


নিজস্ব প্রতিনিধি, বারাসত: ‘সবাই পাবেন নাগরিকত্ব, সবার নাম থাকবে ভোটার তালিকায়’—গত কয়েক মাস ধরে মতুয়া সম্প্রদায়ের মানুষকে আশ্বস্ত করতে এহেন ‘আপ্তবাক্য’ নাগাড়ে আওড়ে গিয়েছিলেন কেন্দ্রীয় জাহাজ প্রতিমন্ত্রী শান্তনু ঠাকুর। এমনকি ঠাকুরনগরের মতুয়াপীঠে রীতিমতো ‘ক্যাম্প’ করে হিন্দু প্রমাণের ‘শংসাপত্র’ বিলি করা হয়েছিল। তাতে স্বাক্ষরও করেছিলেন শান্তনুবাবু স্বয়ং। কিন্তু এসআইআর পর্বে খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশের পর সোমবার কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর ব্যক্তিগত উপলব্ধি—‘এক লক্ষ মতুয়ার নাম বাদ যাচ্ছে। সেটা সহ্য করে নিতে হবে।’ রাজনৈতিক কারবারিরা বলছেন, শনিবার নদীয়ার তাহেরপুরের সভায় টেলিফোন বার্তায় মতুয়াদের নাগরিকত্ব নিয়ে কোনও কথা বলেননি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। পরে এক্স-হ্যান্ডলেও ভোটাধিকার নিয়ে এমন কোনও সদর্থক কথা বলেননি, যাতে ভরসা বাড়ে এই সম্প্রদায়ের। বরং প্রধানমন্ত্রী ফিরে যাওয়ার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তাঁর মন্ত্রিসভার সহকর্মীর ‘স্বীকারোক্তি’ মতুয়াদের আরও অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মধ্যে ঠেলে দিল। এই প্রসঙ্গে কড়া প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদ তথা মতুয়া সংঘাধিপতি মমতা ঠাকুর। তিনি বলেছেন, ‘মতুয়াদের সঙ্গে বিজেপি প্রতারণা করল। আগেও করেছে, এবারও করল। মতুয়াদের শুধু ভোটব্যাংক হিসেবে ব্যবহার করে ওরা। যোগ্য সামাজিক সম্মান যে দেয় না, তা আজ স্পষ্ট!’
সোমবার বনগাঁর গ্যাঁড়াপোতায় সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে বিজেপি প্রভাবিত মতুয়া সংঘাধিপতি শান্তনুবাবু বলেন, ‘কমিশনের খসড়া তালিকায় এ রাজ্যের ৫৮ লক্ষ মানুষের নাম বাদ গিয়েছে।’ এই পর্বেই তাঁর ‘অদ্ভুত’ দাবি, ‘এর মধ্যে ৫০ লক্ষ রোহিঙ্গা মুসলমান। সেখানে এক লক্ষ মতুয়ার নাম বাদ গিয়েছে।’ বিজেপির ‘কোর ভোটব্যাংকের’ জন্য তাঁর পরামর্শ—‘মতুয়াদের একটু সহ্য করে নেওয়া উচিত।’ পরিসংখ্যান বলছে, গোটা বিশ্বে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মানুষের সংখ্যা এখন ৩০ লক্ষের কাছাকাছি। সেই নিরিখে বাংলার খসড়া ভোটার তালিকা থেকে ৫০ লক্ষ রোহিঙ্গা মুসলমানের নাম কীভাবে বাদ গেল? আর কীভাবেই বা তা আগাম জানলেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী? এর কোনও ব্যাখ্যা কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর বক্তব্যে ছিল না। এসআইআর পর্বে নির্বাচন কমিশনের তথ্য বলছে, বনগাঁ মহকুমার চারটি বিধানসভা কেন্দ্রে (বনগাঁ উত্তর ও দক্ষিণ, গাইঘাটা ও বাগদা) এমন ১ লক্ষ ৩৪ হাজার ভোটারের হদিশ মিলেছে, যাঁদের নিজেদের এবং বাবা-মা সহ আত্মীয়স্বজনের নাম ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় ছিল না। এর মধ্যে প্রায় ১ লক্ষ ২০ হাজার মানুষ মতুয়া সম্প্রদায়ের। যে ১১টি নথির যে কোনও একটি নিয়ে কমিশনের হিয়ারিংয়ে যেতে হবে ‘সন্দেহজনক’ ভোটারদের, তার একটিও নেই মতুয়াদের কাছে। সে কথা আগেই জানিয়েছিলেন শান্তনুবাবুর দাদা গাইঘাটার বিজেপি বিধায়ক সুব্রত ঠাকুর। সেই আবর্তে মাত্র এক লক্ষ মতুয়ার নাম বাদ যাবে, এ তথ্য শান্তনু ঠাকুর কোথা থেকে পেলেন, প্রশ্ন উঠেছে তা নিয়েও। যদিও এই বিতর্কের মাঝেই এদিন ফের কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি—‘মতুয়ারা সকলেই নাগরিকত্ব পাবেন, ভোটাধিকারও মিলবে।’