


‘শ্রীচরণকমলেষু মা,
আমি পাঁচ বছর ধরে সহ্য করছি এদের অত্যাচার। আর পারছি না। আমি এখানে থাকবো না আর। তুমি বাবাকে বলো আমাকে নিয়ে যেতে।...’
প্রণাম নিও
তোমাদের বুড়ি।’
বুড়ির এই চিঠি পেয়েও বাবা-মা পরামর্শ দিয়েছিলেন—‘মানিয়ে নে’। দেবযানী বণিকের এমন বেশ কিছু চিঠি উদ্ধার হয়েছিল। তদন্তের ভাঁজে ভাঁজে উঠে এসেছিল যন্ত্রণার কাহিনি। অত্যাচার, আর শরীরে কালসিটের দাগ ফুটেছে কলমে ভর করে। হত্যার মূলে? সেই টাকা। শহুরে ‘ভদ্রলোকে’র দম্ভ। আর মহিলা বলেই গায়ে হাত তোলা যায়, হাত তুলতে তুলতে একদিন মেরেও ফেলা যায়, এমনই এক পুরুষতন্ত্রের আধার। এই সবটাই উঠে এসেছিল তদন্তে। যেখানে অত্যাচারের কথা শুনেও বাবা-মায়েরা মানিয়ে নিতে বলেন। বাবা-দাদারা দেরি করে ফেলেন মেয়ের বা দিদির শ্বশুরবাড়িতে আসতে।
বর্ধমানের নতুনগঞ্জে বাড়ি দত্ত পরিবারের। গড়িয়াহাটের বণিকদের চেয়ে দেবযানীর বাপের বাড়ি ধনদৌলতে কম কিছু নয়। বণিকদের মূলত চা-বাগানের ব্যবসা ছিল। এছাড়াও ছিল বিপুল সম্পত্তি। আর দত্তদের? রাইস মিল, পেট্রল পাম্প, মাছের ভেড়ি, কী নেই! অল্পবয়সি দেবযানীকে ’৭৫-এর আগস্ট মাসে বিয়ে করেন বছর কুড়ির চন্দন। সব ভালোই চলছিল। সুখের সংসার। তিন সন্তানের মা হয়েছিলেন দেবযানী। বাবু, টাবু, আর মামণি। ১৯৭৮ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে শুরু হয় ছন্দপতন। প্রথমত, দেবযানীর শ্বশুর চন্দ্রনাথ বণিক চেয়েছিলেন তাঁর এক মেয়ের বিয়ে হোক দত্তবাড়ির বড়ছেলের সঙ্গে। সেকথা শোনেননি দেবযানীর বাবা ধনপতি দত্ত। দ্বিতীয় দ্বন্দ্ব সেই বিয়ে ঘিরেই। বড়ছেলের বিয়ের নেমন্তন্ন করতে ধনপতি গড়িয়াহাটে এসেছিলেন। চন্দ্রনাথ আচমকাই বলেন, ডঃ মৃণালকান্তি বিষ্ণু এই বিয়েতে এলে, বণিকরা যাবে না। কেন? প্রথমে চন্দনের বিয়ে ঠিক হয়েছিল মৃণালকান্তির ভাগ্নির সঙ্গে। সেই বিয়ে না হওয়ায় মৃণালকান্তি রেগে যান। বিয়ের দিন বর্ধমানে গিয়ে বণিকবাড়ির সদস্যরা ওই ব্যক্তিকে দেখেন। সেখান থেকেই রেগে চলে আসেন চন্দ্রনাথ। তৃতীয় দ্বন্দ্ব, বর্ধমানের পুকুর। ধনপতি একটি পুকুর কিনেছিলেন। চন্দ্রনাথ বলেন, পুকুরটির জন্য তিনি বায়না করেছিলেন। তাই ওটা তাঁর চাই। ধনপতি বায়নানামা দেখতে চান। চন্দ্রনাথের কাছে তা নেই। দ্বন্দ্ব দৈত্যাকার হল। প্রভাব পড়ল দেবযানীর উপর। শ্বশুর-শাশুড়ি, দেওর-ননদের ব্যবহার বদলে গেল। স্বামী চন্দন গায়ে হাত তোলা শুরু