


নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: আইলা, উম-পুনের মতো ঘূর্ণিঝড় ছাড়াও পর পর বন্যার দাপট সামলাতে হচ্ছে বাংলাকে। তার সঙ্গে রয়েছে পাহাড়ের ধস এবং পশ্চিমাঞ্চলের খরা। ফলে উত্তর থেকে দক্ষিণ—রাজ্যের অধিকাংশ জেলার মানুষকেই প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হতে হয়। ঘরছাড়া হয়ে পড়েন লক্ষাধিক মানুষ। ঠাঁই হয় ত্রাণশিবির কিংবা উঁচু রাস্তার উপর টাঙানো ত্রিপলের ছাউনিতে। আর এর জেরে সবথেকে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হয় শিশুদের জন্য। স্কুলে যাওয়া অনিয়মিত হয়ে যাওয়া থেকে শুরু করে বৃদ্ধি পায় বাল্যবিবাহ, শিশুপাচার প্রভৃতির সম্ভাবনা। আবার প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও মানসিক প্রভাব পড়ে। এসবের হাত থেকে প্রাকৃতিক দুর্যোগের আবহে শিশুদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে বিশেষ সেল তৈরির সুপারিশ করল শিশু সুরক্ষা কমিশন। সেইসঙ্গে শিশুদের কথা মাথায় রেখে প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা নীতিতেও প্রয়োজনীয় সংযোজনের সুপারিশ করা হয়েছে কমিশনের তরফে। এই সুপারিশ কার্যকর করার বিষয়টি রাজ্যের তরফে খতিয়ে দেখা হবে বলেও জানা গিয়েছে রাজ্য বিপর্যয় মোকাবিলা দপ্তর সূত্রে।
সম্প্রতি প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে শিশুদের ঝুঁকি সম্পর্কিত শ্বেতপত্র প্রকাশ করেছে কমিশন। তাতে প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময়ে এবং তার ঠিক পরে শিশুদের কোন ধরনের ঝুঁকির সম্মুখীন হতে হয় তা বিস্তারিত ভাবে তুলে ধরা হয়েছে। আর এই সমস্যার সমাধানে বিপর্যয় মোকাবিলা নীতিতে বেশকিছু বদল আনার সুপারিশও করা হয়েছে। এবিষয়ে কমিশনের চেয়ারপার্সন তুলিকা দাস বলেছেন, আমাদের লক্ষ্য একটিও শিশু তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে না এবং তারা সুস্থ পরিবেশে বেড়ে উঠতে পারবে।
কমিশনের শ্বেতপত্রে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের মুর্শিদাবাদ, বীরভূম ও মালদহ জেলায় ভয়াবহ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে ৪০ শতাংশই ছিল শিশু। ২০০৯ সালে দুই ২৪ পরগনায় আইলার সময় শিশুরা অস্থায়ী শিবিরে গরমে ও শীতে কষ্ট ভোগ করেছে। অনেকে পতঙ্গবাহিত রোগের শিকার হয়েছে। এমনকি যৌন ও শারীরিক নির্যাতনেরও শিকার হতে হয়েছে কিছু শিশুকে। ২০২০ সালে উম-পুনে দক্ষিণ ২৪ পরগনার বাসন্তী ও কুলতলিতে শিশুদের অসুস্থতার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। যশ ঘূর্ণিঝড়ের পরে সুন্দরবনের গোসাবা ও পাথরপ্রতিমায় স্কুলে উপস্থিতির হার প্রায় ৭০ শতাংশ কমে গিয়েছিল। পরের বছর পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছিল ২৭ শতাংশ ছেলেমেয়ে। জলপাইগুড়ি ও কোচবিহারে বন্যাপীড়িত পরিবারে অল্পবয়সে মেয়েদের বিয়ে দেওয়ার এবং ছেলেদের ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে ঠেলে দেওয়ার প্রবণতাও বৃদ্ধি পায়। সীমান্ত এলাকায় শিশুশ্রম, বাল্যবিবাহ ও কিশোরী মাতৃত্বের মতো সমস্যা প্রকট আকার নেয় বলেও শ্বেতপত্রে দাবি করা হয়েছে।
এই সমস্ত সমস্যায় ইতি টানতেই বিপর্যয় মোকাবিলা নীতিতে একাধিক বিষয় সংযোজনের সুপারিশ করা হয়েছে। তাতেই বলা হয়েছে বিশেষ সেল তৈরির কথা। তার কাজ হবে দুর্যোগ-প্রভাব সংক্রান্ত সমস্ত তথ্য একত্র করে রাখা। যাতে এই তথ্যাদি ব্যবহার করেই দুর্যোগ-পরবর্তীকালে সবরকমে দুর্গতদের পাশে দাঁড়ানো সম্ভব হয়। ওইসঙ্গে স্কুলেই প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা সম্পর্কে শিশুদের সচেতনতা বৃদ্ধির সুপারিশও করা হয়েছে কমিশনের তরফে।