


প্রীতেশ বসু, কলকাতা: প্রায় দেড় বছর হতে চলল, বন্ধ রয়েছে জল জীবন মিশনের (পশ্চিমবঙ্গে জলস্বপ্ন) টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষের কেন্দ্রীয় বাজেটে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হলেও তার গাইডলাইন প্রকাশ করতে ব্যর্থ মোদি সরকার। টাকা কবে দেওয়া হবে, তার কোনও দিশা দেখাতে পারেনি কেন্দ্র। ফলে পশ্চিমবঙ্গ তো বটেই, কার্যত গোটা দেশে মুখ থুবড়ে পড়ছে বাড়ি বাড়ি পানীয় জলের সংযোগ দেওয়ার এই প্রকল্প। এই আবহে পুনরায় প্রকল্পের স্কিম ভিত্তিক হিসেব তলব করল দিল্লি। শুধু হিসেব চাওয়াতেই থেমে থাকেনি তারা! ওই হিসেব নিয়ে সশরীরে জলশক্তি মন্ত্রকে হাজিরা দিতে বলা হয়েছে দপ্তরের শীর্ষকর্তাদের। আগামী ২৪ থেকে ২৭ নভেম্বর প্রতিটি রাজ্যের কর্তাদের সঙ্গে মুখোমুখি আলোচনা হবে প্রকল্প বাবদ খরচের হিসেব নিয়ে। পশ্চিমবঙ্গের প্রতিনিধিদের ডাকা হয়েছে ২৫ নভেম্বর।
প্রকল্পের শুরু থেকেই প্রতিদিনের খরচের হিসেব তুলে দেওয়া হত নির্দিষ্ট পোর্টালে। তাহলে কেন নতুন করে ফের হিসেব তলব করা হচ্ছে? এই প্রশ্ন তোলার পাশাপাশি ওয়াকিবহাল মহল মনে করছে, মোদি সরকারের ভাঁড়ে মা ভবানী অবস্থা। সেই কারণে টাকা দেওয়া পিছিয়ে দিতে হিসেব তলবের ‘খেলা’ খেলছে কেন্দ্র। প্রকল্পের টাকা আটকে রাখাই এর কারণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট অনেকে। তাঁদের মতে, লোকসভা ভোট ২০২৯ সালে। সেক্ষেত্রে মোদি সরকার অন্তত ২০২৮ সালের শেষ পর্যন্ত প্রকল্পটি টানতে চাইবেন। আর তার জন্যই এখন টাকা আটকে রাখা হচ্ছে।
সূত্রের খবর, নির্দিষ্ট কোনও এলাকায় অতিরিক্ত স্কিম হাতে নেওয়া হয়েছে কি না এবং কোন কোন ক্ষেত্রে রাজ্যের ভাগের চেয়ে কেন্দ্রের খরচের ভাগ বেশি হয়ে গিয়েছে—মূলত এসব বিষয় নিয়েই কেন্দ্রের আসন্ন বৈঠকে চুলচেরা বিশ্লেষণ হতে চলেছে। কিন্তু, সেক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গকে ধরা হল কেন? প্রশাসনিক মহল এই প্রশ্ন তুলছে কারণ, হিসেব অনুযায়ী মোট খরচের মধ্যে কেন্দ্রের তুলনায় অনেক বেশি খরচ করেছে রাজ্য। কেন্দ্র এখনও পর্যন্ত ১৩,০২৭ কোটি টাকা দিয়েছে। আর রাজ্য খরচ করেছে ১৫,২৫৯ কোটি টাকা। ইতিমধ্যে রাজ্যের প্রায় এক কোটি বাড়িতে পানীয় জলের সংযোগ দেওয়া হয়ে গিয়েছে। ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট, জলের ওভারহেড ট্যাংক, পাম্পিং স্টেশনের মতো একাধিক পরিকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণের খরচও বহন করতে হয় রাজ্যকে। নিয়োগ করতে হয়েছে পাম্প অপারেটর থেকে শুরু করে একাধিক কর্মী। ফলে মূল প্রকল্প বাদেও রক্ষণাবেক্ষণ খাতে রাজ্যের এখনও পর্যন্ত খরচ হয়ে গিয়েছে ৪,৬০০ কোটি টাকা।
প্রশাসনিক মহলের মতে, কেন্দ্রের বেঁধে দেওয়া দরের প্রায় ১৫ হাজার টাকা কম খরচে এক-একটি বাড়িতে জলের সংযোগ নিশ্চিত হয়েছে বাংলায়। কেন্দ্রের গাইডলাইন অনুযায়ী এরাজ্যে একটি বাড়িতে জলের সংযোগ দিতে সর্বোচ্চ ৪৭ হাজার টাকা করে খরচ ধার্য রয়েছে। সেই জায়গায় মুখ্যমন্ত্রীর নজরদারিতে খরচ হয়েছে মাত্র ৩১ হাজার ৭৭৫ টাকা। সম্প্রতি, দেশের ১৫টি রাজ্য এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে জল জীবন মিশন প্রকল্পের অনিয়ম সংক্রান্ত একটি রিপোর্ট প্রকাশিত হয়। সেখানে সর্বাধিক অভিযোগ এসেছে উত্তর প্রদেশ (১৪,২৬৪টি)-এর বিরুদ্ধে। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে অসম (১,২৩৬টি)। পশ্চিমবঙ্গ থেকে ১৪২টি অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের ভিত্তিতে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে দাবি প্রশাসনের।