করল। দুই পরিবারের সম্পর্ক আরও খারাপ হল ’৮২র মাঝামাঝি। ব্যাঙ্ক থেকে কয়েক কোটি টাকা ধার করে বর্ধমানে একটি কোল্ড স্টোরেজ কিনেছিলেন চন্দ্রনাথ। ব্যবসা জমেনি। ব্যাঙ্ক থেকে ‘ডিমান্ড নোটিস’ যাচ্ছিল বণিকবাড়িতে। বকেয়া ধারের ২৫ শতাংশ অর্থাত্ প্রায় পৌনে এক কোটি টাকা ধনপতিকে বহন করার জন্য চাপ দিয়েছিলেন চন্দ্রনাথ। ধনপতি শোনেননি। বলেছিলেন, ‘১০ লক্ষ টাকা দিতে পারি।’ বিবাদ চরমে ওঠে। একদা ‘ভালো ব্যবহার’ করা স্বামী-শ্বশুর-দেওর-ননদদের কাছে দেবযানী হয়ে উঠলেন ‘অলক্ষ্মী’।
’৮২ সালের পুজোর আগে অশান্তি চরমে ওঠে। দেবযানীকে প্রবল মারধর করেন চন্দন। দেবযানী বর্ধমানে গেলে তাঁর অত্যাচারের কাহিনি শুনে বাবা-মা বলেন, ‘আমরা কথা বলব। একটু মানিয়ে নে।’ চন্দন বর্ধমানে এলেন। তাঁকেও বোঝানো হল। মূল কথা হল, ওই ২৫ শতাংশ টাকা চন্দ্রনাথের চাইই চাই। ২৮ জানুয়ারি, ১৯৮৩ সাল। বণিকবাড়িতে সত্যনারায়ণ পুজো। ঘর ভর্তি লোক। তার মধ্যেই সকালে কথা কাটাকাটি। দেবযানী ফোন করলেন বর্ধমানে। বণিকবাড়িতে দেবযানী ছাড়াও তখন চন্দ্রনাথ। ছেলেদের মধ্যে চন্দন-অসীম-নন্দন। মেয়েদের মধ্যে জয়ন্তী, সুমিত্রা, বিত্রা। চন্দ্রনাথের স্ত্রী ও মা বিশ্রাম নিচ্ছেন। বাচ্চারা নিজেদের ঘরে। বিকেলের দিকে চন্দ্রনাথ ও চন্দন গেলেন দেবযানীর ঘরে। তীব্র চিত্কার ভেসে এল। কাজের লোক যদু ও শান্তিকে আটকালেন সুমিত্রা। চিত্কার থেমে গেল। শ্মশানের নিস্তবদ্ধতা গ্রাস করল বণিকবাড়িতে। পরে ওই ঘরে ঢুকেছিলেন অসীম-জয়ন্তী-সুমিত্রা-বিত্রা। যদু আর শান্তি দেখে নিয়েছিলেন, বড়বৌদি ঘরের সিলিং ফ্যানে শাড়িতে ঝুলছে। তারপরই শুরু হয় কাজের লোকদের ভয় দেখানো। আর এক কাজের লোক উর্মিলাকে সেদিন বাড়িতেই ঢুকতে দেওয়া হয়নি। কিন্তু তারপর?
গড়িয়াহাটের যে বাড়িতে এখন ব্যাঙ্ক, ব্যাঙ্কোয়েট, নামজাদা বহুজাতিক দোকান। কেউ মনে রাখেনি, ওই বাড়ির পেটের ভিতরেই একদিন লেখা হয়েছিল চিঠিটা। কী অপরাধ ছিল দেবযানীর? উত্তর নেই। জানা নেই সেই রাতে ফোনটি কে করেছিলেন। তবে তদন্তে স্পষ্ট, খুনের পুরো প্রক্রিয়াই ঠান্ডা মাথার। প্রতিশোধ স্পৃহা থেকেই। আফশোস নিয়েই বেঁচে আছেন বর্ধমানের নতুনগঞ্জের দত্ত পরিবারের সদস্যরা। ‘আর ভালো লাগে না। ভাবতে বসলেই অসুস্থ লাগে’, গলা কেঁপে ওঠে ক্ষত নিয়ে বেঁচে থাকা এক কাছের লোকের। ওই ফোনকলের ব্যক্তির মতোই পরিচয় গোপন রাখতে চাইলেন তিনি। ধরা গলায়। (চলবে)