


উজ্জ্বল পাল: পুজোর তিনদিন মা উগ্রমূর্তি ধারণ করেন। তাই সোনামুখীর রায় পরিবারের খেপা কালীকে শেকলে বাঁধা হয়। জনশ্রুতি, সোনামুখী শহরের রায় পরিবারের খেপা কালী ভীষণ জাগ্রত। তিনি ভক্তদের সব বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা করেন। কিন্তু মনস্কাম পূরণের পর ভুলে গেলে মা রুষ্ট হয়ে একেবারে উগ্রমূর্তি ধারণ করেন। সেজন্য পুজোর দিনগুলিতে পুরোহিত মহাশয় মায়ের পশ্চাৎপদে মোটা শেকল বেঁধে দেন। পরিবারের সদস্যরা বলেন, পারিবারিক হলেও আর পাঁচটা সর্বজনীন পুজোর মতোই ভক্তদের ভিড় জমে দীপান্বিতা কালীপুজোয়।
রায় পরিবারের সদস্যা তিয়াসা রায়ের কথায়, আমাদের মা একদিকে ভীষণ স্নেহময়ী। আবার পুজোয় কোনও ত্রুটি তিনি পছন্দ করেন না। তাঁর লীলাখেলার নানা ঘটনার নমুনা পেয়েছি। মানসিক না পাওয়ার জন্য আমাদের মা ভীষণ রুষ্ট হয়েছিলেন। মায়ের অপছন্দ, তাই আমাদের পরিবারের মেয়েরা কেউই কপালে টিপ পরেন না। এমনকী, বহু বছরের ওই প্রথা মেনে পরিবারের কোনও অবিবাহিত মেয়ে পায়ে নুপুরও পরেনি।
রায় পরিবারের সদস্যরা বলেন, আমাদের পূর্বপুরুষের আদি বাস ছিল বীরভুমের সিউড়িতে। প্রায় তিনশো বছর আগে বর্গি হানার সময়ে তৎকালীন পূর্বপুরুষ গ্রাম ছেড়ে সপরিবারে পালিয়ে আসেন সোনামুখীতে। আসার সময় কুলদেবী মা কালীকেও সঙ্গে নিয়ে আসেন। তৎকালীন বাঁকুড়ার জঙ্গলঘেরা সোনামুখীতে এসে বসবাস শুরু করেন। বসতবাটির পাশেই প্রথমে খড়ের চালার মন্দির করে মাকে প্রতিষ্ঠা করা হয়।
খেপা কালীমন্দিরের পুরোহিত বলেন, শত্রু বিনাস করার জন্য পুজোর সময় মাকালী উগ্রমূর্তি ধারণ করেন। ওই সময় ভক্তদের পাশাপাশি বহু সাধারণ দর্শনার্থী মণ্ডপে আসেন। মায়ের রোষে কারও যাতে ক্ষতি না হয় সেজন্য পুজোর দিনগুলিতে মাকে শেকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়। বিসর্জনের দিন খোলা হয়।
পরিবারের সদস্যরা বলেন, বহু বছর আগে একবার পার্শ্ববর্তী এক ব্যক্তি তাঁর শিশুর অসুস্থ হওয়ার সময় মাকে ‘মাঙ্গটিক’ দেওয়ার মানত করেন। কিন্তু শিশু সুস্থ হওয়ার পর তিনি তা বেমালুম ভুলে যান! পরে এক অনুষ্ঠানে ওই শিশুটিকে তাঁর মা সোনার টিপ পরালে শিশুটি নিখোঁজ হয়ে যায়। তার আর খোঁজ পাওয়া যায়নি। পরে দেখা যায় শিশুর কপালের টিপটি মাকালীর কপালে লাগানো হয়েছে! মা রুষ্ট হয়ে ওই কাজ করেছেন বলে ভক্তদের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে। মায়ের ওই উগ্র রূপের জন্য এলাকার মানুষের কাছে তিনি খেপা কালী নামেই পরিচিত। আবার মানুষের বিপদে মা নিজেই ঝাঁপিয়ে পড়েন তারও নানা কাহিনি রয়েছে। মন্দিরের পার্শ্ববর্তী এক দরিদ্রপল্লিতে একবার আগুন ছড়িয়ে পড়ে। পল্লির বাসিন্দারা অনেক চেষ্টা করেও আগুন বাগে আনতে না পেয়ে মায়ের শরণাপন্ন হন। এরপর আগুন সহজেই আয়ত্বে চলে আসে। পরে দেখা যায়, মাকালীর দু’হাতে পোড়া খড়ের দাগ রয়েছে। এভাবেই রায় পরিবারের খেপাকালী মানুষের মনে জায়গা করে নিয়েছে।