


সুকান্ত বসু, কলকাতা: কুমোরটুলির মৃৎশিল্পী ও তাঁদের পরিবারের কাছে দোল উৎসবের আনন্দ হল দুর্গাপুজো সমান। রঙের এই উৎসবে পটুয়াপাড়ার বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে হয়ে থাকে একাধিক গোপাল পুজোর আয়োজন। বছর বছর এই পুজো ক্রমশই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। আগে যেখানে হাতে গোনা দু'পাঁচটি গোপাল পুজো হতো, বর্তমানে সেই সংখ্যাটি গিয়ে দাঁড়িয়েছে ২০-২৫টির মতো। কোনটি ১০ ফুটের। কোনটি ৮ ফুটের। আবার কোনটি ৬ ফুটের। সুদৃশ্য ঢাউস ঢাউস এই গোপাল মূর্তি দেখতে কলকাতার বিস্তীর্ণ এলাকায় থেকে বহু মানুষ সেখানে ভিড় জমান এই পটুয়াপাড়ায়। কুমোরটুলি মৃৎশিল্পী সংগঠনের অন্যতম কর্তা বাবু পাল বলেন,'দোলের দিন আমাদের প্রতিমা তৈরির এই পীঠস্থানে একদিকে চলে রঙের উৎসব, অন্যদিকে, চলে জাঁকজমক সহকারে একাধিক গোপাল পুজোর আয়োজন। দোলের পর আরও সপ্তাহখানেক থাকে এই গোপাল মূর্তি। সেখানে নিত্য পুজোর পাশাপাশি চলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, নানা সামাজিক কর্মকাণ্ড, নরনারায়ণ সেবা প্রভৃতি। দোলের দিন একত্রে বসে চলে আনন্দ সহকারে খাওয়া-দাওয়া।' কুমোরটুলি সূত্রে জানা গিয়েছে, বড় লরি, ম্যাটাডোরে করে নানা আলোক বাতি দিয়ে সাজিয়ে বিশাল শোভাযাত্রা সহকারে বিভিন্ন গোপাল মূর্তি রবীন্দ্র সরণি, শ্যামবাজার, হাতিবাগান, চিত্তরঞ্জন এভিনিউ, বাগবাজার, শোভাবাজার সহ উত্তর কলকাতায় বিস্তীর্ণ এলাকা ঘুরে শেষে কুমোরটুলি ঘাটে নিরঞ্জন হয়ে থাকে ওই একাধিক গোপাল মূর্তি। এরপর দশমীর মতো প্রথা মেনে চলে শান্তিবারি প্রদান ও মিষ্টি মুখ।
কেন এই পুজোয় মাতোয়ারা হয়ে থাকেন কুমোরটুলির মৃৎশিল্পীরা? শিল্পী জবা পাল, চায়না পাল, মালা পাল, কাকলি পালেদের কথায়, 'দুর্গাপুজোর সময় পটুয়াপাড়াজুড়ে ব্যস্ততা থাকে তুঙ্গে। তখন আমাদের না খাওয়ার সময় থাকে না। আর আনন্দ তো দূরের কথা। মহালয়া থেকে পঞ্চমীর মধ্যে প্রতিমা যাতে ঠিক ঠিক উদ্যোক্তারা পেয়ে থাকেন, সেটাই তখন আমাদের কাছে বড় চ্যালেঞ্জের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। তাই তখন আমাদের বাঙালির এই সর্বশ্রেষ্ঠ উৎসবে অংশ নিতে পারি না। ফলে চৈত্র, ফাল্গুন মাসে সে অর্থে কুমোরটুলিজুড়ে ব্যস্ততা থাকে না। তখন হাতে গোনা দু, একটি শীতলা, রক্ষাকালী, দক্ষিণা কালী, ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বর, অন্নপূর্ণার মূর্তি বরাত পেয়ে থাকি। ফলে সেই সময় আমরা ও আমাদের পরিবার এই গোপাল পুজোকেই আনন্দ উৎসব হিসেবে বেছে নিয়েছি। তাতে একে অপরকে রং ও আবির দিয়ে যেমন শুভেচ্ছা জানানো হয়, অন্যদিকে এই গোপাল পুজোর মধ্যে দিয়ে একে অপরকে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে বেঁধে রাখা সম্ভব হয়। তাই আমাদের কাছে এই পুজোর আনন্দ দূর্গাপুজোর সমান। কুমোরটুলি বিভিন্ন প্রান্তে যেখানে যেখানে এই পুজো হয়ে থাকে, সেখানে প্রাণ ভরে সাজিয়ে থাকেন আমাদের পরিবারের লোকজন ও নানা মৃৎশিল্পী ভাইরা।' কথা হচ্ছিল সুকুমার পাল, বাসু পাল, সমীর পালদের সঙ্গে। তাঁরা বলেন,'দোল আসলেই আমাদের মন আনন্দে ভরে ওঠে। দোলের ১৫দিন আগে থেকেই শুরু হয়ে যায় গোপাল মূর্তির কাঠামো তৈরির কাজ। তারপর তাতে চলে খড় দেওয়া, মাটির প্রলেপ পড়া প্রভৃতির কাজ। কুমোরটুলির কোন মহল্লার গোপাল মূর্তি কত সুন্দর ভাবে সাজিয়ে তোলা যায়, চলে রীতিমতো তার এক অসম প্রতিযোগিতা।'