


পক্ষে
রাজু কর্মকার
কথাটি অনেকটাই ঠিক। অনন্তকাল ধরে জামাইষষ্ঠীর মাধুর্য বাংলার সংস্কৃতির অন্যতম দিক। শাশুড়িমায়েরা এই দিনটির জন্য সারা বছর ধরে অপেক্ষা করে থাকতেন। এখন আধুনিকতা সর্বস্ব চরম ব্যস্ততার যুগে জামাইষষ্ঠীতে অনেকটাই ভাটা পড়েছে। এখনকার জামাইদের মধ্যেও এর কদর বা গুরুত্ব কম। আর শাশুড়িদের মধ্যেও সেকেলে উন্মাদনা চোখে পড়ে না। আগের মতো এলাকার মেয়ে-জামাই একত্রিত হয়ে সিনেমা দেখা কিংবা সান্ধ্য হাওয়া মেখে গল্পগুজব আর খুনসুটিতে মশগুল হওয়া এখন কমে গিয়েছে। ফলে উদ্যাপনও এখন অনেক কম।-চাকরিজীবী
মঞ্জুশ্রী মণ্ডল
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক কিছুই বদলে গিয়েছে। যেমন খাওয়াদাওয়া, পোশাক, চালচলন, বিনোদন, আতিথেয়তা ইত্যাদি। জামাইষষ্ঠীর চিরাচরিত মূল আহার হচ্ছে চিঁড়ে, মুড়কি, দই, মিষ্টি সহ আম, লিচু, কাঁঠাল ইত্যাদি ফলের আহার। তাছাড়া কোনও কোনও বাড়িতে পটোল, বেগুন, আলুভাজা, শাক, ডাল, তরকারি, মাছ, পায়েস ইত্যাদি পদ সহ ভাত। কিন্তু বর্তমানে মানুষের প্রধান খাবার হয়ে উঠেছে ফ্রায়েড রাইস, চিলি চিকেন, বিরিয়ানি, মাংস। জামাইষষ্ঠীর ফলাহার জামাইদের মনের মতো নয়। এযুগের জামাইদের কাছে জামাইষষ্ঠীর গুরুত্ব তাই নেই বললেই চলে। - স্কুল শিক্ষিকা
সলিল কুমার দে
না, এই জেট যুগের জামাই বাবাজীবনদের কাছে জামাইষষ্ঠীর সত্যিই কোনও গুরুত্বই নেই। নব্যবিবাহিত হাইটেক জামাইদের হাতে অত সময়ও নেই, তাছাড়া দেখা যায় চাকুরিজীবী শাশুড়ি মায়ের যদিও বা হাতে সময় থাকে তো সাত পদ রান্না করার এনার্জির বড়ই অভাব। ভরসা সেই বিভিন্ন হোটেলের হোম ডেলিভারি অথবা সোজা পছন্দের রেস্তরাঁয় গিয়ে খাওয়া। আগেকার দিনে শাশুড়ি মায়েদের হাতের স্পেশাল রান্নার লোভে জামাইরা এই দিনটির জন্য অপেক্ষা করতেন। তাছাড়া এখন অনেকেই ইউটিউব দেখে বাড়িতে উপলক্ষ ছাড়াই বিশেষ পদ বানিয়ে ফেলেন। তাই বচ্ছরকার দিনে স্পেশাল রান্না ও তা খাওয়ার চমক অবশিষ্ট নেই।-অবসরপ্রাপ্ত চাকরিজীবী
মৃণাল অধিকারী
বাঙালির ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির লৌকিক আচার হল জামাইষষ্ঠী। বহুদিন ধরে জ্যৈষ্ঠ মাসের শুক্লপক্ষের তিথিতে এই আচার পালন করা হয়। এই দিন শাশুড়িরা দেবী ষষ্ঠীকে খুশি করার জন্য ষষ্ঠী পুজো করেন মেয়ে জামাইদের সৌভাগ্য ও সমৃদ্ধি কামনা করেন। সেইসঙ্গে খাওয়াদাওয়া আর নতুন জামাকাপড় আদানপ্রদানের রীতি চলে আসছে বছরের পর বছর। কিন্তু যত দিন যাচ্ছে জামাইষষ্ঠীর গুরুত্ব ক্রমশ কমছে। বর্তমানে বৈদ্যুতিন যুগে সব কিছুই আধুনিক প্রজন্মের হাতের মুঠোয়। আর সেই কারণেই জামাইষষ্ঠীর আমেজও যেন মোবাইলবন্দি হওয়ার যোগ্য একটা রীতিমাত্র। তার মধ্যে আবেগ বলে কিছুই নেই। -চাকরিজীবী
