৭২ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। তবে পারিশ্রমিক এবং কাজের মেটেরিয়াল বাবদ এখনও বকেয়া রয়েছে ৯ হাজার ৪৩৯ কোটি টাকা। ২০২২ সালের ৯ মার্চ থেকে বাংলায় মনরেগার কাজ বন্ধ। সুতরাং ওই তারিখ মোতাবেক বাংলার বকেয়া ৩ হাজার ৮২ কোটি ৫২ লক্ষ টাকা।