


ইসলামাবাদ: সম্মুখ সমরে বিরতি। কিন্তু ‘অপারেশন সিন্দুর’ বন্ধ হয়নি। পাকিস্তানের সঙ্গে ‘জলযুদ্ধ’ অব্যাহতই। পহেলগাঁও জঙ্গি হামলার পরই সিন্ধু চুক্তি বাতিল করেছিল ভারত। তারপরই পাকিস্তানে ঢুকে প্রত্যাঘাত! দীর্ঘ টানাপোড়েনের পর যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়েছে নয়াদিল্লি। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন—রক্ত ও জল কখনও একসঙ্গে বইতে পারে না! সিন্ধুর একফোঁটা জল পাবে না পাকিস্তান। এটাই এখন ভারতের সর্বশেষ অবস্থান। অপারেশন সিন্দুরের পর এই ‘আফটার শক’-এর ধাক্কায় ইসলামাবাদের রক্তচাপ বেড়েই চলেছে। সিন্ধু ও তার উপনদীগুলির জল না পাওয়ায় খরিফ মরশুমে শুকিয়ে কাঠ পাকিস্তানের কৃষিক্ষেত্র। চরম খাদ্যসঙ্কট দেখা দিতে পারে সীমান্তপারে।
পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের অবস্থা সবচেয়ে খারাপ। সিন্ধুর পাশাপাশি চন্দ্রভাগা, ঝিলমও সেখান দিয়ে প্রবাহিত। পাঞ্জাব ও সিন্ধ প্রদেশের ৮০ শতাংশ কৃষিকাজ এই নদীগুলির জলের উপর নির্ভরশীল। সরকারি তথ্য মে মাসেই পূর্বাভাস দিয়েছিল, ইন্ডাস (সিন্ধু) রিভার সিস্টেমের নদীগুলির জলপ্রবাহ ২১ শতাংশ কমে যেতে পারে। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান আরও খারাপ পরিস্থিতির দিকে ইঙ্গিত করছে। দেখা যাচ্ছে, গত বছর ২ জুনের তুলনায় সোমবার সিন্ধু নদ অববাহিকায় জলের পরিমাণ ১০.৩ শতাংশ কমেছে। কৃষিক্ষেত্রকে সচল রাখতে সিন্ধু ও ঝিলমের উপর যথাক্রমে তারবেলা ও মঙ্গলা বাঁধ নির্মাণ করেছে ইসলামাবাদ। আচমকাই এই দুই বাঁধের জল কমে প্রায় অর্ধেক হয়ে গিয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, মঙ্গলার জল ধারণক্ষমতা ৫৯ লক্ষ একর ফুট। বর্তমানে সেখানে ২৭ লক্ষ একর ফুট জল রয়েছে। অপরদিকে ১ কোটি ১৬ লক্ষ একর ফুট জল ধারণ করার ক্ষমতা রয়েছে তারবেলা বাঁধের। কিন্তু এখন আছে মাত্র ৬০ লক্ষ একর ফুট। প্রতিদিনই সেই ধারা নিম্নমুখী।
সেদেশে বর্ষা আসতে এখনও চার সপ্তাহ বাকি। তার আগে পরিস্থিতি আরও শোচনীয় হবে। সেচের জল না পেয়ে খরিফ মরশুমে তুলো, ধান এবং অন্যান্য গ্রীষ্মকালীন শস্যের চাষে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। কৃষকরা বীজ বপণ করতে পারছেন না। চাষাবাদ না হলে পাকিস্তানের শুকিয়ে যাওয়া শুধু সময়ের অপেক্ষা। শুধু কৃষিকাজ নয়, পাকিস্তানের জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় উৎস হল এই নদ-নদীগুলি। পাকিস্তানের জল ও বিদ্যুৎ ডেভেলপমেন্ট অথরিটি এক রিপোর্টে জানিয়েছে, দু’দিনে চন্দ্রভাগার জল ৯১ হাজার কিউসেক কমে গিয়েছে। জলবিদ্যুৎ উৎপাদন প্রায় শূন্যে এসে ঠেকেছে।
পাক প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফও ভারতের সিদ্ধান্ত নিয়ে উদ্বেগে রয়েছেন। গত শুক্রবার রাষ্ট্রসঙ্ঘে হিমবাহ সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সম্মেলনে ভারতের সিদ্ধান্তকে একতরফা ও অবৈধ বলেছেন তিনি। ইসলামাবাদকে যোগ্য জবাব দিয়েছে দিল্লিও। সম্মেলনে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কীর্তিবর্ধন সিং বলেন, পাকিস্তানই লাগাতার সীমান্ত সন্ত্রাস চালিয়ে জলচুক্তি কার্যকরে বাধা দিয়ে চলেছে। উল্টে ইসলামাবাদই চুক্তি লঙ্ঘন করে দিল্লির বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। অবিলম্বে তা বন্ধ হওয়া উচিত।
১৯৬০ সালে ১৯ সেপ্টেম্বর বিশ্বব্যাঙ্কের মধ্যস্থতায় দু’দেশের মধ্যে সিন্ধু চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। টানা ৯ বছর আলোচনার পর বিশ্বব্যাঙ্কের মধ্যস্থতায় করাচিতে তৎকালীন পাক প্রেসিডেন্ট আয়ুব খান এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু স্বাক্ষর করেছিলেন জলচুক্তিতে। কিন্তু পহেলগাঁও জঙ্গি হামলার পর প্রথমে ‘ওয়াটার স্ট্রাইক’ চালায় ভারত। ইসলামাবাদের সঙ্গে ৬৫ বছরের পুরনো সিন্ধু জলচুক্তি স্থগিত করে দেয়। অপারেশন সিন্দুরের পরও পাকিস্তান যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিলেও সিন্ধুর জল ছাড়েনি ভারত। তাতেই নাভিশ্বাস উঠেছে পাকিস্তানের।