বিপক্ষে
কঙ্কনা বোস
জামাইষষ্ঠীর গুরুত্ব আজ জামাইদের কাছে কমে গিয়েছে— এ ভাবনা অতিরঞ্জিত। আধুনিক জামাইরা এখন আরও সচেতন, দায়িত্ববান ও বাস্তববাদী। উৎসবকে তাঁরা বাহুল্য নয়, আন্তরিকতার চোখে দেখেন। কর্মব্যস্ততা বা দূরত্ব তাঁদের উপস্থিতিকে সীমিত করলেও, সম্পর্কের গভীরতা তাতে কমে না। আগের মতো আড়ম্বর না থাকলেও, তাঁদের মধ্যে রয়েছে পরিণত মনোভাব ও আবেগঘন আন্তরিকতা। তাঁরা বিশ্বাস করেন, ভালোবাসা একদিনের নয়, প্রতিদিনের যত্নেই তা টিকে থাকে। আনুষ্ঠানিকতা নয়, মনেই সম্পর্কের আসল সৌন্দর্য।-কলেজপড়ুয়া
অরুণাভ সাহা
জামাইষষ্ঠী বাঙালির কাছে পুনর্মিলন উৎসব। এর একটা সূক্ষ্ম ধর্মীয় যোগ থাকলেও আদপে পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় করাই আসল উদ্দেশ্য। বর্তমান সময়ে কর্মসূত্রে অনেকেই ঘরছাড়া। একটা বিশেষ দিনে আপ্যায়িত হওয়ার গুরুত্ব অবশ্যই আছে বর্তমান প্রজন্মের কাছে। সার্বিকভাবে জামাইষষ্ঠীর গুরুত্ব যে আছে, সেটা ওই বিশেষ দিনে বাজারে গেলে চাহিদা ও জোগানের অসামঞ্জস্যের কারণে সৃষ্ট মূল্যবৃদ্ধিতেই টের পাওয়া যায়। যৌথ পরিবার ভাঙনের ফলে বৃহত্তর উৎসব কিছুটা ধাক্কা খেলেও উৎসবপ্রিয় বাঙালির কাছে কিন্তু জামাইষষ্ঠীর আলাদা আবেদন আছে। -তথ্যপ্রযুক্তি কর্মী
সুকন্যা দাস
যুগ বদলেছে ঠিকই, কিন্তু জামাইষষ্ঠীর কদর আজও বর্তমান। এখনও অনেক জামাই শ্বশুরবাড়ির আন্তরিক আদর-আপ্যায়নকে গুরুত্ব দেন। এদিন পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো, স্নেহভরা সম্পর্কের বন্ধন দৃঢ় করা এবং ঐতিহ্যের স্নিগ্ধতায় মুগ্ধ হওয়ার এক বিশেষ সুযোগ। প্রযুক্তি ও ব্যস্ততার মাঝে এমন আচারগুলো পারিবারিক আবেগকে জাগিয়ে রাখে। তাই, শুধু সময়ের পরিবর্তনে জামাইষষ্ঠীর গুরুত্ব কমে গেছে বলা ভুল। এটা আজও বাংলার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। -কলেজ ছাত্রী
শ্বেতা চ্যাটার্জি
জামাইষষ্ঠী মানেই বাঙালির জামাইদের কাছে সেই যুগ যুগ ধরে চলে আসা ভুরিভোজের অনুষ্ঠান। আর ভালোমন্দ খেতে কে না ভালোবাসে? তাই আধুনিক যুগে এই দিনটির গুরুত্ব নেই বললে ভুল বলা হবে। তবে আগেকার জামাইষষ্ঠী ও এখনকার রীতি পালনে কিছু জায়গায় বদল ঘটেছে। যুগের পরিবর্তন হলেও জামাইরা কিন্তু আচার পালনে পিছপা নন। খাওয়াদাওয়াও এখন অনেক বেশি এলাহি। মানুষ আধুনিক হলেও এই বিশেষ দিনটি বাঙালির কাছে একইরকম নস্টালজিক। -পড়ুয়া