


সুকান্ত বসু, কলকাতা: ইংরেজ আমলে বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া স্বাধীনতা যোদ্ধাদের তোলা হতো ব্যাঙ্কশাল আদালতে। পাশাপাশি ব্রিটিশ বিরোধী নানা লেখা প্রকাশের জন্যও ইংরেজ সরকার বিভিন্ন পত্র‑পত্রিকার সম্পাদকদের বিরুদ্ধেও মামলা ঠুকত শহরের এই ফৌজদারি আদালতেই। সেইসব মামলায় আদালতের রায় লেখা হতো যে টাইপ রাইটারে, ইংরেজ আমলের তেমনই একটি মেশিন চরম অনাদারে পড়ে রয়েছে ব্যাঙ্কশাল আদালত ভবনে। বহুতল ভবনের একটি ঘরে সেই টাইপ রাইটারটি একটি টেবিলে রাখা হয়েছে একটি ‘কভার’ দিয়ে। তার উপর পড়েছে জমাট বাঁধা ধুলো। ঘরের চারদিকে নোংরা‑আবর্জনা। যে চেয়ারে বসে ওই মেশিনে টাইপ করা হতো, প্রাচীন সেই কাঠের চেয়ারটিও স্বমহিমায় সেখানে রয়ে গিয়েছে। তবে সেই চেয়ারটির অবস্থাও অত্যন্ত করুণ। একটু জোরে টানাটানি করলে তা যে কোনও সময় ভেঙে পড়তে পারে। আদালত কর্মীদের কথায়, ওই ঘরে ঠিক মতো তল্লাশি করলে বেরিয়ে আসতে পারে স্বাধীনতা সংগ্রামে বীর বিপ্লবীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার নানা চাঞ্চল্যকর তথ্যের ‘তামাদি’ হওয়া নথি।
আদালত সূত্রে জানা গিয়েছে, কলকাতার বুকে জ্বালাময়ী বক্তৃতা দেওয়ার জন্য খোদ নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুকে গ্রেপ্তার করে এই ব্যাঙ্কশাল আদালতেই তোলা হয়েছিল। কাজি নজরুল ইসলামের ‘ধূমকেতু’ পত্রিকা ইংরেজ পুলিশের রাজরোষে পড়েছিল। বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল ওই পত্রিকার বিভিন্ন কপি। সেই মামলারও বিচার চলেছিল এই আদালতে। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে নানা কারণে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল কলেজ‑বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক পড়ুয়াদের। তাঁদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রবিরোধী ছাড়াও অস্ত্র আইনেও মামলা করা হয়েছিল। তেমন অসংখ্য মামলারও হদিশ মিলেছে এই আদালতের নথি থেকে। এছাড়া কংগ্রেস আমলে ‘মিসা’য় গ্রেপ্তার করা হয়েছিল বরুণ সেনগুপ্ত সহ অনেক সাংবাদিককে। তাঁদেরও তোলা হয় এই আদালতে।
প্রবীণ আইনজীবীদের বক্তব্য, ইংরেজ আমলে শুধুমাত্র স্বাধীনতা সংগ্রামীই নন, বহু বিশিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দায়ের করা নানা মামলার রায় লেখা হয়েছে এই সমস্ত টাইপ মেশিনে। ফলে ইতিহাসের দিক থেকে সেগুলির গুরুত্ব অসীম। এই আদালতে দীর্ঘদিন ধরে নানাভাবে ইতিহাসকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন প্রবীণ আইনজীবী যামিনীরঞ্জন ঘোষ। তিনি বলেন, শুধুমাত্র টাইপ রাইটারই নয়, অনাদারে পড়ে থাকা ইংরেজ আমলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মামলার নথিও অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে সংরক্ষণ করা দরকার। না হলে হয়ত আগামী দিনে হারিয়ে যেতে পারে এই সমস্ত মূল্যবান নথি। এই আদালতের আইনজীবী সংগঠনের দুই কর্তা তরুণ চট্টোপাধ্যায় ও প্রবীর মুখোপাধ্যায় বলেন, এই সমস্ত দ্রষ্টব্য ও দলিল দস্তাবেজ যাতে আগামী দিনে এই কোর্ট চত্বরে কোনো সংগ্রহশালা করে সেখানে রাখা হয়, সেই বিষয়ে তাঁরা কলকাতা নগর দায়রা আদালতের (বিচারভবন) মুখ্য বিচারক সুকুমার রায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করবেন।