


ঘটনাবহুল জীবন। প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্তে আমাদের চারপাশে কিছু না কিছু ঘটে চলেছে। বহু ঘটনা হারিয়ে যায় মুহূর্তের ভিড়ে। কোনও ঘটনা উঠে আসে শিরোনাম হয়ে। আর তার মধ্যে কিছু রেখে যায় দাগ। রক্তের দাগ। এমনই সাড়া ফেলে দেওয়া কয়েকটি ঘটনা ফিরে দেখল বর্তমান। সোহম করের কলমে।
নতুন বছরের রেজল্যুশন। আশা। প্রার্থনা। এভাবেই আমরা নতুন শুরু করতে পছন্দ করি। ১৯৯০ সালের ১ জানুয়ারি কলকাতা শহর একটাই প্রার্থনা করেছিল—স্টোনম্যান আর চাই না। কিন্তু না...। ২৬ নভেম্বরের পর নতুন বছরের ২৯ জানুয়ারি ফিরে এল সে। এবার প্রফুল্ল সরকার স্ট্রিট। তারপর রুট বদলে ২০ ফেব্রুয়ারি বেকবাগান। ২৬ ফেব্রুয়ারি শিয়ালদহ।
মৌলালি মোড়ে বৃদ্ধ ব্যবসায়ীর ৫০ বছরের দোকান। মোটা চশমা নাকের উপর তুলে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী চাই?’ ‘স্টোনম্যান’ শব্দটা শুনেই উত্তর, ‘ওসব জানি না।’ এখানেই বাক্যালাপ শেষ হতে পারত। কিন্তু বৃদ্ধ ডাকলেন, ‘এই যে শুনুন... কেন ওসব খুঁজছেন? দরকারটা কী?’ তারপর বৃদ্ধর ডাক, ‘এই যে শুনুন, কী দরকার আপনার?’ রিপোর্টার পরিচয় দিতেই ফিরে গেলেন আগের মন্তব্যে। তবে হতাশ করলেন না এক চা-দোকানি। বিহার থেকে ২০ বছর বয়সে কলকাতায় এসেছিলেন মোহন প্রসাদ। নিজেই আস্ত রহস্য। বলছিলেন, ‘এই চা-দোকানের আগের মালিককে আমি পুলিসে ধরিয়ে দিয়েছিলাম। প্রতিদিন এক মহিলা একটা নোংরা ব্যাগ নিয়ে এখানে আসত। একদিন সেই ব্যাগ খুলে দেখি ভর্তি সোনা। সোজা গেলাম লালবাজারে। পুলিস এসে ওকে ধরে নিয়ে গেল। চা-দোকান আমার হয়ে গেল।’ তাঁর মনে আছে, সেই প্রস্তরমানবের পাল্লায় সারা রাত পুলিস টহল দিত এই চত্বরে। শুধু কি পুলিস! সেকালে আবার ‘স্টোনম্যান ক্যাচার’-এর উদয় হয়েছিল। এক ব্যক্তি ব্যাগে দড়ি, চাকু নিয়ে রাতের কলকাতায় ঘুরে বেড়াতেন। পুলিস তাঁকে ধরে বাড়ি পৌঁছে দিয়েছিল। এ যেন দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানো। স্টোনম্যানকে ধরা না গেলেও ক্যাচারকে ‘ক্যাচ’ করতে পেরেছিল পুলিস।
আর কত? এই প্রশ্নের মাঝে আচমকা ‘ব্রেক’! মার্চের প্রথম সপ্তাহে শিয়ালদহ থেকে স্টোনম্যান ‘কট রেড হ্যান্ডেড’। কালীপদ দাস। দক্ষিণ ২৪ পরগনার রায়দিঘির বাসিন্দা। পেশায় রাজ্য সরকারি কর্মচারী। ফুটপাতে ছিলেন সেই রাতে। ইট তুলে এক মহিলাকে মারতে যাচ্ছিলেন। লালবাজারে আনা হল কালীপদকে। জিজ্ঞাসাবাদে বললেন, তিনি নাকি নেতাজির ভাষণ শুনতে এসেছিলেন কলকাতায়! নেতাজি সুভাষ? এই নব্বই সালে? দীর্ঘ ন’মাস যন্ত্রণায় থাকা লালবাজারের গোয়েন্দাদের এসব শুনে হাসি তো দূরের, হাত নিশপিশ করছিল। সাহেব সেই ইট দেখে বুঝলেন, ‘মিস ফায়ার’। স্টোনম্যানের মোডাস অপারেন্ডি ১৫ থেকে ২০ কিলো ওজনের পাথর। আরও তথ্য সংগ্রহ করে দেখা গেল, সত্যি মিস ফায়ার। তারপর থেকে আজ পর্যন্ত ‘নমস্কার স্যার। আবার! সেম মোডাস অপারেন্ডি’ বলে কোনও থানার ওসির ফোন আসেনি লালবাজারের বড়কর্তাদের কাছে। সরকার বদলেছে, লালবাজারে পরিবর্তন এসেছে। শিয়ালদহ, ডালহৌসি চত্বরে ফুটপাত এখনও সেরকমই রয়েছে। স্টোনম্যান থেকে গিয়েছে ‘আনটাচড’। সেই ১৯৮৩ থেকে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত মুম্বইতে এরকম কার্যকলাপ দেখা গিয়েছিল। তারপর ১৯৮৯ থেকে ১৯৯০ সালের কলকাতায়। ২৬ ফেব্রুয়ারি শেষ হয়েছিল তার যাত্রা। সত্যিই শেষ? কে-ই বা বলতে পারে! নাকি আনলাকি ১৩ স্পর্শ করতে চায়নি সেই খুনি বা খুনিরা? দেশের যে প্রান্তেই ‘সিরিয়াল কিলার’ তার ছায়া বিস্তার করেছে, সেখানেই উঠে এসেছে স্টোনম্যানের প্রসঙ্গ। আতঙ্ক। আনসলভড মার্ডার মিস্ট্রি। ‘আর যেন না আসে’ বলে ঠাকুরের কাছে হাত জোড় করা ছাড়া উপায়ও নেই। পুলিসের বড়কর্তারা নাকে চশমা নামিয়ে ব্যারিটোন কণ্ঠে বলে দিতেই পারেন, ‘পারফেক্ট ক্রাইম ইজ নট আ মিথ। ইট ইজ দেয়ার।’
তিন দশক আগের কাহিনি বলতে বলতে চোখটা ছলছল করেই উঠেছিল এন্টালির এক ফুটপাতবাসীর। স্টোনম্যান নয়, পুলিস...। বলছিলেন, ‘বাবা-মা আমাদের নিয়ে কোথায় যাবে, বুঝে উঠতে পারছিল না। গরিব লোক, পড়াশোনা জানি না...।’